Home International পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আঁচ, ‘কঠোর আঘাত’ ট্রাম্পের

পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আঁচ, ‘কঠোর আঘাত’ ট্রাম্পের

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
22 views 4 minutes read
A+A-
Reset

পশ্চিম এশিয়ায় ফের বাড়ছে যুদ্ধের উত্তাপ। ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের আঁচ ছড়িয়ে পড়ছে একের পর এক দেশে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিম এশিয়ায় থাকা মার্কিন নাগরিকদের অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করতে বলেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, প্রয়োজন হলে ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান চালাতেও প্রস্তুত ওয়াশিংটন। তেহরানকে “খুব কঠোরভাবে” আঘাত করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্পের কথায়, “আমরা জিততে চাই। ইরান আর সহ্য করতে না পারা পর্যন্ত আমরা খুব কঠোরভাবে আঘাত হানব।”

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিট অভিযোগ করেন, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে ইরান।

লিভিটের দাবি, “ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি সমঝোতাপত্রে সই করেছিল। কিন্তু পরে তারা তা ভেঙে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং মার্কিন সেনাদের হত্যা করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই ধরনের সন্ত্রাসী আচরণ মেনে নেবেন না।”

তিনি আরও বলেন, অর্থবহ আলোচনায় ফিরে না আসা পর্যন্ত ইরানকে এর মূল্য দিতে হবে।

কুয়েতে আকাশে ড্রোনের হানা

পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনার মধ্যেই কুয়েতের আকাশেও দেখা দিয়েছে ড্রোন হামলার আতঙ্ক। কুয়েতের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, ভোর থেকে তাদের আকাশসীমায় ঢুকে পড়া একাধিক “শত্রু ড্রোন” ধ্বংস করা হয়েছে। কুয়েতের দাবি, ড্রোনগুলি ইরান থেকে পাঠানো হয়েছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়।

সেনাবাহিনীর বক্তব্য অনুযায়ী, ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ উত্তর কুয়েতের একটি সরকারি স্থাপনা এবং বুবিয়ান দ্বীপে একটি বেসরকারি সংস্থার সম্পত্তিতে গিয়ে পড়ে। তবে ঘটনায় কোনও প্রাণহানির খবর নেই।

এর আগে কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছিল, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাতেও ড্রোন হামলা হয়েছে।

হরমুজে ট্যাঙ্কার ঘিরে নতুন উদ্বেগ

যুদ্ধের আঁচ এবার আরও স্পষ্ট বাণিজ্যিক নৌপথেও। ব্রিটেনের ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, ওমানের লিমা উপকূল থেকে প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত অস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হামলায় জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অন্য একটি ঘটনায়, ওমানের খাসাবের উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ২১ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি ট্যাঙ্কারের কাছে বিস্ফোরণ ঘটে। তবে সেখানেও হতাহতের খবর মেলেনি।

পরপর এই ঘটনায় হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশ্বের মোট তেল পরিবহণের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে হয়। ফলে এখানে সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

মার্কিন নাগরিকদের ‘বেরিয়ে যাওয়ার’ পরামর্শ

পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কায় পশ্চিম এশিয়ায় থাকা মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর। তাদের অতিরিক্ত সতর্ক থাকার পাশাপাশি বিমান চলাচল ব্যাহত হওয়া, আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ভ্রমণে বড় ধরনের বিঘ্নের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

পরামর্শে বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ায় থাকা মার্কিন নাগরিকদের অঞ্চল ছেড়ে যাওয়ার কথা বিবেচনা করা উচিত। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হলে যাতে তৎক্ষণাৎ সরে যাওয়া যায়, সেই প্রস্তুতিও রাখতে বলা হয়েছে।

পশ্চিম এশিয়ায় ভ্রমণ কিংবা ওই অঞ্চল হয়ে যাতায়াতের পরিকল্পনাও পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছে ওয়াশিংটন।

মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের আশঙ্কা, ইরান এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মার্কিন দূতাবাস, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাকে নিশানা করতে পারে। ওয়াশিংটনের দাবি, আগে হামলার নজির না থাকা মিশরের মতো দেশেও ইরান হামলার পরিধি বাড়িয়েছে।

মার্কিন নাগরিকদের বড় জমায়েত এড়িয়ে চলা, স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের ওপর নজর রাখা এবং মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকায় সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতির জন্য আগাম পরিকল্পনা তৈরি রাখার পাশাপাশি নিরাপত্তা সংক্রান্ত আপডেট পেতে স্মার্ট ট্রাভেলার এনরোলমেন্ট প্রোগ্রাম (এসটিইপি)-এ নাম নথিভুক্ত করতেও বলা হয়েছে।

সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে আবুধাবির মার্কিন দূতাবাস এবং দুবাইয়ের মার্কিন কনস্যুলেট এখনও ‘অর্ডার্ড ডিপারচার’ অবস্থায় রয়েছে। অ-জরুরি মার্কিন সরকারি কর্মীদেরও দেশটির বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

গাজাতেও থামছে না হামলা

এদিকে গাজার মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে রাতভর ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে ইজরায়েল। স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলায় অন্তত চারজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন।

এর কয়েক ঘণ্টা আগেই হামাস জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসেবে তারা নিরস্ত্রীকরণে প্রস্তুত।

প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, হামাস অস্ত্র সমর্পণ করবে এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেবে। বিনিময়ে ইজরায়েল ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে এবং সেখানে একটি আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করা হবে।

ইজরায়েল সরকার এখনও এই প্রস্তাব নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে দেশটির কট্টরপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, “ইজরায়েলকে জিততেই হবে।” তাঁর মতে, এই চুক্তি কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

একজন ইজরায়েলি সামরিক আধিকারিক জানিয়েছেন, বাসিন্দাদের এলাকা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর হামাসের পরিকাঠামো লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের সঙ্গে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা মিশর হামাসের ইতিবাচক সাড়াকে স্বাগত জানিয়েছে।

ইয়েমেন থেকে লেবানন, উত্তেজনার ঢেউ

পশ্চিম এশিয়ার উত্তেজনা ছড়িয়েছে ইয়েমেন ও লেবাননেও। ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা দাবি করেছে, বাব এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে সৌদি আরবের জাহাজ চলাচল অবরোধের ঘোষণা দেওয়ার পর আটটি সৌদি জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরে বিকল্প পথে যেতে হয়েছে।

দক্ষিণ লেবাননে ইজরায়েলি বাহিনী জানিয়েছে, ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যস্থল বিউফোর্ট দুর্গের নিচে হিজবুল্লাহর একটি ভূগর্ভস্থ কমান্ড নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা হয়েছে।

এই অভিযানের তীব্র নিন্দা করেছেন লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন। তাঁর বক্তব্য, দক্ষিণ লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে রোমে নতুন দফার আলোচনা শুরুর আগে এই অভিযান অত্যন্ত নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছে।

অন্যদিকে ইজরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননে রাতের অভিযানে তাদের এক সেনা আধিকারিক মাঝারি ধরনের আহত হয়েছেন। এ নিয়ে হিজবুল্লাহ বা লেবাননের কর্তৃপক্ষের তরফে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

সব মিলিয়ে ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি, কুয়েতে ড্রোন হামলা এবং গাজা-লেবানন-ইয়েমেনে সংঘাত—সব মিলিয়ে পশ্চিম এশিয়ার পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles