বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় হকির দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল নীল জার্সি। স্বাধীনতার পর থেকে অলিম্পিক, বিশ্বকাপ কিংবা এশিয়ান গেমস—ভারতীয় পুরুষ ও মহিলা হকি দলের পরিচয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে ছিল নীল রং। কিন্তু ২০২৬ সালের হকি বিশ্বকাপের আগে সেই ঐতিহ্য ভেঙে গেরুয়া জার্সি চালু করতেই তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

প্রথমে হকি ইন্ডিয়া দাবি করেছিল, এই পরিবর্তন খেলোয়াড়দের সুপারিশেই করা হয়েছে। কিন্তু ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ভিন্ন ছবি। অন্তত পাঁচজন বর্তমান আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় এবং হকি ইন্ডিয়ার এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জার্সির রং বদলের বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে কোনও আলোচনা হয়নি। বরং নতুন জার্সি উন্মোচনের পরই তাঁরা বিষয়টি জানতে পারেন।

ঐতিহ্য ভেঙে নতুন জার্সি

সম্প্রতি হকি ইন্ডিয়া বেলজিয়াম-নেদারল্যান্ডসে অনুষ্ঠিতব্য ২০২৬ হকি বিশ্বকাপের জন্য নতুন জার্সি প্রকাশ করে। সেখানে ভারতের ঐতিহ্যবাহী নীল জার্সির বদলে গেরুয়া রঙের জার্সি দেখা যায়। ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক মাধ্যমে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে—কেন ভারতের বহু দশকের পরিচিত রং বদলে দেওয়া হল?

প্রাক্তন অধিনায়ক বিরেন রাসকিনহা প্রকাশ্যে এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, ভারতের পরিচয় নীল জার্সির সঙ্গে জড়িত। তাঁর প্রশ্ন ছিল, “কমলা বা গেরুয়া রঙের যুক্তি কী?”

হকি ইন্ডিয়ার দাবি

সমালোচনার মুখে হকি ইন্ডিয়া জানায়, এই পরিবর্তন কোনও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়। খেলোয়াড়দের পরামর্শের ভিত্তিতেই জার্সির রং বদলানো হয়েছে। সংস্থার দাবি ছিল, নতুন রং খেলোয়াড়দের পছন্দ এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দিয়েই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

এই ব্যাখ্যার পর বিতর্ক কিছুটা থামলেও, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে সেই দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

কী বলছেন বর্তমান খেলোয়াড়রা?

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সঙ্গে কথা বলা পাঁচজন বর্তমান আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ের বক্তব্য প্রায় একই।

তাঁদের দাবি—

  • জার্সির রং পরিবর্তন নিয়ে কোনও বৈঠক হয়নি।
  • লিখিত বা মৌখিকভাবে কোনও মতামত চাওয়া হয়নি।
  • নতুন জার্সি প্রকাশের আগ পর্যন্ত তাঁরা বিষয়টি জানতেনই না।

একজন খেলোয়াড় বলেন, “আমাদের কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি। ভিডিও প্রকাশ হওয়ার পরই প্রথম দেখি।”

অন্য এক খেলোয়াড়ের বক্তব্য, “যদি আলোচনা হতো, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের মনে থাকত।”

কর্মকর্তার বক্তব্যেও প্রশ্ন

শুধু খেলোয়াড়ই নন, হকি ইন্ডিয়ার এক কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, খেলোয়াড়দের সঙ্গে কোনও আনুষ্ঠানিক পরামর্শ হয়েছে বলে তাঁর জানা নেই।

ফলে হকি ইন্ডিয়ার সরকারি বক্তব্য এবং মাঠের বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট অসঙ্গতি সামনে এসেছে।

পরিচয়ের প্রশ্ন

ভারতের হকি দল বহু দশক ধরে নীল জার্সিতেই আন্তর্জাতিক মঞ্চে খেলেছে। ক্রিকেটে যেমন নীল জার্সি ভারতের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে, তেমনই হকিতেও সেই রং দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহন করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনও জাতীয় দলের জার্সি কেবল পোশাক নয়; সেটি ইতিহাস, আবেগ, সাফল্য এবং ব্র্যান্ড পরিচয়ের প্রতীক। অলিম্পিকের আটটি সোনাজয়সহ ভারতের হকি ইতিহাসের সঙ্গে নীল রং গভীরভাবে যুক্ত।

তাই রং পরিবর্তনকে অনেকে শুধুমাত্র নকশার পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন না; বরং জাতীয় ক্রীড়া পরিচয়ের পরিবর্তন হিসেবেই দেখছেন।

রাজনৈতিক বিতর্কও জোরদার

গেরুয়া রং ব্যবহারের ফলে বিষয়টি দ্রুত রাজনৈতিক মাত্রাও পেয়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করেছেন, ক্রীড়াক্ষেত্রেও রাজনৈতিক প্রতীকের প্রভাব বাড়ানো হচ্ছে। যদিও হকি ইন্ডিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

অন্যদিকে সমর্থকদের একাংশের যুক্তি, গেরুয়া ভারতের জাতীয় পতাকার একটি রং এবং সাহস ও ত্যাগের প্রতীক। ফলে এই রং ব্যবহার করায় আপত্তির কারণ নেই।

খেলোয়াড়দের মতামত কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

এই বিতর্কে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—জাতীয় দলের জার্সি নির্ধারণে খেলোয়াড়দের মতামত কতটা গুরুত্বপূর্ণ?

প্রশাসনিকভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই ফেডারেশনের। কিন্তু যে সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা হিসেবে খেলোয়াড়দের মতামতের কথা বলা হচ্ছে, সেই মতামত আদৌ নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটাই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।

যদি খেলোয়াড়দের সঙ্গে আলোচনা না হয়ে থাকে, তাহলে হকি ইন্ডিয়ার সরকারি ব্যাখ্যা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। আর যদি সীমিত কয়েকজনের মতামত নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেই প্রক্রিয়া কতটা প্রতিনিধিত্বমূলক ছিল, সেটিও প্রশ্নের মুখে।

বিতর্ক থামার লক্ষণ নেই

জার্সি পরিবর্তনের বিষয়টি আপাতদৃষ্টিতে একটি নকশাগত সিদ্ধান্ত হলেও, তা এখন ঐতিহ্য, ক্রীড়া প্রশাসনের স্বচ্ছতা এবং জাতীয় পরিচয়ের বিতর্কে পরিণত হয়েছে। প্রাক্তন খেলোয়াড়দের সমালোচনা, বর্তমান খেলোয়াড়দের বক্তব্য এবং হকি ইন্ডিয়ার দাবির মধ্যে অসঙ্গতি প্রকাশ্যে আসার পর এই বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশ্বকাপের আগে ভারতীয় হকি দল মাঠে কী ফল করে, সেটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মাঠের বাইরেও এখন সমান গুরুত্ব পাচ্ছে একটি প্রশ্ন—ভারতের নীল জার্সির ঐতিহ্য ভেঙে গেরুয়া আনার সিদ্ধান্তটি আদৌ কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল?