Home অর্থ ও বাণিজ্য ভারতে ৫৭৬ ‘শতকোটিপতি’, চার বছরে প্রায় চারগুণ

ভারতে ৫৭৬ ‘শতকোটিপতি’, চার বছরে প্রায় চারগুণ

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
9 views 4 minutes read
A+A-
Reset

ভারতে বছরে ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি মোট আয় দেখিয়ে আয়কর রিটার্ন (আইটিআর) জমা দেওয়া ব্যক্তির সংখ্যা প্রথমবার ৫০০ পেরিয়ে গেল। লোকসভায় সোমবার কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মূল্যায়ন বর্ষে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭৬। আগের বছরের তুলনায় যা প্রায় ৩৯ শতাংশ বেশি

আর চার বছর আগের ছবিটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ২০২১-২২ মূল্যায়ন বর্ষে ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি আয় দেখানো করদাতার সংখ্যা ছিল মাত্র ১৪২। অর্থাৎ মাত্র চার বছরের ব্যবধানে এই সংখ্যা প্রায় চারগুণ বেড়েছে।

পাঁচ বছরে ধারাবাহিক উত্থান

লোকসভায় এক লিখিত প্রশ্নের উত্তরে অর্থ প্রতিমন্ত্রী পঙ্কজ চৌধুরী জানান, গত পাঁচটি মূল্যায়ন বর্ষে আয়কর রিটার্নে ১০০ কোটি টাকা বা তার বেশি মোট আয় দেখানো ব্যক্তির সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে।

আয়কর রিটার্নের সরকারি পরিসংখ্যান সাধারণত কিছুটা সময়ের ব্যবধানে প্রকাশিত হয়। দেশে আয়ের প্রবণতা বোঝার ক্ষেত্রে তাই এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখনও পর্যন্ত ভারতের মানুষের আয় পরিমাপের জন্য নিয়মিত সরকারি সমীক্ষাভিত্তিক কোনও পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা নেই।

তবে সেই ঘাটতি পূরণে এবার বড় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রথমবার জাতীয় গৃহস্থালি আয় সমীক্ষা

পরিসংখ্যান ও কর্মসূচি রূপায়ণ মন্ত্রক (MoSPI) চলতি বছরের এপ্রিল থেকে দেশের প্রথম জাতীয় গৃহস্থালি আয় সমীক্ষা (National Household Income Survey) শুরু করেছে। সমীক্ষা চলবে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত।

শুধু পরিবারের মোট আয় নয়, প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে মজুরি ও উপার্জনকে বদলে দিচ্ছে, সেই বিষয়টিও এই সমীক্ষায় খতিয়ে দেখা হবে। তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পর ফলাফল প্রকাশ হতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।

অর্থাৎ, আগামী দিনে দেশের আয়-বণ্টনের আরও স্পষ্ট ছবি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২২৯ ডলার-বিলিয়নেয়ার, ২৩ জন বিশ্বের শীর্ষ ৫০০-তে

ভারতে অতি-ধনীদের সংখ্যা বাড়ার আরেকটি ছবি দেখা যায় আন্তর্জাতিক সম্পদ-তালিকাতেও।

ফোর্বস-এর হিসাবে বর্তমানে ভারতে ২২৯ জন ডলার-বিলিয়নেয়ার রয়েছেন। প্রত্যেকের সম্পদের পরিমাণ অন্তত ৯,৬০০ কোটি টাকা—এক মার্কিন ডলার প্রায় ৯৬ টাকা ধরে।

অন্যদিকে, ব্লুমবার্গ বিলিয়নেয়ার সূচক অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ ৫০০ ধনীর তালিকায় রয়েছেন ২৩ জন ভারতীয়

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফোর্বস বা ব্লুমবার্গের তালিকা তৈরি হয় মোট সম্পদ বা Net Worth-এর ভিত্তিতে। লোকসভায় প্রকাশিত ৫৭৬ জনের তথ্যের ভিত্তি হল বার্ষিক আয়। ফলে দুটি পরিসংখ্যানকে সরাসরি এক করে দেখা ঠিক হবে না।

মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে

সাম্প্রতিক জিডিপি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের মাথাপিছু মোট জাতীয় আয় বা Per Capita Gross National Income বর্তমান মূল্যে দাঁড়িয়েছে ২.৪১ লক্ষ টাকা। আগের বছরের তুলনায় যা প্রায় ৮ শতাংশ বেশি।

অর্থাৎ একদিকে দেশের গড় আয়ের সূচক বাড়ছে, অন্যদিকে অতি-উচ্চ আয় করা ব্যক্তির সংখ্যাও দ্রুত বাড়ছে। আর এখানেই সামনে আসছে আয়-বৈষম্যের বড় প্রশ্ন।

‘বৈষম্য কমছে’ বলছে সরকার

লোকসভায় একই উত্তরে অর্থ প্রতিমন্ত্রী জানান, করদাতাদের মোট সম্পদের পৃথক সরকারি তথ্য কেন্দ্র সংরক্ষণ করে না।

আয় ও সম্পদের কেন্দ্রীকরণ অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৃদ্ধির ওপর কী প্রভাব ফেলছে—এই প্রশ্নের উত্তরে সরকার ২০২৩-২৪ সালের গৃহস্থালি ভোগব্যয় সমীক্ষা-র তথ্য তুলে ধরে।

সরকারের দাবি, গ্রামীণ এবং শহুরে ভারতে জিনি সহগ যথাক্রমে ০.২৩৭ এবং ০.২৮৪-এ নেমে এসেছে। অর্থাৎ আয়-বৈষম্য কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিলেছে।

সরকার আরও জানিয়েছে, কোভিড-পরবর্তী সময়ে শ্রমবাজার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। Periodic Labour Force Survey অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের বেকারত্বের হার কমে ৩.১ শতাংশে নেমেছে।

প্রগতিশীল আয়কর ব্যবস্থা এবং খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আবাসন ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে বৈষম্য কমানোর চেষ্টাও চলছে বলে সরকারের বক্তব্য।

কিন্তু আন্তর্জাতিক গবেষণায় অন্য ছবি

তবে ভারতের আয়-বৈষম্য নিয়ে ছবিটা এতটা সরল নয়। World Inequality Lab-এর World Inequality Report 2026-এ সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে।

রিপোর্টের হিসাব অনুযায়ী, ভারতের শীর্ষ ১০ শতাংশ মানুষের হাতে জাতীয় আয়ের প্রায় ৫৮ শতাংশ। বিপরীতে, দেশের নিচের ৫০ শতাংশ মানুষের ভাগে রয়েছে মাত্র ১৫ শতাংশ আয়।

সম্পদের ক্ষেত্রে ব্যবধান আরও বড়। শীর্ষ ১০ শতাংশের হাতে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ৬৫ শতাংশ, আর একেবারে শীর্ষ ১ শতাংশের হাতেই রয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পদ।

গবেষকদের মতে, আয়, সম্পদ এবং লিঙ্গ—তিন ক্ষেত্রেই বৈষম্য এখনও ভারতের অর্থনীতির গভীরে থাকা একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা।

৫৭৬-এর সংখ্যা আসলে কী বলছে?

১০০ কোটি টাকার বেশি বার্ষিক আয় দেখানো মানুষের সংখ্যা চার বছরে ১৪২ থেকে বেড়ে ৫৭৬ হওয়া নিঃসন্দেহে ভারতের অর্থনীতিতে উচ্চ আয়ের স্তরের দ্রুত প্রসারের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু এই সংখ্যা একা দেশের সামগ্রিক সমৃদ্ধির ছবি নয়।

একদিকে তৈরি হচ্ছে আরও বেশি বিপুল আয়ের মানুষ, বাড়ছে বিলিয়নেয়ারের সংখ্যাও। অন্যদিকে দেশের বড় অংশের মানুষের হাতে জাতীয় আয় ও সম্পদের অংশ কতটা পৌঁছচ্ছে, সেটাই হয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন।

তাই ৫৭৬-এর পরিসংখ্যান শুধু ধনীদের সংখ্যা বাড়ার গল্প নয়—এটি ভারতের বৃদ্ধি বনাম বৈষম্য-এর পুরনো বিতর্ককেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles