বাগদাদ: শান্তির সম্ভাবনা যখন সামান্য হলেও উঁকি দিচ্ছিল, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে ফের যুদ্ধের আঁচ। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের মধ্যেই মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) ইরাকের পূর্বাঞ্চলে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির একাধিক ঘাঁটিতে যৌথ বিমান হামলা চালাল যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। ওয়াশিংটনের দাবি, গত ৭২ ঘণ্টায় মার্কিন সেনা এবং সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামো লক্ষ্য করে ৩০টিরও বেশি ড্রোন হামলার চেষ্টার জবাবেই এই অভিযান।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর নির্দেশনায় সক্রিয় ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি মার্কিন বাহিনী ও সৌদি তেল স্থাপনাগুলিকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার চেষ্টা চালাচ্ছিল। এর জবাবে মার্কিন ও সৌদি যুদ্ধবিমান ইরাকের পূর্বাঞ্চলে অস্ত্রভাণ্ডার, রসদ কেন্দ্র এবং সামরিক লজিস্টিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়।
সেন্টকমের দাবি, সাম্প্রতিক ড্রোন হামলাগুলির কোনওটিই লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারেনি। তবে মার্কিন সেনার হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল ২০২৬-এর মধ্যে ইরাকে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়ারা মার্কিন নাগরিক, সেনাঘাঁটি এবং বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে ৬০০-রও বেশি হামলার চেষ্টা চালিয়েছে। ওয়াশিংটনের মতে, এই ধারাবাহিক হামলা গোটা অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছে।
সৌদির তেল স্থাপনাও নিশানায়?
সৌদি আরবের অভিযোগ, সম্প্রতি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে উড়ে আসা একাধিক ড্রোন তাদের পূর্বাঞ্চলের তেল পরিশোধনাগার এবং রাজধানী রিয়াধের দিকে পাঠানো হয়েছিল। সৌদি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সেই ড্রোনগুলিকে ধ্বংস করলেও, রিয়াধের বার্তা স্পষ্ট—দেশের সার্বভৌমত্ব ও জ্বালানি নিরাপত্তার উপর হামলা হলে তার জবাব দেওয়ার অধিকার সৌদি আরবের রয়েছে।
একই সঙ্গে ইরাকের ভূখণ্ড যাতে প্রতিবেশী দেশগুলির বিরুদ্ধে হামলার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার না হয়, সে বিষয়ে বাগদাদের কাছেও বার্তা দিয়েছে রিয়াধ।
‘প্রতিরক্ষামূলক অভিযান’, হুঁশিয়ারি ওয়াশিংটনের
যৌথ হামলার পর স্বাভাবিকভাবেই মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তবে ওয়াশিংটনের দাবি, এই অভিযান কোনও আগ্রাসী পদক্ষেপ নয়, বরং আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা। ভবিষ্যতে মার্কিন ও সৌদি বাহিনীর উপর হামলা ঠেকাতেই এই সামরিক অভিযান চালানো হয়েছে।
সেন্টকমের হুঁশিয়ারি, আইআরজিসি এবং তাদের মদতপুষ্ট গোষ্ঠীগুলি হামলা বন্ধ না করলে আগামী দিনে আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
বাগদাদের অবস্থান কী?
এদিকে সৌদি আরবের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করেছে ইরাক সরকার। বাগদাদের বক্তব্য, ইরাকের ভূখণ্ড কোনও পক্ষকেই প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তদন্তে হামলার সঙ্গে কারও যোগসূত্রের প্রমাণ মিললে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছে ইরাক।
তবে এই ঘটনায় ইরাকের অবস্থানও কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে দেশের মাটিতে সক্রিয় ইরান-ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠী, অন্যদিকে তাদের লক্ষ্য করে মার্কিন ও সৌদি সামরিক অভিযান—দুইয়ের মাঝখানে পড়েছে বাগদাদ।
তেলের বাজারেও যুদ্ধের আঁচ
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের মতে, এই যৌথ বিমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যের জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতকে আরও এক ধাপ বাড়িয়ে দিতে পারে। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, ইরাক এবং ইয়েমেনের হুথিদের ঘিরে তৈরি হওয়া সংঘাত ইতিমধ্যেই বহুস্তরীয়। তার মধ্যে ইরাকের মাটিতে মার্কিন-সৌদি যৌথ অভিযান পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তুলতে পারে।
এর প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা নেই। মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিকাঠামো ফের হামলার নিশানায় এলে আন্তর্জাতিক অপরিশোধিত তেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। ফলে যুদ্ধের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা এবার অর্থনীতির দিকেও।