বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতায় নীট প্রশ্নফাঁস ইস্যুতে বিক্ষোভ ঘিরে সংঘর্ষের তদন্তে আরও এক ধাপ এগোল পুলিশ। সোমবার হিংসার ঘটনায় আরও দু’জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। একই সঙ্গে আগে গ্রেফতার হওয়া ১৪ জনের মধ্যে পাঁচজনকে খালি পায়ে ঘটনাস্থলে নিয়ে গিয়ে ‘ক্রাইম সিন রিকনস্ট্রাকশন’ বা ঘটনাস্থল পুনর্গঠন করা হয়। এই পদক্ষেপ ঘিরে ইতিমধ্যেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। অভিযুক্তদের খালি পায়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও এ বিষয়ে মুখ খুলতে চাননি কলকাতা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ) কুণাল আগরওয়াল।

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, সোমবার গ্রেফতার হওয়া দুই অভিযুক্ত হলেন করেয়া এলাকার ওয়াকার আজম এবং নদিয়ার বাসিন্দা জাভেদ আখতার। তদন্তকারীদের দাবি, এঁদের কেউই ছাত্র নন। নীট বিক্ষোভের আড়ালে সংঘটিত হিংসাত্মক ঘটনায় সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার অভিযোগেই তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছে।

সোমবার ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া পাঁচ অভিযুক্তকে একে একে জানাতে বলা হয়, তাঁরা কোথা থেকে মিছিলে এসেছিলেন, কীভাবে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন এবং সংঘর্ষের সময় কী করেছিলেন। তদন্তকারীদের মতে, প্রত্যেকের বক্তব্য মিলিয়ে ঘটনাক্রম পুনর্গঠন করলে কে কোন ভূমিকায় ছিল, তা স্পষ্ট হবে।

এক শীর্ষ পুলিশ আধিকারিক সংবাদ সংস্থা পিটিআই-কে জানান, “ঘটনাস্থল পুনর্গঠনের মূল উদ্দেশ্য ছিল ঘটনার ধারাবাহিকতা যাচাই করা এবং প্রত্যেক অভিযুক্তের নির্দিষ্ট ভূমিকা চিহ্নিত করা। সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল প্রমাণ, ভিডিও এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানের সঙ্গে অভিযুক্তদের বক্তব্য মিলিয়ে তদন্ত এগোচ্ছে। প্রয়োজনে আরও গ্রেফতার করা হবে।”

ওই আধিকারিক আরও বলেন, “তদন্ত সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পক্ষপাতহীনভাবে চলছে। ভাঙচুর, হামলা বা সরকারি সম্পত্তি নষ্ট করার ঘটনায় যাঁরা জড়িত, তাঁদের কাউকেই ছাড়া হবে না। রাজনৈতিক পরিচয় বা সংগঠন নির্বিশেষে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

গত শুক্রবার শিয়ালদহ থেকে ডোরিনা ক্রসিং পর্যন্ত মিছিলকে কেন্দ্র করেই এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পুলিশের অভিযোগ, বিক্ষোভ চলাকালীন সাংবাদিক এবং পুলিশকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। বহু পুলিশকর্মী এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিও আহত হন। তদন্তকারীদের দাবি, যাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে, তাঁদের অনেকেই ছাত্র নন; বরং ‘বহিরাগত’ এবং তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে আগের অপরাধমূলক মামলাও রয়েছে।

তদন্তে পুলিশ এখন সিসিটিভি ফুটেজ, সংবাদমাধ্যমের ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং ডিজিটাল তথ্যপ্রমাণ খতিয়ে দেখছে। তদন্তকারীদের বিশ্বাস, ঘটনাস্থল পুনর্গঠনের মাধ্যমে প্রত্যেক অভিযুক্তের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড আরও স্পষ্টভাবে জানা যাবে।

পুলিশের দায়ের করা এফআইআর-এ অভিযোগ করা হয়েছে, আন্দোলনের নেতৃত্বের নির্দেশে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশ, সাংবাদিক এবং পথচারীদের লক্ষ্য করে জলের বোতল, জুতো, লাঠি ও ইট-পাথর ছুড়েছিল। সেই হামলায় একাধিক পুলিশকর্মী এবং সাংবাদিক আহত হন।

তদন্তকারীরা এখন আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও খতিয়ে দেখছেন। পুলিশের সন্দেহ, অভিযুক্তদের কেউ কেউ পরিকল্পিতভাবে বিক্ষোভে ঢুকে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করেছিলেন কি না, অথবা এর পিছনে আরও বড় কোনও ষড়যন্ত্র ছিল কি না। এই সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না।

এদিকে, যাঁদের ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে ছিলেন মহম্মদ আফরোজ। পুলিশের দাবি, তাঁর সঙ্গে মেটিয়াবুরুজের বিধায়ক আব্দুল খালেক মোল্লার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তদন্তকারীরা সোশ্যাল মিডিয়ার একাধিক ছবি তুলে ধরেছেন, যেখানে আফরোজকে ওই নেতার সঙ্গে দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, অতীতে তিনি নির্বাচনের সময় তৃণমূল কংগ্রেসের হয়ে কাজও করেছিলেন।

তবে আব্দুল খালেক মোল্লা ইতিমধ্যেই আফরোজের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তৃণমূলের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়-ঘনিষ্ঠ শিবিরও তাঁর সঙ্গে দলের কোনও বর্তমান সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে।

পুলিশ প্রথমে এই হিংসার ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। পরে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে মোট সাতটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। পুলিশের দাবি, বিভিন্ন বামপন্থী ছাত্র ও যুব সংগঠন অনুমতি ছাড়াই এই কর্মসূচির আয়োজন করেছিল।

উল্লেখ্য, নীট পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তার সমর্থনেই কলকাতার এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়। আন্দোলনকারীরা কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ-সহ একাধিক দাবি তুলেছিলেন। পরে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করলে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা করা হয়। তবে কলকাতার বিক্ষোভে সংঘর্ষ, ভাঙচুর এবং হামলার অভিযোগে শুরু হওয়া ফৌজদারি তদন্ত এখনও অব্যাহত রয়েছে।

এই ঘটনার রাজনৈতিক অভিঘাতও কম নয়। একদিকে পুলিশ দাবি করছে, ছাত্র আন্দোলনের আড়ালে বহিরাগতদের উপস্থিতি ছিল এবং তারাই পরিস্থিতিকে হিংসাত্মক করে তোলে। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, প্রকৃত আন্দোলনকারীদের বদনাম করতে পরিকল্পিতভাবে এমন বয়ান তৈরি করা হচ্ছে। ফলে ঘটনাটি এখন শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই; তা রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতেও পরিণত হয়েছে।

তদন্তের পরবর্তী ধাপে আরও গ্রেফতার হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে কলকাতা পুলিশ। ডিজিটাল প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ এবং ফরেন্সিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরির প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে। ফলে নীট বিক্ষোভ-পরবর্তী এই হিংসার তদন্ত আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।