খবর

লিভ-ইনেও কি মিলবে ৪৯৮এ-র সুরক্ষা?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বিয়ে নয়, ‘বিবাহসদৃশ’ সম্পর্কেও নিষ্ঠুরতার শাস্তি?
  • গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের নজর বিয়ে না করেও একসঙ্গে সংসার করছেন বহু নারী-পুরুষ।
  • বিশেষ করে শহুরে ভারতে লিভ-ইন সম্পর্ক এখন আর বিরল কোনও সামাজিক ঘটনা নয়।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বিয়ে নয়, ‘বিবাহসদৃশ’ সম্পর্কেও নিষ্ঠুরতার শাস্তি? গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের নজর

বিয়ে না করেও একসঙ্গে সংসার করছেন বহু নারী-পুরুষ। বিশেষ করে শহুরে ভারতে লিভ-ইন সম্পর্ক এখন আর বিরল কোনও সামাজিক ঘটনা নয়। কিন্তু এমন সম্পর্কে সঙ্গীর হাতে নিষ্ঠুরতা বা নির্যাতনের শিকার হলে আইনের সুরক্ষা কতটা মিলবে?

এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নই এখন সুপ্রিম কোর্টের সামনে।

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে শীর্ষ আদালত সরাসরি জানতে চেয়েছে—লিভ-ইন সম্পর্কে, বা ‘বিবাহের প্রকৃতির সম্পর্ক’-এ থাকা কোনও পুরুষের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারার অধীনে মামলা করা যায় কি না। একই প্রশ্ন উঠেছে তার উত্তরসূরি ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র ৮৫ ধারার ক্ষেত্রেও। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করে কেন্দ্রকে মামলায় পক্ষ করা হয়েছে এবং অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেলকে আদালতকে সহায়তা করতে বলা হয়েছে।

অর্থাৎ, এখনও চূড়ান্ত রায় আসেনি। কিন্তু আদালতের সামনে থাকা প্রশ্নটি ভবিষ্যতে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা নারীদের আইনি সুরক্ষার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

৪৯৮এ থেকে BNS ৮৫

ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৮এ ধারা মূলত স্বামী বা স্বামীর আত্মীয়ের হাতে কোনও বিবাহিত নারীর ওপর নিষ্ঠুরতাকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করত। ২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া BNS-এ এর সমতুল্য বিধান রয়েছে ৮৫ ধারায়। সেখানে স্বামী বা তাঁর আত্মীয়ের হাতে নারীর ওপর নিষ্ঠুরতার জন্য সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড এবং জরিমানার বিধান রয়েছে। BNS-এর ৮৬ ধারায় ‘নিষ্ঠুরতা’র সংজ্ঞাও দেওয়া হয়েছে।

প্রশ্ন হল, আইনের ভাষায় ‘স্বামী’ বলতে কি শুধু বৈধ বিবাহের সম্পর্ককেই বোঝাবে? নাকি দীর্ঘদিন ধরে বিবাহিত দম্পতির মতো সংসার করা কোনও লিভ-ইন সঙ্গীকেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই বিধানের আওতায় আনা যাবে?

এই প্রশ্নের উত্তরই এখন বিচারাধীন।

লিভ-ইন মানেই অবশ্যই ৪৯৮এ নয়

এখানেই রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আইনি সূক্ষ্মতা।

প্রতিটি লিভ-ইন সম্পর্ককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘বিবাহসদৃশ সম্পর্ক’ বলা যায় না। সম্পর্কের স্থায়িত্ব, দু’জনের একসঙ্গে বসবাস, সামাজিকভাবে নিজেদের দম্পতি হিসেবে উপস্থাপন করা, আর্থিক ও পারিবারিক নির্ভরতা-সহ বিভিন্ন বিষয় আদালতকে বিবেচনা করতে হতে পারে।

অর্থাৎ, শুধু একই বাড়িতে থাকা বা সম্পর্ক থাকা যথেষ্ট হবে কি না—সেটিও মামলার তথ্য ও পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।

আদালতের পুরনো অবস্থান কী?

লিভ-ইন সম্পর্ক নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের অবস্থান অবশ্য একেবারে নতুন নয়।

আগের একাধিক রায়ে আদালত প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষের নিজেদের পছন্দমতো একসঙ্গে থাকার অধিকারকে ব্যক্তিস্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। পাশাপাশি গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইন, ২০০৫-এর ক্ষেত্রে ‘বিবাহের প্রকৃতির সম্পর্ক’-এর ধারণাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

২০১৩ সালেই সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল, লিভ-ইন সম্পর্ককে অপরাধ বা পাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই এবং এমন সম্পর্কে থাকা নারীদের সুরক্ষার জন্য আইনি কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে।

তবে সেই অবস্থান আর ফৌজদারি আইনের ৪৯৮এ বা BNS ৮৫ ধারাকে সরাসরি লিভ-ইন সম্পর্কে প্রয়োগ করার প্রশ্ন—দুটি এক জিনিস নয়।

নতুন বিতর্ক কোথায়?

এই আইনি পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে।

একদিকে, আইন বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের যুক্তি—কোনও নারী যদি দীর্ঘদিন সঙ্গীর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের মতো জীবনযাপন করেন এবং সেই সম্পর্কে গুরুতর নিষ্ঠুরতার শিকার হন, শুধুমাত্র বিয়ের শংসাপত্র নেই বলে তাঁকে ফৌজদারি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা ভেবে দেখা দরকার।

অন্যদিকে, ৪৯৮এ-র অপব্যবহার নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট অতীতেও সতর্ক করেছে। আদালত স্পষ্ট করেছে, কেবল সাধারণ বা অস্পষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে ফৌজদারি মামলা চালিয়ে যাওয়া উচিত নয় এবং প্রতিটি মামলায় নির্দিষ্ট তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগের উপাদান বিচার করতে হবে।

ফলে সুরক্ষা বাড়ানোর সঙ্গে অপব্যবহার ঠেকানোর ভারসাম্যও আদালতের সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সামনে কী হতে পারে?

এই মামলার চূড়ান্ত রায় লিভ-ইন সম্পর্কের আইনি অবস্থান নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে।

যদি আদালত নির্দিষ্ট ধরনের ‘বিবাহসদৃশ সম্পর্ক’-এর ক্ষেত্রে BNS ৮৫ প্রয়োগের পথ খুলে দেয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি লিভ-ইন সম্পর্কে নির্যাতনের অভিযোগের আইনি প্রতিকারের ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

আবার আদালত যদি আইনের বর্তমান ভাষাকে কঠোরভাবে ব্যাখ্যা করে, তাহলে লিভ-ইন সম্পর্কে থাকা নারীদের সুরক্ষার প্রশ্নটি মূলত গার্হস্থ্য হিংসা প্রতিরোধ আইনসহ অন্যান্য আইনি ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করবে।

তাই আপাতত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হল—সুপ্রিম কোর্ট এখনও প্রশ্নটির চূড়ান্ত উত্তর দেয়নি।

তবে মামলাটি একটি বদলে যাওয়া সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে আইনের পুরনো কাঠামোর সংঘাতকে সামনে এনে দিয়েছে।

বিয়ে ছাড়াও যখন বহু মানুষ সংসারের মতো সম্পর্কে থাকছেন, তখন সেই সম্পর্কে নির্যাতনের অভিযোগ উঠলে আইনের সুরক্ষা কোথায় শেষ হবে—আর সম্পর্কের সামাজিক বাস্তবতা কোথা থেকে আইনি স্বীকৃতির দাবি তুলবে?

সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী রায়ে সেই সীমারেখাই আরও স্পষ্ট হতে পারে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles