Home সংস্কৃতি ও বিনোদন স্ক্রিনের যুগে নিঃসঙ্গতার নতুন ভাষ্য: একাকীত্বকে নতুন করে পড়ার আহ্বান ‘রাইটিং ফ্রম দ্য সলিটারি’

স্ক্রিনের যুগে নিঃসঙ্গতার নতুন ভাষ্য: একাকীত্বকে নতুন করে পড়ার আহ্বান ‘রাইটিং ফ্রম দ্য সলিটারি’

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
19 views 3 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: ডিজিটাল যুগে মানুষ যত বেশি সংযুক্ত, ততই যেন বেড়েছে তার নিঃসঙ্গতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন আলাপ কিংবা ভার্চুয়াল উপস্থিতি—সব কিছুর মধ্যেও এক ধরনের গভীর একাকীত্ব আমাদের সময়ের অন্যতম বড় বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে ‘Writing from the Solitary: An Anthology on Loneliness’ সংকলনটি নিঃসঙ্গতাকে ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়, বরং এক সর্বজনীন মানবিক অভিজ্ঞতা হিসেবে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়।

ব্রিটিশ লেখিকা অলিভিয়া লেইং লিখেছিলেন, “নিঃসঙ্গতা ব্যক্তিগত, আবার রাজনৈতিকও। এটি সমষ্টিগতও; যেন একটি শহর। সেখানে বাস করার কোনও নির্দিষ্ট নিয়ম নেই, আর এর জন্য লজ্জিত হওয়ারও কারণ নেই।” এই ভাবনাই যেন প্রতিফলিত হয়েছে সংকলনের সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা সরকার ও সেমিন আলির ভূমিকায়। তাঁদের কথায়, এটি এমন সব কণ্ঠের সমাবেশ, যারা নিঃসঙ্গতাকে অন্ধকার থেকে আলোয় নিয়ে এসেছে, তাকে ভাষা দিয়েছে।

প্রবন্ধ, ছোটগল্প, সাক্ষাৎকার ও কবিতার বৈচিত্র্যময় এই সংকলনে প্রত্যেকে নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও শিল্পভাষায় একাকীত্বের নানা রূপ তুলে ধরেছেন।

সুমনা রায়ের প্রবন্ধ ‘ডাইং অ্যালোন’ সংকলনের শুরুতেই একা থাকার দৈনন্দিন বাস্তবতাকে গভীর সংবেদনশীলতায় তুলে ধরে। একা থাকার কারণে ঘরের আসবাব, বাসনপত্র, খাবার কিংবা তোয়ালের অব্যবহৃত পড়ে থাকা—এই ছোট ছোট পর্যবেক্ষণ থেকেই তিনি পৌঁছে যান জীবনের বড় সত্যে। তাঁর উপলব্ধি, মানুষ একাই বাঁচে, একাই মরে—সম্ভবত এই কারণেই যে সে একা।

কবি মণি রাও তাঁর ‘দ্য লার্জ হাউস’ কবিতায় দেখিয়েছেন, পরিবার বা ভিড়ের মধ্যেও কীভাবে মানুষ নিঃসঙ্গ হয়ে পড়তে পারে। তাঁর ভাষায়, একটি পরিবার যেন বহু ঘরের একটি বিশাল বাড়ি—প্রত্যেক মানুষ আলাদা একটি ঘর, যার সঙ্গে অন্য ঘরের সম্পূর্ণ মিল কখনও হয় না।

অরুণাভ সিনহার অনুবাদে কমল চক্রবর্তীর ‘মারাদোনা’ কিংবা নিতু দাসের ‘দ্য বার্ডওয়াচার’ কবিতাগুলি নিঃসঙ্গতার আরেকটি মাত্রা উন্মোচন করে। সেখানে প্রশ্ন উঠে আসে—আমরা যা দেখি, তা কি সত্যি, নাকি কেবল এক অভিনয়?

ভাস্বতী ঘোষের ‘দ্য মিস্টেরিয়াস গিফ্টস অব আ ফেক স্নেক’ প্রবন্ধে নিঃসঙ্গতা যেন এক বিষধর সাপ, যা দীর্ঘদিন তাঁর মনকে ভয়ের মধ্যে বেঁধে রেখেছিল। পরে একটি লেখালেখির ফেলোশিপে গিয়ে নির্জনতার মধ্যেই তিনি সেই ভয়কে চিনতে এবং মেনে নিতে শেখেন।

সংকলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হল কবি জিৎ থায়িল ও নীলাঞ্জনা এস. রায়ের কথোপকথন ‘দ্য প্লেজারস অব সলিটিউড’। সেখানে তাঁরা স্পষ্ট করেন, নিঃসঙ্গতা (loneliness) এবং নির্জনতা (solitude) এক জিনিস নয়। একজন লেখকের জন্য নির্জনতা অপরিহার্য। থায়িল বলেন, “আমাদের কাজই হল ঘণ্টার পর ঘণ্টা একা একটি ঘরে বসে থাকা। একটি বই লেখার জন্য এই নির্জনতা শুধু প্রয়োজনীয় নয়, অপরিহার্য।”

একই সুর শোনা যায় নবীনা দাসের প্রবন্ধ ‘Lonelitude and Love: Building Castles in Moonlight’-এ। তাঁর মতে, লেখালেখির নিঃসঙ্গতা প্রেমের নিঃসঙ্গতার মতোই গভীর, কিন্তু একই সঙ্গে তা সৃষ্টিশীল শক্তিরও উৎস।

আজকের পৃথিবীতে, যেখানে বাস্তব সম্পর্কের জায়গা ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে পর্দা, আর নিঃসঙ্গতাকে বিশ্বজুড়ে এক নীরব মহামারি হিসেবে দেখা হচ্ছে, সেখানে এই সংকলন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি একাকীত্বকে কেবল বেদনার অভিজ্ঞতা হিসেবে নয়, আত্মঅন্বেষণ, সৃজনশীলতা এবং আত্মস্বীকৃতির এক সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবেও দেখায়।

সংকলনের শেষদিকে সূর্যকান্ত ত্রিপাঠী ‘নিরালা’-র বিখ্যাত কবিতা ‘ম্যায় আকেলা’, রুথ বনিতার অনুবাদে, যেন এই সমগ্র বইটির সারমর্ম তুলে ধরে। সেখানে কবি বলেন, তিনি একা, জীবনের সন্ধ্যা নেমে আসছে; জীবনের সব নদী-নালা তিনি পেরিয়ে এসেছেন, আর ফিরে যাওয়ার মতো কোনও নৌকাও অবশিষ্ট নেই।

এই উপলব্ধিই শেষ পর্যন্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়—নিঃসঙ্গতা কোনও ব্যতিক্রম নয়; এটি মানুষের জীবনযাত্রার এক অনিবার্য, অথচ ভাগ করে নেওয়া অভিজ্ঞতা। আর সেই কারণেই ‘Writing from the Solitary’ শুধু একটি সাহিত্য সংকলন নয়, আমাদের সময়ের মানসিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে বোঝারও এক মূল্যবান দলিল।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles