বাংলাস্ফিয়ার: বিহারের গোপালগঞ্জ জেলায় প্রশাসনিক কার্যালয়ে জাতি (কাস্ট) ও আয়ের শংসাপত্র সংগ্রহ করতে এসে গুলিবিদ্ধ হলেন একাধিক সাধারণ মানুষ। তাঁদের অভিযোগ, কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে নয়, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত প্রশাসনিক কাজেই তাঁরা ব্লক ও জেলা প্রশাসনের দফতরে এসেছিলেন। কিন্তু হঠাৎ শুরু হওয়া সংঘর্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিচালনার মধ্যে পড়ে তাঁদের জীবন বিপন্ন হয়ে ওঠে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে এক যুবক জানান, তিনি ভোরে নিজের গ্রাম থেকে গোপালগঞ্জে এসেছিলেন জাতি ও আয়ের শংসাপত্র সংগ্রহ করতে। এই নথিগুলি উচ্চশিক্ষায় ভর্তি, বৃত্তির আবেদন এবং সরকারি চাকরির জন্য অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু কাজ সেরে বাড়ি ফেরা তো দূরের কথা, হাসপাতালের শয্যায় গিয়ে শেষ হয়েছে তাঁর দিন।

আহত ওই ব্যক্তি বলেন, “আমি কোনও বিক্ষোভে অংশ নিতে আসিনি। শুধু শংসাপত্র নিতে এসেছিলাম। হঠাৎ চারদিকে চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ আর গুলির শব্দ শুরু হয়ে যায়। কিছু বোঝার আগেই গুলি এসে লাগে।” তাঁর দাবি, সেখানে উপস্থিত অধিকাংশ মানুষই বিভিন্ন প্রশাসনিক পরিষেবার জন্য এসেছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, প্রথমে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও পরে আচমকা বলপ্রয়োগ শুরু হয়। গুলির শব্দে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। প্রাণ বাঁচাতে বহু মানুষ দৌড়তে শুরু করেন। কেউ সরকারি ভবনের ভিতরে আশ্রয় নেন, কেউ দেওয়ালের আড়ালে লুকিয়ে পড়েন। কিন্তু অনেকেই পালানোর সুযোগ পাননি।

হাসপাতালে ভর্তি আর এক আহত ব্যক্তি জানান, তিনি ছেলের পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে এসেছিলেন। তাঁর কথায়, “এক মুহূর্তে সব বদলে গেল। এখন নথির কথা ভাবছি না, শুধু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে চাই।”

চিকিৎসকদের মতে, কয়েকজনের শরীরে গুলি বা পেলেটের আঘাত রয়েছে। একাধিক আহতের অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে। বেশ কয়েকজনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। চিকিৎসকদের দাবি, দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হওয়ায় অনেকের অবস্থা স্থিতিশীল রাখা গেছে।

ঘটনার পর আহতদের পরিবারের ক্ষোভ তীব্র হয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রশাসনিক দফতরে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। সেখানে যদি মানুষ সরকারি নথি সংগ্রহ করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হন, তবে প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখা কঠিন।

ঘটনার পরে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, কোন পরিস্থিতিতে গুলিচালনার প্রয়োজন হল, বলপ্রয়োগের মাত্রা যথাযথ ছিল কি না এবং নিরীহ মানুষ কীভাবে গুলির মুখে পড়লেন—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি ঘটনাটিকে প্রশাসনিক ব্যর্থতা বলে কটাক্ষ করেছে। তাদের দাবি, পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে লক্ষ্য করে বা তাঁদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে কোনওভাবেই বলপ্রয়োগ করা উচিত ছিল না। অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, তবে নিরীহ মানুষের আহত হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।

মানবাধিকার কর্মীদের একাংশও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, জনতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নির্ধারিত প্রোটোকল কঠোরভাবে মেনে চলা জরুরি। প্রশাসনিক পরিষেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষ যাতে সংঘর্ষের বলি না হন, তা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, সংঘাতের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সেই সাধারণ মানুষ, যাঁদের কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে না। জাতি ও আয়ের শংসাপত্র সংগ্রহের মতো একটি দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজ করতে এসে যাঁদের গুলিবিদ্ধ হতে হয়েছে, তাঁদের অভিজ্ঞতা বিহারের প্রশাসনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।