খবর

প্রশ্নফাঁস রুখতে সর্বসম্মতির নজির: কীভাবে বিরোধীদের সমর্থনেই লোকসভায় পাস হয়েছিল ২০২৪-এর কড়া আইন

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ২০২৬ সালের নীট-সহ একাধিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং তার জেরে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের আবহে ফের আলোচনায় উঠে এসেছে Public Examinations (Prevention of Unfair Means)…
  • কেন্দ্র এখন এই আইনকে আরও কঠোর করার জন্য সংশোধনী আনতে চলেছে।
  • তবে অনেকেই ভুলে গিয়েছেন, ২০২৪ সালে এই আইনটি লোকসভায় পাস হয়েছিল বিরল রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

২০২৬ সালের নীট-সহ একাধিক পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ এবং তার জেরে দেশজুড়ে ছাত্র আন্দোলনের আবহে ফের আলোচনায় উঠে এসেছে Public Examinations (Prevention of Unfair Means) Act, 2024। কেন্দ্র এখন এই আইনকে আরও কঠোর করার জন্য সংশোধনী আনতে চলেছে। তবে অনেকেই ভুলে গিয়েছেন, ২০২৪ সালে এই আইনটি লোকসভায় পাস হয়েছিল বিরল রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে। সরকার ও বিরোধী—দুই পক্ষই মনে করেছিল, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার স্বচ্ছতা রক্ষায় কঠোর আইন অপরিহার্য।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংসদে বিলটি পেশ করেন তৎকালীন কেন্দ্রীয় কর্মীবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী জিতেন্দ্র সিং। সেই সময়েই সরকারের যুক্তি ছিল, প্রশ্নফাঁস এখন আর বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এর পিছনে রয়েছে সংগঠিত অপরাধচক্র, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং বিপুল আর্থিক লেনদেন। ফলে শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যবস্থায় এই সমস্যার মোকাবিলা সম্ভব নয়, প্রয়োজন বিশেষ আইন।

কেন নতুন আইনের প্রয়োজন হয়েছিল

এর আগে বিভিন্ন রাজ্যে এবং কেন্দ্রীয় স্তরে বহু বড় পরীক্ষা প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে বাতিল বা স্থগিত হয়েছে। শিক্ষক নিয়োগ, পুলিশ নিয়োগ, মেডিক্যাল, ইঞ্জিনিয়ারিং-সহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় দুর্নীতির অভিযোগে লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল।

সরকার সংসদে জানায়, পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার স্পষ্ট কাঠামো ছিল না। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই এই আইন আনা হয়।

বিরোধীদের অবস্থান

বিলের বিরোধিতা করার বদলে বিরোধী দলগুলি মূলত আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায়।

কংগ্রেস, ডিএমকে, তৃণমূল কংগ্রেস, এনসিপি-সহ একাধিক দল প্রশ্নফাঁসকে “যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংসকারী অপরাধ” বলে অভিহিত করে। তারা সরকারের কাছে জানতে চায়—

  • তদন্ত কত দ্রুত শেষ হবে,
  • ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে,
  • পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থাগুলির জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে,
  • এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আরও কীভাবে বাড়ানো হবে।

অর্থাৎ, বিরোধিতা ছিল আইনের উদ্দেশ্য নিয়ে নয়; বরং আইনকে আরও কার্যকর করার দাবিতে।

আইনের প্রধান বৈশিষ্ট্য

২০২৪ সালের আইনে বলা হয়, সংগঠিতভাবে প্রশ্নফাঁস, উত্তরপত্র বিক্রি, পরীক্ষায় কারচুপি, কম্পিউটার সিস্টেম হ্যাকিং অথবা পরীক্ষা পরিচালনায় প্রযুক্তিগত নাশকতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি হবে।

মূল বিধানগুলির মধ্যে রয়েছে—

  • সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড।
  • সর্বোচ্চ ₹১ কোটি পর্যন্ত জরিমানা।
  • সংগঠিত অপরাধচক্রের ক্ষেত্রে আরও কঠোর আর্থিক দায়বদ্ধতা।
  • পরীক্ষা পরিচালনাকারী সংস্থার ক্ষতির অর্থও দোষীদের কাছ থেকে আদায়ের ব্যবস্থা।
  • সিবিআই-সহ কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাকে তদন্তের সুযোগ।

একই সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট করা হয়েছিল—সাধারণ পরীক্ষার্থী যদি কোনও অপরাধচক্রের অংশ না হন, তবে তাঁদের অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। লক্ষ্য ছিল মূলত প্রশ্নফাঁস চক্র, দালাল এবং সংগঠিত অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।

সংসদে বিরল ঐকমত্য

লোকসভার বিতর্কে সরকার দাবি করেছিল, এই আইন রাজনৈতিক নয়; এটি দেশের কোটি কোটি পরীক্ষার্থীর স্বার্থে। বিরোধীরাও একই বক্তব্যের সঙ্গে একমত হয়। ফলে বিলটি কার্যত সর্বসম্মতিক্রমেই পাস হয় এবং পরে রাজ্যসভাতেও অনুমোদন পায়।

সংসদে বহু সদস্য বলেন, পরীক্ষায় স্বচ্ছতা রক্ষা করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গেও জড়িত। একজন মেধাবী ছাত্র যদি দুর্নীতির কারণে সুযোগ হারায়, তবে রাষ্ট্রের ওপর মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হয়।

তবুও কেন ফের সংশোধন?

২০২৬ সালের নীট প্রশ্নফাঁস কাণ্ড দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু আইন থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না। তদন্তের গতি, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, পরীক্ষা সংস্থার জবাবদিহি এবং দ্রুত বিচার—এই ক্ষেত্রগুলিতে আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে সরকার মনে করছে।

তাই কেন্দ্র এখন আইনের সংশোধনী এনে জরিমানার পরিমাণ বাড়ানো, দ্রুত তদন্ত ও বিচার বাধ্যতামূলক করা, বিশেষ আদালতের ব্যবস্থা এবং সংগঠিত প্রশ্নফাঁস চক্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির প্রস্তাব এনেছে।

অর্থাৎ, ২০২৪ সালে যে আইনের ভিত্তি তৈরি হয়েছিল বিরল দ্বিদলীয় ঐকমত্যে, ২০২৬ সালে সেই আইনকেই আরও শক্তিশালী করার পথে এগোচ্ছে কেন্দ্র। প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও, দেশের কোটি কোটি পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ রক্ষার প্রশ্নে সংসদে যে ঐকমত্য গড়ে উঠেছিল, সেটিই এই আইনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles