বাংলাস্ফিয়ার: রেললাইন পারাপারের সময় দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই শিয়ালদহ ডিভিশনের অন্যতম বড় সমস্যা। দেশের মধ্যে রেললাইন অতিক্রম করতে গিয়ে মৃত্যুর সংখ্যার নিরিখে শিয়ালদহ বহু বছর ধরেই শীর্ষে রয়েছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মোকাবিলায় বড় পদক্ষেপ করতে চলেছে ভারতীয় রেল। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলিতে সাতটি নতুন আন্ডারপাস বা সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে যাত্রী ও স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদে রেললাইন পার হতে পারেন এবং অবৈধভাবে ট্র্যাক পারাপারের প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, শিয়ালদহ ডিভিশনের বিভিন্ন ব্যস্ত স্টেশন এবং জনবসতিপূর্ণ এলাকায় প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সময় বাঁচানোর জন্য সরাসরি রেললাইন পার হন। অথচ সেই সময়ই দ্রুতগতির ট্রেন এসে পড়ায় বহু মানুষ প্রাণ হারান বা গুরুতর আহত হন। রেল কর্তৃপক্ষের মতে, অধিকাংশ দুর্ঘটনাই ঘটে অসতর্কতা এবং অনুমোদিত পারাপার পথ ব্যবহার না করার কারণে।
এই পরিস্থিতি বদলাতে যে সাতটি আন্ডারপাস নির্মাণের পরিকল্পনা হয়েছে, সেগুলি মূলত সেই সব জায়গায় হবে যেখানে দীর্ঘদিন ধরে দুর্ঘটনার হার বেশি। স্থানীয় মানুষের যাতায়াতের ধরণ, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করেই এই স্থানগুলি চিহ্নিত করা হয়েছে।
রেল আধিকারিকদের মতে, শুধুমাত্র বেড়া বা সতর্কতামূলক বোর্ড বসিয়ে সমস্যা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব নয়। মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য নিরাপদ বিকল্প পথ তৈরি করতে পারলেই অবৈধ ট্র্যাক পারাপার কমবে। সেই কারণেই সাবওয়ে নির্মাণকে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শিয়ালদহ ডিভিশনে প্রতিদিন কয়েকশো লোকাল এবং দূরপাল্লার ট্রেন চলাচল করে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ট্রেনের ঘন ঘন যাতায়াতের ফলে লাইনের উপর ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে যাত্রীরা ট্রেনের ফাঁক গলে বা একাধিক লাইন একসঙ্গে পার হওয়ার চেষ্টা করেন। হেডফোনে গান শোনা, মোবাইলে কথা বলা কিংবা তাড়াহুড়োও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
রেল ইতিমধ্যেই বিভিন্ন স্টেশনে সচেতনতা প্রচার, মাইকিং, পোস্টার, ভিডিও প্রচার, রেল সুরক্ষা বাহিনীর নজরদারি এবং বেআইনি পারাপারের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছে। তবুও প্রত্যাশিত ফল মেলেনি। তাই এবার পরিকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আন্ডারপাস তৈরি করলেই হবে না, সেগুলি এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যাতে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সেই পথ ব্যবহার করতে উৎসাহিত হন। পর্যাপ্ত আলো, জলনিকাশির ব্যবস্থা, প্রতিবন্ধী-বান্ধব নকশা, সিসিটিভি নজরদারি এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকলে ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়বে।
রেলের আরেকটি লক্ষ্য হল স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় অনিয়ন্ত্রিত চলাচল কমিয়ে ট্রেন চলাচলকে আরও নিরাপদ ও সময়ানুবর্তী করা। ট্র্যাকে দুর্ঘটনা ঘটলে শুধু প্রাণহানিই নয়, দীর্ঘ সময় ট্রেন পরিষেবাও ব্যাহত হয়। ফলে হাজার হাজার যাত্রী সমস্যায় পড়েন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ অবশ্য বহুদিন ধরেই নিরাপদ পারাপারের দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁদের অভিযোগ, অনেক জায়গায় ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও তা দূরে হওয়ায় বা বেশি সিঁড়ি ভাঙতে হওয়ায় মানুষ শর্টকাট হিসেবে ট্র্যাক ব্যবহার করেন। আন্ডারপাস তৈরি হলে সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে বলে তাঁদের আশা।
রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রকল্পের কাজ ধাপে ধাপে শুরু হবে। নির্মাণের সময় ট্রেন চলাচলে যাতে ন্যূনতম প্রভাব পড়ে, সেদিকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী আরও দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় একই ধরনের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।
দেশে রেল নিরাপত্তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ দুর্ঘটনার পরে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার চেয়ে দুর্ঘটনা প্রতিরোধই অনেক বেশি কার্যকর। শিয়ালদহে সাতটি নতুন আন্ডারপাস নির্মিত হলে রেললাইন পারাপারের সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে এবং বহু মূল্যবান প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব হবে—এমনটাই আশা রেল কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের।