Table of Contents
দিল্লিতে ছাত্রদের ‘সংসদ চলো’ কর্মসূচিকে ঘিরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর ফের বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে পেলেট গান। আহত কয়েকজনের শরীরে পেলেট সদৃশ ক্ষত, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি-ভিডিও—সব মিলিয়ে এখন বড় প্রশ্ন, রাজধানীতে ভিড় নিয়ন্ত্রণে কি সত্যিই ব্যবহার করা হয়েছে এই বিতর্কিত অস্ত্র?
দিল্লি পুলিশ বা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলি এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পেলেট গান ব্যবহারের কথা স্বীকার করেনি। তবে আহতদের চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলির উদ্বেগে বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তত তিনজন আহতের শরীরে পেলেটজাতীয় ক্ষতচিহ্ন পাওয়া গেছে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। আরও একটি ঘটনার কথা সামাজিক মাধ্যমে ছড়ালেও তা এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
চোখ হারানোর আশঙ্কায় ছাত্র
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলির একটি ২০ বছর বয়সি ছাত্র সাহিল লোচাবকে ঘিরে। তাঁর মুখ, কাঁধ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে একাধিক ক্ষত রয়েছে। একটি চোখ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, সেই চোখের দৃষ্টিশক্তি স্থায়ীভাবে হারিয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে দিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস (এআইআইএমএস)-এ চিকিৎসাধীন সাহিল।
আরেক আহত, শেখ ইরশাদ মনসুরি, লেডি হার্ডিঞ্জ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর শরীর থেকে একাধিক ছোট ধাতব কণা বের করেছেন বলে জানা গেছে। তবে কণাগুলি ঠিক কী ধরনের, সে বিষয়ে এখনও সরকারি ফরেনসিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি।
আর এখানেই তৈরি হয়েছে মূল রহস্য—শরীরে ধাতব কণা পাওয়া গেলেও সেগুলি কি সত্যিই পেলেট?
পেলেট গান আসলে কী?
পেলেট গান মূলত এমন এক ধরনের শটগান, যা একসঙ্গে অসংখ্য ছোট ধাতব বল বা পেলেট ছুড়ে দেয়। একসময় ভিড় নিয়ন্ত্রণে এটিকে ‘কম প্রাণঘাতী’ অস্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে এর আঘাতে বহু মানুষের স্থায়ী অন্ধত্ব, গুরুতর শারীরিক ক্ষতি এমনকি মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কাছ থেকে ছোড়া হলে বা মুখ ও চোখে আঘাত লাগলে এর ক্ষতি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। ছোট ধাতব বলগুলি শরীরে ঢুকে গেলে অনেক সময় অস্ত্রোপচারের পরও সব কণা বের করা সম্ভব হয় না।
অর্থাৎ ‘কম প্রাণঘাতী’ মানেই ‘কম ক্ষতিকর’—এমনটা মোটেই নয়।
কাশ্মীরের স্মৃতি ফের সামনে
ভারতে পেলেট গান নিয়ে বিতর্কের প্রধান সূত্র জম্মু ও কাশ্মীর। ২০১০ সালের পর এবং বিশেষ করে ২০১৬ সালে বুরহান ওয়ানির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ দমনে ব্যাপকভাবে এই অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
সেই সময় শত শত মানুষ চোখে গুরুতর আঘাত পান। অনেকে স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। চক্ষু বিশেষজ্ঞরা ‘পেলেট আই ইনজুরি’ নামে একটি পৃথক চিকিৎসাগত সমস্যার কথাও তুলে ধরেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ ছিল, ভিড় নিয়ন্ত্রণের নামে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগ করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা যুক্তি, প্রাণঘাতী গুলির তুলনায় পেলেট গান অপেক্ষাকৃত কম মারাত্মক বিকল্প।
এই বিতর্কই এবার নতুন করে দিল্লির দরজায় ফিরে এসেছে।
দিল্লিতে কেন এত প্রশ্ন?
ছাত্র আন্দোলনের সময় আহতদের শরীরে পেলেট সদৃশ ক্ষত এবং ধাতব কণা পাওয়ার দাবি সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে—কাশ্মীরের বাইরে কি ফের এই অস্ত্র ব্যবহারের নজির তৈরি হল?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সত্যিই পেলেট গান ব্যবহার করা হয়ে থাকে, তাহলে কয়েকটি প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন:
- কোন পরিস্থিতিতে অস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছিল?
- কার অনুমতিতে তা ব্যবহার করা হয়?
- কোন স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর বা এসওপি অনুসরণ করা হয়েছিল?
- পরিস্থিতির তুলনায় ব্যবহৃত শক্তি কি আনুপাতিক ছিল?
মানবাধিকার কর্মীদের বক্তব্য, ভিড় নিয়ন্ত্রণে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় শক্তি ব্যবহারের নীতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। তাই গুরুতর চোটের অভিযোগ উঠলে স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত।
অন্যদিকে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, পুলিশের ওপর হামলা হলে বাহিনীর আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে। তবে অস্ত্রের ধরন, ব্যবহারের মাত্রা এবং পরিস্থিতির সঙ্গে তার সামঞ্জস্য—সবকিছুই খতিয়ে দেখা জরুরি।
পেলেট, নাকি অন্য কিছু?
এখনও কোনও সরকারি ফরেনসিক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি, যা নিশ্চিতভাবে জানাতে পারে আহতদের শরীরে পাওয়া ধাতব কণাগুলি ঠিক কী ধরনের।
পুলিশও আনুষ্ঠানিকভাবে পেলেট গান ব্যবহারের কথা স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।
ফলে দিল্লির সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনও অমীমাংসিত—
আসলেই কি পেলেট গান ব্যবহার করা হয়েছিল, নাকি অন্য কোনও ভিড়-নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কারণে এই ধরনের আঘাত লেগেছে?
সরকারি তদন্ত, চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রমাণ এবং ফরেনসিক বিশ্লেষণই শেষ পর্যন্ত এই রহস্যের উত্তর দিতে পারে। তার আগে পর্যন্ত দিল্লির রাস্তায় ওঠা এই ‘পেলেট প্রশ্ন’ যে আরও বড় রাজনৈতিক ও মানবাধিকার বিতর্কে পরিণত হবে, তা বলাই যায়।