গাজা সমঝোতা: চুক্তি মানতে নেতানিয়াহুর ওপর ট্রাম্পের চাপ

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি নতুন সমঝোতার পক্ষে জোর দিচ্ছেন, যেখানে হামাস ধাপে ধাপে অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং একইসঙ্গে…
- তবে এই প্রস্তাব ইতিমধ্যেই ইজরায়েলের কট্টর ডানপন্থী শিবিরের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে।
- গত কয়েক মাস ধরে ট্রাম্পের ঘোষিত ২০২৫ সালের শান্তি পরিকল্পনা কার্যত স্থবির হয়ে ছিল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি নতুন সমঝোতার পক্ষে জোর দিচ্ছেন, যেখানে হামাস ধাপে ধাপে অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং একইসঙ্গে গাজা উপত্যকা থেকে ইজরায়েলি বাহিনীও পর্যায়ক্রমে সরে যাবে। তবে এই প্রস্তাব ইতিমধ্যেই ইজরায়েলের কট্টর ডানপন্থী শিবিরের তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়েছে।
গত কয়েক মাস ধরে ট্রাম্পের ঘোষিত ২০২৫ সালের শান্তি পরিকল্পনা কার্যত স্থবির হয়ে ছিল। কিন্তু ৩০ জুলাই তিনি ঘোষণা করেন যে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে একটি “ঐতিহাসিক” সমঝোতা হয়েছে। এর পরই গাজা প্রশ্ন আবার আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে।
নতুন প্রস্তাবের বড় পরিবর্তন হল, এতদিন আমেরিকা হামাসের নিরস্ত্রীকরণকে গাজার পুনর্গঠন ও নতুন প্রশাসন গঠনের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখলেও এবার ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হামাসের অস্ত্র সমর্পণ—দুই প্রক্রিয়াকেই সমান্তরালভাবে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ক্যাম্প ডেভিডে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, “ইজরায়েল এই চুক্তিতে খুবই খুশি।” তবে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির স্পষ্ট ভাষায় এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “এটি গ্রহণযোগ্য নয়। গাজায় যুদ্ধ চলতেই হবে। ইজরায়েলকে জিততেই হবে।”
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সামরিক দুর্বলতা এবং হামাসের ওপর তাদের প্রভাব কমে যাওয়ায় এই সমঝোতা সম্ভব হয়েছে। তাঁর কথায়, “চার-পাঁচ মাস আগে এমন একটি চুক্তি অসম্ভব ছিল।”
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে বাস্তব চিত্র আরও জটিল। ইজরায়েলের অব্যাহত সামরিক অভিযানে হামাসের নেতৃত্বের বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সংগঠনটি এখন গাজার মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এলাকায় কার্যকরভাবে সক্রিয়। কিন্তু গবেষকদের মতে হামাস এখন যে অবস্থান নিয়েছে, মার্চ মাস থেকেই তারা মূলত সেই অবস্থানেই ছিল।
অস্ত্র জমা দেবে নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে
ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত বোর্ড অব পিস যে রূপরেখা প্রকাশ করেছে, তাতে বলা হয়েছে, সব পক্ষ সম্মতি দেওয়ার ১৪ দিনের মধ্যে ধাপে ধাপে ভারী অস্ত্র নিষ্ক্রিয় করে সংরক্ষণ করা হবে।
এই অস্ত্র গ্রহণ করবে গাজার জন্য প্রস্তাবিত নতুন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট প্রশাসন ন্যাশনাল কমিটি ফর অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ইন গাজা (এনসিএজি)। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক বাহিনীর উপস্থিতিতে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
রূপরেখায় বলা হয়েছে, অস্ত্র সংগ্রহের প্রক্রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইজরায়েলও নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহার করবে। তবে অস্ত্র ইজরায়েলের হাতে তুলে দেওয়া হবে না; সেগুলি স্থায়ীভাবে অকেজো করে সংরক্ষণ করা হবে।
তবে হালকা অস্ত্র—বিশেষ করে একে-৪৭ ধরনের রাইফেলের ভবিষ্যৎ কী হবে, সে বিষয়ে পরিকল্পনায় স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। এই অস্পষ্টতাই ইজরায়েলের নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
ইজরায়েলের আপত্তি
ইজরায়েলি সরকার মনে করে, হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র হওয়ার আগে সেনা প্রত্যাহার করা উচিত নয়। কারণ হালকা অস্ত্র থেকে গেলে শহুরে গেরিলা যুদ্ধ অব্যাহত থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু নিজেই রাজনৈতিকভাবে কঠিন অবস্থায় পড়েছেন। এতদিন তিনি দাবি করে এসেছেন যে গাজার দখল করা এলাকা থেকে ইজরায়েল কখনও সরে যাবে না। বর্তমানে গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা ইজরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
অক্টোবরে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে এই অবস্থান থেকে সরে আসা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাবমূর্তির জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
ট্রাম্পকে সরাসরি না বলতে পারছেন না নেতানিয়াহু
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেতানিয়াহু এই প্রস্তাবে সরাসরি ‘না’ বলতেও পারছেন না। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আগের তুলনায় কিছুটা শীতল হয়েছে।
ইজরায়েলি বিশ্লেষক মাইকেল মিলশটেইনের মতে, ট্রাম্প অত্যন্ত অনিশ্চিত স্বভাবের নেতা। তাঁকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করলে তিনি ইরান নীতি বদলে দিতে পারেন, এমনকি ইজরায়েলের প্রতি সামরিক সহায়তাও কমিয়ে দিতে পারেন।
একজন ইউরোপীয় কূটনীতিকের মন্তব্য, নেতানিয়াহু সম্ভবত প্রকাশ্যে সমর্থন বা বিরোধিতা—কোনওটাই করবেন না; বরং আলোচনা দীর্ঘায়িত করে সময় নষ্ট করার কৌশল নেবেন।
গাজায় মানুষের আস্থা নেই
এদিকে গাজায় বোমাবর্ষণ অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর থেকে ১,২০০-রও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গাজার সাংবাদিক রামি আবু জামুস বলেন, “হামাস বলছে, ইজরায়েল সেনা না সরালে নিরস্ত্রীকরণ হবে না। আবার ইজরায়েল বলছে, হামাস আগে অস্ত্র ছাড়ুক। শেষ পর্যন্ত আমরা আবার একই অচলাবস্থায় ফিরে এসেছি।”
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



