Table of Contents
চীনে বিরল জিনগত রোগে আক্রান্ত ছয় বছরের এক কন্যাশিশুর পরীক্ষামূলক জিন-থেরাপির পর মৃত্যু ঘিরে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলে। বিজ্ঞান সাময়িকী Science এবং Retraction Watch-এর যৌথ তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের মার্চে ‘মেই’ (ছদ্মনাম) নামে পরিচিত ওই শিশুর মৃত্যু হয় এমন একটি ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার পর, যেখানে নিরাপত্তা ও গবেষণার নৈতিকতার একাধিক নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনাটি শুধু একটি পরীক্ষামূলক চিকিৎসার ব্যর্থতা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রাক-ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার তথ্য গোপন রাখা, নৈতিক অনুমোদনের প্রক্রিয়া, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে স্বচ্ছতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
বিরল রোগ, শেষ আশায় জিন-থেরাপি
মেই স্নাইডার্স-ব্লক-ক্যাম্পো সিনড্রোমে আক্রান্ত ছিল। অত্যন্ত বিরল এই জিনগত রোগে এখনও পর্যন্ত বিশ্বে ৩০০ জনেরও কম রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। রোগটি সাধারণত প্রাণঘাতী নয়, কিন্তু শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুতর প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। অনেকের মধ্যে অটিজম-সদৃশ উপসর্গও দেখা যায়।
রোগটির জন্য দায়ী ছিল ডিএনএ-র মাত্র একটি বেস বা ‘অক্ষর’-এর পরিবর্তন।
২০২৩ সালে মেয়ের রোগ শনাক্ত হওয়ার পর তার বাবা-মা যোগাযোগ করেন সাংহাই জিয়াওতং বিশ্ববিদ্যালয়-সংযুক্ত সিনহুয়া হাসপাতালের স্নায়ুবিজ্ঞানী কিউ জিলংয়ের সঙ্গে। ওই সময় কিউ রেট সিনড্রোমের চিকিৎসায় একটি জিন-থেরাপির পেটেন্টের জন্য আবেদন করেছিলেন। মেইয়ের রোগের সঙ্গে সেই রোগের কিছু জিনগত সাদৃশ্য ছিল।
সেখান থেকেই শুরু হয় পরীক্ষামূলক চিকিৎসার পরিকল্পনা।
এক অক্ষরের জিন বদলানোর চেষ্টা
চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়েছিল অত্যাধুনিক বেস এডিটিং প্রযুক্তি। জিন সম্পাদনার এই পদ্ধতিতে জিনোমের একটি নির্দিষ্ট ডিএনএ বেস পরিবর্তন করার চেষ্টা করা হয়। সেই পরিবর্তন নির্দিষ্ট কোষে পৌঁছে দিতে ব্যবহার করা হয়েছিল পরিবর্তিত ভাইরাসকে বাহক হিসেবে।
চিকিৎসাটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় মেইয়ের পরিবার গবেষণার জন্য বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আর্থিক সহায়তা জোগাড় করে। সব মিলিয়ে প্রায় ৭ লক্ষ ৫৬ হাজার ইউরো বা ৭ কোটিরও বেশি টাকা খরচ হয়।
২০২৪ সালের শেষ দিকে ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গিয়েছিল। গবেষকরা মেইয়ের মতো একই জিনগত ত্রুটি তৈরি করে সেটি সংশোধন করতে সক্ষম হন। বানরের ওপর পরীক্ষাতেও দেখা যায়, ব্যবহৃত ভাইরাল ভেক্টর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোষে পৌঁছতে পারছে।
এই ফলাফলের ভিত্তিতেই সিনহুয়া হাসপাতালের নৈতিকতা কমিটি মেইয়ের ওপর পরীক্ষামূলক চিকিৎসার অনুমোদন দেয়।
কিন্তু এখানেই উঠে আসে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন।
বানরের শরীরে বিপদের সংকেত, তবু এগোল পরীক্ষা
পরবর্তীতে জানা যায়, বানরের ওপর চালানো টক্সিকোলজি বা বিষক্রিয়া পরীক্ষায় চারটি প্রাণীরই যকৃত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। একটি বানরের কিডনিতেও গুরুতর ক্ষতি হয়েছিল।
তদন্তে অভিযোগ, এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নৈতিকতা কমিটির মূল্যায়নে যথাযথভাবে বিবেচিত হয়নি।
২০২৫ সালের মার্চে মেইয়ের মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের তরলে বা সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডে পরীক্ষামূলক চিকিৎসাটি প্রয়োগ করা হয়।
তার মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই মৃত্যু হয় শিশুটির।
চিকিৎসার পর মেইয়ের কিডনির ক্ষতির লক্ষণ দেখা দিয়েছিল—যে ধরনের ক্ষতি আগেই বানরের পরীক্ষায় লক্ষ্য করা হয়েছিল। হাসপাতালের নৈতিকতা কমিটি পরে জানায়, চিকিৎসাটিই নিঃসন্দেহে মৃত্যুর কারণ। চিকিৎসার ফলে ক্ষুদ্র রক্তনালির মধ্যে প্লেটলেট জমাট বেঁধে থ্রম্বোটিক মাইক্রোঅ্যাঞ্জিওপ্যাথি নামে একটি গুরুতর জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে জানানো হয়।
মৃত্যুর খবরও রইল আড়ালে
ঘটনার পর দীর্ঘ সময় তা প্রকাশ্যে আসেনি। মার্কিন ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল রেজিস্ট্রিতে গবেষণাটির তথ্য ২০২৫ সালের মার্চের পর আর হালনাগাদ করা হয়নি। সেখানে উল্লেখ ছিল, পরীক্ষায় মাত্র একজন শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
মেইয়ের মৃত্যুর পর তার বাবা-মা গবেষণার ইঁদুর-সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি প্রত্যাহারের অনুরোধ করেছিলেন। তাঁদের আশঙ্কা ছিল, গবেষণার ফল প্রকাশিত হলে অন্য পরিবারগুলির মধ্যে এই চিকিৎসা নিয়ে মিথ্যা আশা তৈরি হতে পারে।
কিন্তু সেই অনুরোধ গ্রহণ করা হয়নি। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে Nature পত্রিকায় গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।
আরও একটি বিষয় নজরে এসেছে। গবেষণাপত্রের প্রাথমিক খসড়ায় মেই এবং তার পরিবারের অবদানের উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত প্রকাশিত সংস্করণে সেই অংশ বাদ দেওয়া হয়।
‘দ্রুত প্রথম হওয়ার দৌড়ে সতর্কবার্তা উপেক্ষা’
প্যারিসের ইমাজিন ইনস্টিটিউটের পরিচালক এবং জিনগত রোগ বিশেষজ্ঞ বানা জাবরি ঘটনাটিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন।
তাঁর মতে, গবেষকরা দ্রুত প্রথম হওয়ার প্রতিযোগিতায় একাধিক সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছেন। বানরের শরীরে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার পরই পরীক্ষাটি থামিয়ে নতুন করে পুরো বিষয়টি বিশ্লেষণ করা উচিত ছিল।
ফরাসি জাতীয় স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনসার্মের নৈতিকতা কমিটির সভাপতি এরভে শনেভেইসও বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, কোনও ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় মৃত্যু ঘটলে তা দ্রুত প্রকাশ্যে আনা গবেষণা-নৈতিকতার মৌলিক শর্ত। এই ঘটনায় সেই নীতিও মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
গবেষকের জন্য উপহারের অভিযোগও
তদন্তে আর্থিক বিষয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গবেষণাকে এগিয়ে নিতে আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি মেইয়ের বাবা অধ্যাপক কিউকে আইফোন, আইপ্যাড এবং চিনের জনপ্রিয় মদ মাওতাই উপহার দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। যদিও গবেষক আনুষ্ঠানিকভাবে এসব উপহার চাননি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর সাংহাইয়ের ইয়াংপু জেলার স্বাস্থ্য দফতর হাসপাতালটিকে মাত্র ৩,২০০ ইউরো জরিমানা করে। অভিযোগ ছিল, হাসপাতাল গবেষণাটির যথাযথ তদারকি করেনি এবং বাণিজ্যিক অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা হিসেবে সেটিকে নিবন্ধনও করেনি।
তবে ঘটনার গুরুত্বের তুলনায় এই শাস্তি যথেষ্ট কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা।
Nature-এ সম্পাদকীয় সতর্কবার্তা
Nature পত্রিকার সম্পাদক ভিক্টোরিয়া আরান্দা জানিয়েছেন, মানবদেহে এই পরীক্ষাটি চালানোর পরিকল্পনা বা বাস্তবায়ন সম্পর্কে তাঁদের কোনও তথ্য দেওয়া হয়নি।
Science-এর তদন্ত প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট গবেষণাপত্রে একটি ‘সম্পাদকীয় সতর্কবার্তা’ যুক্ত করেছে Nature। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তও শুরু হয়েছে।
ফের মনে পড়ছে ‘CRISPR Baby’ কাণ্ড
এই ঘটনা অনেককেই ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত ‘CRISPR Baby’ কেলেঙ্কারির কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
সেবার চীনা বিজ্ঞানী হে জিয়াংকুই গোপনে মানব ভ্রূণের জিন সম্পাদনা করে আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। পরে তাঁকে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়।
আর এখানেই রয়েছে এক অদ্ভুত পরিহাস। সেই সময় মানব ভ্রূণের জিন সম্পাদনার বিরোধিতা করে প্রকাশিত একটি খোলা চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের অন্যতম ছিলেন কিউ জিলং—যাঁর গবেষণাকে ঘিরেই এখন উঠছে গবেষণা-নৈতিকতার এত প্রশ্ন।
একটি শিশুর মৃত্যু তাই এই ঘটনায় শেষ কথা নয়। বরং তার পরেই শুরু হয়েছে আরও বড় প্রশ্ন—চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘অসম্ভবকে সম্ভব’ করার দৌড়ে নিরাপত্তা, স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার সীমারেখা কোথায়?
চীনের এই ঘটনা সেই প্রশ্নকেই ফের আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক মহলের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।