রুশপন্থী প্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগে সাংবাদিক জেনিয়া ফেদোরোভাকে ফ্রান্স ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সরকার। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ, ফেদোরোভা রুশ সরকারের স্বার্থে পরিচালিত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন। এর মাধ্যমে ফ্রান্সের জনশৃঙ্খলা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছে বলেও দাবি প্রশাসনের।
আগামী বছর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। তার আগে রুশ প্রভাব ও তথ্যযুদ্ধ নিয়ে ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন আবহেই বুধবার ফেদোরোভার বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নিল ফরাসি সরকার।
ফেদোরোভা একসময় রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম আরটি (RT)-এর ফ্রান্স শাখার সাংবাদিক ছিলেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞার জেরে আরটি ফ্রান্সের সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। তবে ফেদোরোভা ফ্রান্সেই থেকে যান। পরে রক্ষণশীল শিল্পপতি ভিনসেন্ট বোলোরের মালিকানাধীন বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে নিয়মিত ভাষ্যকার হিসেবে উপস্থিত হতে শুরু করেন।
বর্তমানে সিনিউজ (CNews), ইউরোপ ১ (Europe 1) এবং লে জুরনাল দ্য দিমঁশ (Le Journal du Dimanche)-এ তাঁর নিয়মিত উপস্থিতি রয়েছে। ফরাসি সংবাদপত্র লিবেরাসিওঁ (Libération)-এর হাতে আসা বহিষ্কার আদেশে বলা হয়েছে, ফেদোরোভা রুশ কর্তৃপক্ষ পরিচালিত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারের একটি “মাধ্যম” হিসেবে কাজ করেছেন।
প্রশাসনের অভিযোগ, ফরাসি ও ইউরোপীয় নাগরিকদের জনমত প্রভাবিত করা এবং নিজেদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলির প্রতি তাঁদের আস্থা নষ্ট করাই ছিল ওই প্রচারের অন্যতম লক্ষ্য। সেই প্রচারে ফেদোরোভা মিথ্যা তথ্য ছড়াতে ভূমিকা নিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ফেদোরোভাকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। ২০১৭ সালেই ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, তিনি ফেদোরোভাকে প্রকৃত সাংবাদিক হিসেবে দেখেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল, কোনও সংবাদমাধ্যম যখন ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য ছড়ায়, তখন তা সাংবাদিকতার সীমা পেরিয়ে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ারে পরিণত হয়।
ফরাসি প্রশাসনের একাধিক স্তরে তাঁর ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অসন্তোষ থাকলেও, ২০২৪ সালে ফেদোরোভাকে ১০ বছরের আবাসিক অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। পরে ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যাঁ-নোয়েল বারো মন্তব্য করেন, তাঁকে টেলিভিশন বা সংবাদপত্রে নিয়মিত বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া কার্যত “ভ্লাদিমির পুতিনের স্বার্থই পূরণ করা”।
এদিকে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মধ্যপন্থী রিনিউ (Renew) গোষ্ঠীর সদস্যরাও ফেদোরোভার বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, তিনি একজন “সুপরিচিত রুশ প্রচারক”।
তবে ফেদোরোভা ও তাঁর আইনজীবী এই অভিযোগ মানতে নারাজ। তাঁর আইনজীবী এমানুয়েল পিউনিকা সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার কথা জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, ফেদোরোভা একজন পেশাদার সাংবাদিক এবং তাঁকে দেশছাড়া করার নির্দেশ সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের ওপর গুরুতর আঘাত।
ফেদোরোভার বর্তমান কর্মস্থল কানাল প্লাস (Canal+) এবং লাগারদের (Lagardère) পক্ষ থেকেও সিদ্ধান্তটির তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কোনও মত বিতর্কিত বা অস্বস্তিকর হলেও, তা যদি গণতান্ত্রিক বিতর্কের পরিসরের মধ্যে থাকে, তবে সেই মত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করা জরুরি।
অর্থাৎ, ফ্রান্সে এখন প্রশ্নটা শুধু ফেদোরোভার ভবিষ্যৎ নিয়েই নয়—রুশ প্রচারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সীমা ঠিক কোথায় টানা হবে, সেই বিতর্কও নতুন করে সামনে এসেছে।