Home খবর আগুনে পুড়ছে ইউরোপ, ঘরছাড়া ৮০ হাজার!

আগুনে পুড়ছে ইউরোপ, ঘরছাড়া ৮০ হাজার!

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
8 views 3 minutes read
A+A-
Reset

ফ্রান্স ও স্পেনে দাবানলের তাণ্ডবে কার্যত বিপর্যস্ত দক্ষিণ ইউরোপ। একদিকে ফ্রান্সের জনপ্রিয় সমুদ্রতীরবর্তী পর্যটনকেন্দ্র ক্যাপ ফেরে সম্পূর্ণ খালি করার নির্দেশ, অন্যদিকে মাদ্রিদের উপকণ্ঠে একাধিক দাবানল একত্রিত হয়ে তৈরি করেছে বিশাল অগ্নিকাণ্ড। সব মিলিয়ে দুই দেশে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

পরিস্থিতির গুরুত্ব এতটাই বেশি যে স্পেন প্রথমবারের মতো জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে।

নৌকায় করে পালাচ্ছেন পর্যটকরা

দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের জিরন্দ অঞ্চলে দাবানল ইতিমধ্যেই ১২,৫০০ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি পুড়িয়ে দিয়েছে। আগুনের গতি এতটাই দ্রুত যে ক্যাপ ফেরে উপদ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটকদের ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

সড়কপথও বিপজ্জনক হয়ে পড়ায় বহু মানুষকে নৌকায় করে নিরাপদ এলাকায় পৌঁছে দিতে হয়েছে। গত দু’দিনে শুধু ক্যাপ ফেরে এলাকা থেকেই ৪৪ হাজারেরও বেশি মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে বহু পর্যটক ছিলেন, যারা ক্যাম্পসাইট ও ভাড়া বাড়িতে ছুটি কাটাতে এসেছিলেন।

আগুনের জেরে ক্যাপ ফেরের একমাত্র সড়কপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় শত শত মানুষকে নৌপথে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

‘এমন আগুন আগে দেখিনি’

ক্যাপ ফেরের আগুন নেভাতে প্রায় ৮০০ দমকলকর্মী এবং চারটি জলবাহী বিমান মোতায়েন করা হয়েছে। বুধবার বোর্দোর পশ্চিমে সাওমোস গ্রামের কাছে আগুনের সূত্রপাত হয়। এখনও আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

ক্যাপ ফেরের দিকে যাওয়া অধিকাংশ সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আগুনে অন্তত ৮০টি বাড়ি পুড়ে গেছে।

৮৬ বছরের বনমালিক জঁ মাজোদিয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লে মঁদ’-কে তিনি বলেন, “আগেও অনেক আগুন দেখেছি, কিন্তু এত ভয়াবহ কখনও নয়। সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। যেন নিজের সন্তানকে হারালাম।”

আরও ২৫ হাজার মানুষ ঘরছাড়া

একই অঞ্চলের জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র বিসকারোসের কাছেও আরেকটি দাবানলে ২,৫০০ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে। সেখান থেকে প্রায় ২৫ হাজার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

আগুন নিয়ন্ত্রণে ৬০০-র বেশি দমকলকর্মী কাজ করছেন। তবে প্রশাসনের মতে, পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে এবং আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে।

কোথাও কোথাও আগুনের শিখা ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়ে উঠছে।

মাদ্রিদের আকাশেও আগুনের আতঙ্ক

স্পেনেও পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মাদ্রিদের উপকণ্ঠে দুটি বড় দাবানল একত্রিত হয়েছে। তৃতীয় একটি আগুনও তাদের সঙ্গে মিশে যেতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তীব্র তাপপ্রবাহ, দীর্ঘদিনের খরা এবং প্রবল বাতাস একসঙ্গে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে।

মাদ্রিদের আঞ্চলিক প্রধান ইসাবেল দিয়াজ আয়ুসো এই পরিস্থিতিকে “আমাদের অঞ্চলের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ দাবানল” বলে বর্ণনা করেছেন।

তাঁর কথায়, “এটি এক নজিরবিহীন পরিস্থিতি—অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রা এবং অবিরাম ঝোড়ো হাওয়ার এক মারাত্মক সমন্বয়।”

জলবায়ু পরিবর্তনের সতর্কবার্তা

বিজ্ঞানীরা বলছেন, ইউরোপে তাপপ্রবাহ, খরা এবং দাবানলের মতো চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমশ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের গড় তাপমাত্রার তুলনায় ইউরোপের তাপমাত্রা প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞদের দাবি।

ফলে মাটি ও জলাধার দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে এবং সামান্য আগুনও দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

২০২২ সালেও দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সে দাবানলে ৩০ হাজার হেক্টরের বেশি বনভূমি পুড়ে গিয়েছিল এবং প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল। এবারও শুষ্ক বনাঞ্চল ও প্রবল বাতাস আগুনের গতি বাড়িয়ে দিচ্ছে।

ইউরোপের সাহায্যে আগুনের বিরুদ্ধে লড়াই

পরিস্থিতি সামাল দিতে ফ্রান্স ও স্পেন—দুই দেশই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাহায্য চেয়েছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সিভিল প্রোটেকশন মেকানিজম সক্রিয় করা হয়েছে। ক্রোয়েশিয়া, পর্তুগাল, চেক প্রজাতন্ত্র এবং স্লোভাকিয়া থেকে অগ্নিনির্বাপণ বিমান ও ভারী হেলিকপ্টার পাঠানো হচ্ছে ফ্রান্সে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ জানিয়েছেন, শুক্রবার দেশজুড়ে বিভিন্ন মাত্রার ৩২টি দাবানল জ্বলছিল। চলতি বছর ইতিমধ্যেই ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে গেছে—গত বছরের একই সময়ের তুলনায় যা প্রায় চার গুণ।

দক্ষিণ-পূর্ব ফ্রান্সের ভার অঞ্চলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ায় সেখানকার কয়েকটি অগ্নিনির্বাপণ দল ও জলবাহী বিমানও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পাঠানো হয়েছে।

তবে পরিস্থিতি এখনও সংকটজনক।

দক্ষিণ ইউরোপে যখন একের পর এক তাপপ্রবাহ আছড়ে পড়ছে, তখন ফ্রান্স ও স্পেনের দাবানল ফের মনে করিয়ে দিচ্ছে—জলবায়ু পরিবর্তনের আগুন আর ভবিষ্যতের কোনও আশঙ্কা নয়, তা ইতিমধ্যেই দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles