বাংলাস্ফিয়ার: ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউস সংবাদদাতাদের নৈশভোজে উপস্থিত হয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক ঘণ্টার দীর্ঘ ভাষণে সাংবাদিকদের উদ্দেশে যেমন একাধিক রসিকতা করেন, তেমনই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, সংবাদমাধ্যম এবং সমালোচকদের কড়া কটাক্ষও করেন। যদিও তিনি আবার শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকদের কাজের প্রশংসা করে বলেন, তাঁরা “অসাধারণ কাজ” করছেন।
এই নৈশভোজটি হওয়ার কথা ছিল গত এপ্রিল মাসে। কিন্তু অনুষ্ঠানস্থলের বাইরে নিরাপত্তা তল্লাশি চৌকিতে এক বন্দুকধারীর গুলিচালনার ঘটনার পর তা বাতিল করা হয়। শুক্রবার নতুন করে ওয়াশিংটনের ওয়ালডর্ফ অ্যাস্টোরিয়া হোটেলে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানের মাত্র এক দিন আগে ট্রাম্প প্রশাসন সাংবাদিকদের রিপোর্টিং-সংক্রান্ত তথ্য আদায়ের উদ্দেশ্যে সমন জারির বিতর্কিত পরিকল্পনা আপাতত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা উদ্যাপনের এই অনুষ্ঠানে ট্রাম্পের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ভাষণের শুরুতেই ট্রাম্প বলেন, তিনি প্রথমে যে ভাষণ লিখেছিলেন, তা “বড়সড় ঝড় তুলত”। পরে তিনি রসিকতার সুরে বলেন, “আমার প্রেসিডেন্সির মতোই দ্বিতীয় বারটাই সব সময় ভালো হয়। আর তৃতীয় বার তো আরও ভালো হবে… মজা করলাম।”
পুরো ভাষণে তিনি বারবার সংবাদমাধ্যমকে “ফেক নিউজ” ছড়ানোর অভিযোগে বিদ্ধ করেন। একই সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, পরিস্থিতি “অত্যন্ত ভালো” চলছে। এরপর সাংবাদিকদের উদ্দেশে তাঁর মন্তব্য, “ফেক নিউজকে বিশ্বাস করবেন না।”
ট্রাম্প তাঁর স্বাস্থ্যসচিব রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রকে নিয়েও মজা করেন। রাতের ভোজে পরিবেশিত গরুর মাংসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “খুব সুস্বাদু এই গরুর মাংসের জন্য যে গরুটি ব্যবহার হয়েছে, সেটিকে বোধহয় কেনেডিই নিজে গাড়ি চাপা দিয়েছেন।” উল্লেখ্য, কেনেডি দীর্ঘদিন ধরেই গরুর চর্বি ও প্রাণিজ প্রোটিনের স্বাস্থ্যগত উপকারিতার পক্ষে সওয়াল করে আসছেন।
এর পাশাপাশি নিউ জার্সির প্রাক্তন গভর্নর ক্রিস ক্রিস্টি এবং কংগ্রেস সদস্য জেরি ন্যাডলারের শারীরিক গঠন নিয়ে কৌতুক করেন ট্রাম্প। তিনি কল্পনা করেন, দু’জন একটি চিজকেকের টুকরো নিয়ে কুস্তি করছেন। সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিনকে নিয়েও কটাক্ষ করে বলেন, তিনি “ভীষণ খারাপ দেখাচ্ছেন”। সিএনএনের হোয়াইট হাউস সংবাদদাতা কেটলান কলিন্স সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, “ও কখনও হাসে না।” ক্যালিফোর্নিয়ার ডেমোক্র্যাট সিনেটর অ্যাডাম শিফকে তিনি “ঘৃণা করেন” বলেও মন্তব্য করেন এবং তাঁর চেহারা নিয়েও ব্যঙ্গ করেন।
একটি রসিকতা প্রত্যাশিত সাড়া না পেলে ট্রাম্প হঠাৎ ভাষণের মাঝখানেই বলেন, “এই বোকা বোকা ভাষণটা যারা লিখেছে, সেটা আদৌ কেউ বুঝতে পারছেন?”
ভাষণের শেষেও তিনি বিতর্কিত মন্তব্য করেন। মাথায় লাল রঙের “Trump 2028” লেখা টুপি পরে তিনি বলেন, “আমি তিন বার জিতেছি, এবার আবার জিতব।” এই মন্তব্যে তিনি একদিকে যেমন ২০২০ সালের নির্বাচনে জয়ের ভিত্তিহীন দাবি পুনরাবৃত্তি করেন, তেমনই সংবিধানে নির্ধারিত দুই মেয়াদের সীমা থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে লড়ার প্রসঙ্গেও রসিকতা করেন।
এবারের অনুষ্ঠানে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কোনও কৌতুকাভিনেতার বদলে বিশ্বখ্যাত মেন্টালিস্ট ওজ পার্লম্যান উপস্থিত দর্শকদের বিনোদন দেন।
ট্রাম্পের বক্তব্যের আগে তাঁর প্রশাসন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা একাধিক সাংবাদিক ও সংবাদদলকে পুরস্কৃত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর সেই দলও, যারা জেফ্রি এপস্টিনকে লেখা ট্রাম্পের কথিত একটি চিঠি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। ওই প্রতিবেদনের জেরে ট্রাম্প সংবাদপত্রটির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
হোয়াইট হাউস করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের বিদায়ী সভাপতি ওয়েইজা জিয়াং বলেন, রাষ্ট্রপতি এবং সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক যতই জটিল বা উত্তেজনাপূর্ণ হোক না কেন, উভয়েরই একটি অভিন্ন দায়িত্ব রয়েছে— আমেরিকার মানুষের সেবা করা।
এ বছরের অনুষ্ঠানটি উৎসর্গ করা হয় সিক্রেট সার্ভিসের কর্মকর্তা ভিক্টর গঞ্জালেস এবং সেই হোটেলের কর্মীদের, যাঁরা এপ্রিলের বন্দুক হামলার সময় বহু মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সাহায্য করেছিলেন। ওই হামলার অভিযুক্ত কোল অ্যালেন প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রেসিডেন্টদের এই নৈশভোজে বক্তৃতা দেওয়া দীর্ঘদিনের রীতি হলেও ট্রাম্প তাঁর প্রথম প্রেসিডেন্ট মেয়াদের কোনও বছরই এই অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। দ্বিতীয় মেয়াদে এটিই ছিল তাঁর প্রথম উপস্থিতি।
অনুষ্ঠানে এবারে অনুপস্থিত ছিলেন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এপ্রিল মাসের অনুষ্ঠানে তাঁরা উপস্থিত ছিলেন।