Table of Contents
প্রশ্নফাঁস, জাতপাতের অঙ্ক, প্রার্থী নিয়ে ক্ষোভ—বিজেপির দুই দুর্গেই কি জমেছে ভোটারদের অসন্তোষ?
বিহারের বাঁকিপুর এবং মধ্যপ্রদেশের দাতিয়া—দুটি আসনই বিজেপির কাছে ছিল যথেষ্ট নিরাপদ। কিন্তু উপনির্বাচনের ফল সেই নিরাপত্তার ধারণাতেই বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে। দুই কেন্দ্রেই পরাজয়ের নেপথ্যে একাধিক কারণ কাজ করেছে বলে মনে করছেন বিজেপিরই কয়েকজন নেতা।
তাঁদের বিশ্লেষণে উঠে আসছে একগুচ্ছ অসন্তোষের কথা—উচ্চবর্ণের ভোটারদের একাংশের ক্ষোভ, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস নিয়ে ছাত্রছাত্রীদের রাগ, অযোধ্যার রামমন্দিরে অনুদান চুরির বিতর্ক, জাতপাতের সমীকরণে বদল, স্থানীয় গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং প্রার্থী বাছাইয়ের ভুল।
সব মিলিয়ে বিজেপির দুই পুরনো ঘাঁটিতেই কি জমেছিল ‘অ্যান্টি-ইনকামবেন্সি’র চাপ?
বাঁকিপুরে দুর্গে ধস
বাঁকিপুর আসনটি আগে বিজেপির রাজ্য সভাপতি নীতিন নবীনের দখলে ছিল। এ বছর তিনি রাজ্যসভায় নির্বাচিত হওয়ার পর আসনটি খালি হয়। বিজেপি তাই শুরু থেকেই এই কেন্দ্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিল।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রশান্ত কিশোর বিজেপির হাত থেকে আসনটি ছিনিয়ে নেন।
বাঁকিপুরে বিজেপির জন্য লড়াইটা সহজ হওয়ার কথা ছিল না ঠিকই, কিন্তু এতটা কঠিন হবে—দলের অন্দরের অনেকেই তা ভাবেননি। কারণ এই কেন্দ্রে ৪২ শতাংশেরও বেশি ভোটার উচ্চবর্ণের। বিজেপির পাশাপাশি জেডিইউ এবং লোক জনশক্তি পার্টিও প্রচারে জোর দিয়েছিল।
তবু ফল বলছে, কোনও একটি জাতিগত গোষ্ঠীও বিজেপির প্রার্থী নীরজ কুমারের পক্ষে পুরোপুরি একজোট হয়নি।
জাতপাতের অঙ্কে গলদ
বিজেপির এক নেতার ব্যাখ্যায়, সমস্যাটা ছিল সর্বস্তরে।
তাঁর মতে, প্রায় প্রতিটি জাতিগত গোষ্ঠীতেই কিছুটা করে ভোট সরে গেছে। নীতীশ কুমারের পরিবর্তে সম্রাট চৌধুরীকে মুখ্যমন্ত্রী করা নিয়ে কুর্মি সম্প্রদায়ের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। উচ্চবর্ণের ভোটারদেরও একটি অংশ প্রশান্ত কিশোরের দিকে ঝুঁকেছেন।
মুসলিম ভোট বিজেপির পক্ষে ছিল না বলেই দলের নেতারা মনে করছেন। দলিত ভোট তুলনামূলকভাবে ধরে রাখা গেলেও মহিলা ভোটারদের মধ্যেও সমর্থন কমেছে বলে তাঁদের দাবি।
অর্থাৎ বিজেপির চেনা সামাজিক জোটের একাধিক স্তরেই তৈরি হয়েছে ফাটল।
প্রশ্নফাঁসেও ক্ষোভ
বাঁকিপুরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস।
দলের নেতাদের একাংশের মতে, সাম্প্রতিক নিট-সহ বিভিন্ন পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ছাত্রছাত্রী এবং তাঁদের পরিবারের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি করেছে, তার প্রভাব ভোটেও পড়তে পারে।
বাঁকিপুরে রয়েছে অসংখ্য কোচিং সেন্টার। বিহারের বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী বিভিন্ন সরকারি চাকরি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নেন। ফলে পরীক্ষা ব্যবস্থা, প্রশ্নফাঁস এবং চাকরির সুযোগের মতো বিষয়গুলি এখানে নিছক রাজনৈতিক ইস্যু নয়—অনেক পরিবারের কাছে সরাসরি জীবিকার প্রশ্ন।
এক বিজেপি নেতার কথায়, প্রশ্নফাঁস নিয়ে ক্ষোভ বাঁকিপুরের ভোটারদের মধ্যেও যথেষ্ট তীব্র ছিল।
উচ্চবর্ণের ক্ষোভও?
বিজেপির অন্দরের আরেকটি বিশ্লেষণ আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
দলের এক নেতার মতে, উচ্চবর্ণের ভোটারদের একাংশের অসন্তোষের পিছনে একাধিক সিদ্ধান্ত কাজ করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে জাতিভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ‘সমতা কমিটি’ গঠনের ইউজিসির বিতর্কিত নির্দেশিকা এবং সম্রাট চৌধুরীকে মুখ্যমন্ত্রী করার সিদ্ধান্ত—দুটিই উচ্চবর্ণের একাংশের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিল বলে তাঁর দাবি।
ওই নেতা বলেন, কুর্মি সম্প্রদায়ের একাংশ নীতীশ কুমারের অপসারণে ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। অন্যদিকে শিক্ষিত ও সচেতন বলে পরিচিত উচ্চবর্ণের ভোটারদের একাংশ সম্রাট চৌধুরীকে মুখ্যমন্ত্রী করার সিদ্ধান্তে খুশি ছিলেন না। ইউজিসির নির্দেশিকা সেই ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে দেয় বলে তাঁর দাবি।
যদিও এই ব্যাখ্যাগুলি দলের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন—এর সবকটি কারণ যে ভোটের ফলাফলে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
প্রার্থী বাছাইয়েও ধাক্কা
বিজেপির এক সাংসদের মতে, বাঁকিপুরে সমস্যার শুরু প্রার্থী বাছাই থেকেই।
প্রথমে অভিষেক কুমার সিনহার নাম ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু বিরোধীরা তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারির অভিযোগ তুলে প্রচারে সরব হলে শেষ পর্যন্ত তাঁর প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে হয়।
এরপর প্রার্থী বদলাতে হয়। দলের একাংশের মতে, এই ঘটনায় শুরুতেই বিজেপির প্রচারে ধাক্কা লাগে এবং ভোটারদের কাছে প্রার্থী নিয়ে বিভ্রান্তিও তৈরি হয়।
এর সঙ্গে স্থানীয় স্তরের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং কয়েকজন শীর্ষ নেতার মন্তব্য নিয়ে অসন্তোষ যোগ হয়েছিল বলেও দলের নেতাদের একাংশের দাবি।
দাতিয়াতেও একই ছবি?
মধ্যপ্রদেশের দাতিয়ার গল্প কিছুটা আলাদা হলেও সেখানে বিজেপির সমস্যার তালিকায় প্রার্থী বাছাই এবং জাতপাতের সমীকরণই উঠে আসছে।
দাতিয়া দীর্ঘদিন বিজেপির শক্ত ঘাঁটি। কিন্তু এবার কংগ্রেসের কুঁওয়ার ঘনশ্যাম সিংহ আসনটি ধরে রাখতে সক্ষম হন।
এখানেও প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দলের অন্দরে অসন্তোষ ছিল। বর্ষীয়ান নেতা নরোত্তম মিশ্রকে টিকিট না দেওয়া নিয়ে ক্ষোভ ছড়ায়। ২০২৩ সালে তিনি নির্বাচনে হেরে গেলেও তার আগে ২০০৮ সাল থেকে টানা তিনবার এই আসন জিতেছিলেন।
তবে মধ্যপ্রদেশের এক বিজেপি বিধায়কের দাবি, নরোত্তম মিশ্রকে প্রার্থী করলেও ফল বদলাত না। কারণ উচ্চবর্ণের ভোটারদের একাংশ ইতিমধ্যেই বিজেপির থেকে দূরে সরে গিয়েছিলেন।
কুশওয়াহা ভোটেও ধাক্কা
দাতিয়ায় আরেকটি বিষয় বিজেপির জন্য সমস্যা তৈরি করেছে বলে দলের এক নেতার দাবি।
খুন হওয়া বিজেপি নেতা কল্লু কুশওয়াহার স্ত্রী প্রকাশ্যে মুখ্যমন্ত্রী মোহন যাদবের বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের আড়াল করার অভিযোগ তোলার পর কুশওয়াহা সম্প্রদায়ের বড় অংশ কংগ্রেসের দিকে ঝুঁকে পড়ে বলে তিনি মনে করছেন।
তাঁর বক্তব্য, কোনও নেতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আর দলের সাংগঠনিক শক্তি এক নয়।
নরোত্তম মিশ্র নিজের ব্যক্তিগত প্রভাব ধরে রাখলেও সাংগঠনিক স্তরে সেই প্রভাবকে যথেষ্ট শক্তিতে পরিণত করতে পারেননি বলেই দলের নেতৃত্ব মনে করেছিল—এমন দাবিও উঠে এসেছে।
বিজেপির সামনে সতর্কবার্তা
দুটি রাজ্য, দুটি আলাদা আসন—কিন্তু পরাজয়ের পর বিজেপির অন্দরের আলোচনায় উঠে আসছে বেশ কিছু মিল।
ভোটব্যাঙ্কে ফাটল, প্রার্থী নিয়ে অসন্তোষ, জাতপাতের বদলে যাওয়া অঙ্ক, যুবসমাজের ক্ষোভ এবং স্থানীয় সংগঠনের দুর্বলতা—সব মিলিয়েই কি বিজেপির দুর্গে ধস?
দলের রাজ্য সভাপতি নীতিন নবীনও ফলাফলকে হালকাভাবে দেখছেন না। সামাজিক মাধ্যমে তিনি জানিয়েছেন, জনগণের রায় বিজেপি মাথা পেতে নিচ্ছে এবং বাঁকিপুর ও দাতিয়ার ফলাফল অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করা হবে।
মানুষের আস্থা আরও শক্তিশালী করতে নতুন উদ্যমে কাজ করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
শুধু হার নয়, বার্তাও
উপনির্বাচনের ফলকে সরাসরি বড় নির্বাচনের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কিন্তু পরপর দুই শক্ত ঘাঁটিতে ধাক্কা বিজেপির জন্য নিঃসন্দেহে সতর্কবার্তা।
বাঁকিপুরে প্রশান্ত কিশোরের উত্থান দেখিয়ে দিল, বিজেপির চেনা ভোটের অঙ্কে নতুন প্রতিদ্বন্দ্বী ঢুকে পড়েছে। দাতিয়ায় কংগ্রেসের জয় আবার মনে করিয়ে দিল, পুরনো সংগঠন ও ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকলেই আসন নিরাপদ থাকে না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই একটাই—এই হার কি সাময়িক ধাক্কা, নাকি বিজেপির পুরনো ভোটব্যাঙ্কে সত্যিই ফাটল ধরতে শুরু করেছে?