বিলুপ্তির মুখে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবীর ১০০টি প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতিকে বাঁচাতে একজোট হলেন হলিউড তারকা লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও এবং অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস। ‘ফিনিক্স স্পিসিজ প্রজেক্ট’ নামে নতুন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে প্রাথমিকভাবে তৈরি হয়েছে ২০ কোটি মার্কিন ডলারের তহবিল। লক্ষ্য একটাই—হারিয়ে যাওয়ার আগেই বিপন্ন প্রজাতিগুলিকে ফিরিয়ে আনা।
বিশ্বজুড়ে জীববৈচিত্র্য দ্রুত কমছে। বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, দূষণ, অবৈধ শিকার, অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং আগ্রাসী বহিরাগত প্রজাতির বিস্তারের জেরে বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ এখন অস্তিত্বের সংকটে। এই পরিস্থিতিতে নতুন প্রকল্পটি শুধু কোনও একটি প্রজাতিকে বাঁচানোর উদ্যোগ নয়; বরং ভেঙে পড়তে বসা বাস্তুতন্ত্রগুলিকে রক্ষা করার বড় পরিকল্পনা।
১০০-কে বাঁচানোর লড়াই
ফিনিক্স স্পিসিজ প্রজেক্টের আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১০০টি অত্যন্ত বিপন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তালিকায় রয়েছে বিরল স্তন্যপায়ী, পাখি, সরীসৃপ, উভচর, সামুদ্রিক প্রাণী এবং উদ্ভিদ।
তবে সবার জন্য একই ফর্মুলা নয়। প্রজাতিভেদে তৈরি হবে আলাদা সংরক্ষণ পরিকল্পনা। কোথাও পুনর্গঠন করা হবে ধ্বংস হয়ে যাওয়া আবাসস্থল, কোথাও অবৈধ শিকার ও পাচার ঠেকাতে বাড়ানো হবে নজরদারি। আবার কোনও কোনও প্রজাতির সংখ্যা বাড়াতে বন্দি অবস্থায় প্রজনন করিয়ে পরে তাদের বনে বা প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
কারণ একটি প্রজাতি হারিয়ে যাওয়া মানেই শুধু একটি প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়া নয়। তার প্রভাব পড়তে পারে খাদ্যশৃঙ্খল থেকে বন, নদী, সমুদ্র এমনকি জলবায়ুর উপরও।
২০ কোটি ডলারের জোর
এই উদ্যোগে অর্থ ও সমর্থন দিয়েছেন লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও, জেফ বেজোসের Bezos Earth Fund এবং আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক দাতব্য ও সংরক্ষণবাদী প্রতিষ্ঠান।
প্রাথমিক তহবিলের পরিমাণ ২০ কোটি ডলার। প্রকল্পটি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিক অর্থায়নের পরিকল্পনা করেছে। সংরক্ষণ প্রকল্পের ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অর্থের অভাবে বহু উদ্যোগ মাঝপথে থেমে যায়। গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ কিংবা স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করার কাজ চালিয়ে যাওয়াও হয়ে ওঠে কঠিন।
নতুন তহবিল সেই সমস্যাটিই কাটিয়ে উঠতে চাইছে।
ডিক্যাপ্রিও-বেজোসের ‘সবুজ’ জোট
পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে লিওনার্দো ডিক্যাপ্রিও দীর্ঘদিন ধরেই সরব। তাঁর প্রতিষ্ঠিত ফাউন্ডেশন বিভিন্ন বন্যপ্রাণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে।
অন্যদিকে জেফ বেজোসের Bezos Earth Fund বন সংরক্ষণ, কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং পরিবেশ রক্ষার বিভিন্ন উদ্যোগে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে। ফলে দু’জনের সমর্থন ফিনিক্স প্রকল্পকে আন্তর্জাতিক স্তরে আরও বড় পরিসর দিয়েছে।
বিজ্ঞানও নামছে মাঠে
এই উদ্যোগের বিশেষত্ব শুধু বিপুল অর্থে নয়। সর্বাধুনিক প্রযুক্তিকেও সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জিনগত বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ, উপগ্রহ প্রযুক্তি এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ—সবকিছুকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।
উদ্যোক্তাদের যুক্তি, কোনও প্রজাতিকে বাঁচাতে শুধু অর্থ ঢাললেই হবে না। দরকার নির্ভুল বিজ্ঞান, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং যে অঞ্চলে সেই প্রজাতি রয়েছে, সেখানকার মানুষের সক্রিয় সহযোগিতা।
শুধু ১০০-তে থামলে চলবে?
প্রকল্পটির উচ্চাকাঙ্ক্ষা বড় হলেও পরিবেশবিদদের সতর্কবার্তাও রয়েছে। পৃথিবীতে প্রায় ১০ লক্ষ প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
সেখানে ১০০টি প্রজাতিকে বাঁচানো নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য হতে পারে, কিন্তু সমস্যার শিকড় কাটবে না। বন ধ্বংস, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ শিকার এবং বাস্তুতন্ত্রের ক্রমাগত ক্ষয় বন্ধ করা না গেলে নতুন নতুন প্রজাতি একই বিপদের মুখে পড়বে।
অর্থাৎ, ১০০টি প্রজাতিকে বাঁচানো জরুরি, কিন্তু ১০০টি দিয়ে লড়াই শেষ নয়।
কেন ‘ফিনিক্স’?
প্রকল্পের নামের মধ্যেই রয়েছে তার দর্শন। ‘ফিনিক্স’—অগ্নিভস্ম থেকে পুনর্জন্ম নেওয়া পৌরাণিক পাখি। সেই প্রতীককেই সামনে রেখে উদ্যোক্তাদের আশা, বিলুপ্তির কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রজাতিগুলিও একদিন ফিরে পাবে তাদের হারানো অস্তিত্ব।
প্রকৃতির ক্ষেত্রে অবশ্য সেই পুনর্জন্ম কোনও জাদুতে হবে না। লাগবে বিজ্ঞান, অর্থ, সময় এবং মানুষের ইচ্ছাশক্তি।
ফিনিক্স স্পিসিজ প্রজেক্ট সেই চারটিকেই এক ছাতার নীচে আনার চেষ্টা। এখন দেখার, ২০ কোটি ডলারের এই উদ্যোগ সত্যিই কতগুলি প্রজাতিকে বিলুপ্তির তালিকা থেকে জীবনের তালিকায় ফিরিয়ে আনতে পারে।