Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: জম্মু ও কাশ্মীর ব্যাঙ্কে ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্যান (PAN) নম্বর সংযুক্ত না করেই ১.৫৪ লক্ষ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। আয়কর দফতরের তদন্তে দেখা গিয়েছে, এই অ্যাকাউন্টগুলির মধ্যে যেগুলিতে একটি আর্থিক বছরে ১৫ লক্ষ টাকা বা তার বেশি লেনদেন হয়েছে, সেগুলিতে মোট জমা ও লেনদেনের পরিমাণ ৪.৮৮ লক্ষ কোটি টাকা। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের হাতে আসা তদন্ত-নথিতে এই তথ্য উঠে এসেছে।
গত বছরের শেষ দিকে জমা দেওয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আয়কর দফতর এই ঘটনাকে “ব্যবস্থাগত ব্যর্থতা” এবং “গুরুতর সতর্কবার্তা” বলে উল্লেখ করেছে। তাদের মতে, প্যানবিহীন বিপুল অঙ্কের এই লেনদেন কর ফাঁকি দেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
তদন্তে দেখা যায়, অধিকাংশই সেভিংস ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট, যা ফর্ম ৬০ জমা দিয়ে খোলা হয়েছে। যাঁদের প্যান নেই, তাঁদের জন্য এই ঘোষণা-পত্র ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে।
তদন্তে যা উঠে এসেছে
প্যান-সংযুক্ত নয় এমন অ্যাকাউন্টগুলির মধ্যে ছিল—
- ৩২,৪৯৮টি সরকারি বা সরকার-সংযুক্ত অ্যাকাউন্ট, যেখানে মোট জমার পরিমাণ ৪,৬৮,৫০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বনির্ভর গোষ্ঠী (SHG) ও ক্লাস্টার লেভেল ফেডারেশনের (CLF) সদস্যদের অ্যাকাউন্টও রয়েছে।
- ১.২৫ লক্ষ বেসরকারি অ্যাকাউন্ট, যেখানে মোট জমা ৩৬,৭৮৯ কোটি টাকা।
- ১০,৪৬৪টি বেসরকারি অ্যাকাউন্টে এক অর্থবর্ষে ৫০ লক্ষ টাকা বা তার বেশি জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৫১০ জনের ৫৬৬টি অ্যাকাউন্টধারীর প্যান ছিল, কিন্তু অ্যাকাউন্ট খোলার সময় তা ব্যাঙ্ককে জানানো হয়নি।
কীভাবে শুরু হয় তদন্ত
২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনের সময় শ্রীনগর-ভিত্তিক জে অ্যান্ড কে ব্যাঙ্ক আয়কর দফতরকে একটি তথ্যভান্ডার (ডেটা ডাম্প) দেয়। এরপর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অনুমতি নিয়ে বিষয়টি পূর্ণাঙ্গ তদন্তে রূপ নেয়।
তদন্তে অভিযোগ করা হয়েছে, একাধিক ব্যক্তি ও সংস্থা প্যান ছাড়াই বহু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলে বড় অঙ্কের লেনদেন করেছে, কিন্তু সেই তথ্য আয়কর দফতরের নজরে আসেনি।
প্রথমে ২০০৪ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে খোলা ৬৮টি এমন অ্যাকাউন্ট শনাক্ত হয়, যেগুলির অনেকগুলি উপত্যকার বস্ত্র ব্যবসায়ী সংস্থার নামে ছিল। পরে তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানো হয়।
সরকারি প্রকল্পের অ্যাকাউন্টও
প্যান-ছাড়া অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হয়েছে একাধিক সরকারি প্রকল্পেও। এর মধ্যে রয়েছে—
- জে অ্যান্ড কে ব্যাঙ্ক বিমা বচত খাতা
- প্রধানমন্ত্রী রোজগার সৃষ্টির কর্মসূচি (PMEGP)
- জাতীয় নগর জীবিকা মিশন (NULM)
- সাবসিডি রিজার্ভ ফান্ড অ্যাকাউন্ট (SRFA)
- জম্মু ও কাশ্মীরের উদ্যোক্তা উন্নয়ন প্রকল্প
এছাড়া এনসিসি ক্যাডেটদের সেভিংস অ্যাকাউন্টে মোট ১.৫৫ কোটি টাকা জমার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
আয়কর রিটার্নের সঙ্গে অমিল
আয়কর দফতর প্যান-চিহ্নিত ৩০টি বড় বেসরকারি অ্যাকাউন্ট বিশ্লেষণ করে দেখে, ১১টি ক্ষেত্রে ব্যাঙ্কে জমার অঙ্ক আয়কর রিটার্নে ঘোষিত আয়ের তুলনায় অনেক বেশি। এর মধ্যে সিমেন্ট ব্যবসায়ী, পেট্রল পাম্প, কাপড়ের দোকান এবং একটি হাসপাতালের মালিকও ছিলেন।
একটি ক্ষেত্রে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে একটি প্যানবিহীন অ্যাকাউন্টে ৪.০৫ কোটি টাকা জমা পড়েছে, অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আয়কর রিটার্নে মোট আয় দেখিয়েছেন মাত্র ৩.২২ লক্ষ টাকা।
আরেকটি অবকাঠামো সংস্থা ব্যাঙ্কে ৫৭.৮৮ কোটি টাকা জমা করলেও আয়কর রিটার্নে মোট প্রাপ্তি দেখিয়েছে ৩৮.৪৯ কোটি টাকা।
আয়কর দফতরের মতে, প্যান সংযুক্ত না থাকায় এই ধরনের অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে সম্পদ গোপন রাখা এবং কর ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হয়েছে, ফলে সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
আয়কর দফতরের সুপারিশ
প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে—
- প্যানবিহীন অ্যাকাউন্টে নির্দিষ্ট সীমার বেশি জমা হলে সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন (STR) দাখিল করতে হবে।
- সেই তথ্য আয়কর দফতর ও রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে ভাগ করে নিতে হবে।
- এতে কর-নিয়ম মেনে চলা নিশ্চিত হবে, অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থ জোগান রোধে সহায়তা মিলবে এবং আর্থিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও স্থিতিশীলতা বাড়বে।
জে অ্যান্ড কে ব্যাঙ্কের বক্তব্য
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জে অ্যান্ড কে ব্যাঙ্ক জানিয়েছে, তদন্তের পর রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সঙ্গে বৈঠক করে সমস্ত পর্যবেক্ষণ মেনে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে।
ব্যাঙ্কের দাবি—
- নির্দিষ্ট শ্রেণির অ্যাকাউন্টে এখন প্যান বাধ্যতামূলক।
- নির্দিষ্ট সীমার বেশি লেনদেন হলেই স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
- প্রয়োজন হলে সন্দেহজনক লেনদেনের রিপোর্ট (STR) জমা দেওয়া হচ্ছে।
- গ্রাহককে প্যান জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়; দীর্ঘদিন না দিলে ডেবিট লেনদেন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
- প্যান যাচাই হয়ে গেলে পরিষেবা আবার চালু করা হয়।
ব্যাঙ্কের দাবি, নতুন প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণের ফলে তাদের কেওয়াইসি, প্যান ও অর্থপাচার-বিরোধী কাঠামো আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে।