Table of Contents
মাত্র ১১ বছর ৪ মাস বয়সেই দাবার ইতিহাসে নিজের নাম লিখিয়ে ফেললেন ইংল্যান্ডের হারোর ছাত্রী বোধনা শিবানন্দন। ফ্রান্সের ২৬২৮ রেটিংধারী গ্র্যান্ডমাস্টার মার্ক-আন্দ্রিয়া মরিজিকে হারিয়ে ৩৮ বছর পুরনো একটি বিশ্বরেকর্ড ভেঙে দিলেন এই বিস্ময়বালিকা।
১৯৮৮ সালে কিংবদন্তি জুডিত পোলগার ১২ বছর ২ মাস বয়সে ২৬০০-এর বেশি রেটিংধারী কোনও গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারিয়ে যে রেকর্ড গড়েছিলেন, এবার তা ভেঙে গেল। বোধনা সেই কীর্তি অর্জন করলেন আরও কম বয়সে—মাত্র ১১ বছর ৪ মাসে।
এক ভুলেই পাল্টে গেল পুরো ম্যাচ
ফ্রান্সের এইক্স-আঁ-প্রোভঁসে অনুষ্ঠিত ডোল ওপেন টুর্নামেন্টের প্রথম রাউন্ডেই ইতিহাস গড়েন বোধনা। তাঁর প্রতিপক্ষ ছিলেন ১৯ বছর বয়সি ফরাসি গ্র্যান্ডমাস্টার এবং বর্তমান ফরাসি চ্যাম্পিয়ন মার্ক-আন্দ্রিয়া মরিজি।
২০২৩ সালের বিশ্ব জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন মরিজি ম্যাচের প্রথম ২৭ চাল পর্যন্ত যথেষ্ট ভালো অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু এরপরই একটি বড় কৌশলগত ভুল করে বসেন তিনি। সেই সুযোগ একেবারেই হাতছাড়া করেননি বোধনা। নিখুঁত চালের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের রানী জিতে নিয়ে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ নিজের করে নেন।
এর আগে দু’জন গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারিয়েছিলেন বোধনা। তবে মরিজির ২৬২৮ রেটিংয়ের মতো উচ্চ রেটিংধারী গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারানোর নজির তাঁর ছিল না।
এই জয়ের ফলে তিনি ২৬০০-এর বেশি রেটিংধারী গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারানো ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ মেয়ে দাবাড়ু হয়ে গেলেন।
সর্বকনিষ্ঠদের তালিকাতেও পাঁচে
শুধু মেয়েদের মধ্যে নয়, সামগ্রিক তালিকাতেও বোধনার এই সাফল্য নজরকাড়া। ১১ বছর ৪ মাস বয়সে ২৬০০-এর বেশি রেটিংধারী গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারিয়ে তিনি সর্বকনিষ্ঠ দাবাড়ুদের তালিকায় পঞ্চম স্থানে উঠে এসেছেন।
তাঁর আগে রয়েছেন—
- উজবেকিস্তানের নোদিরবেক আব্দুসাত্তোরভ — ৯ বছর
- আর্জেন্টিনার ফাউস্তিনো ওরো — ১০ বছর
- রাশিয়ার রোমান শগদঝিয়েভ — ১১ বছর ১ মাস
- ভারতের আর. প্রজ্ঞানানন্দ — ১১ বছর ১ মাস
প্রথম রাউন্ডের এই ঐতিহাসিক জয়ের পর দ্বিতীয় রাউন্ডে ইজরায়েলের আন্তর্জাতিক মাস্টার বেনি আইজেনবার্গের কাছে হারলেও তৃতীয় রাউন্ডেই আবার বড় চমক দেন বোধনা।
সাবেক ২৭১০ রেটিংধারী এবং ইজরায়েলের বর্তমান দুই নম্বর গ্র্যান্ডমাস্টার ম্যাক্সিম রডশ্টাইনের সঙ্গে ড্র করেন তিনি।
বিশ্বরেকর্ড যেন বোধনার অভ্যাস!
বোধনার রেকর্ডের তালিকা অবশ্য এখানেই শেষ নয়। গত বছর মাত্র ১০ বছর বয়সে একই ডোল ওপেনে তিনি প্রথম নারী গ্র্যান্ডমাস্টার বা ডব্লিউজিএম নর্ম অর্জন করেছিলেন। সেটিও ছিল তখন একটি বিশ্বরেকর্ড।
এবার নয় রাউন্ডের প্রতিযোগিতায় ছয় রাউন্ড শেষে তিন পয়েন্ট সংগ্রহ করে ডব্লিউজিএম খেতাবের জন্য প্রয়োজনীয় তিনটি নর্মের দ্বিতীয়টি অর্জনের লড়াইয়ে টিকে ছিলেন তিনি।
দাবার বোর্ডে বয়স যে নিছক একটি সংখ্যা—বোধনা শিবানন্দন যেন তারই জীবন্ত প্রমাণ।
চেন্নাইয়ে ফিরুজার জয়, গুকেশের দুঃসময়
এদিকে চেন্নাই গ্র্যান্ডমাস্টার্স টুর্নামেন্টে শিরোপা জিতেছেন ফ্রান্সের আলিরেজা ফিরুজা। এই জয়ের ফলে তিনি আবারও বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের সেরা দশে ফিরে এসেছেন।
অন্যদিকে ভারতের বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন গুকেশ ডোম্মারাজুর দুঃসময় অব্যাহত। নিজের ঘরের মাঠে চেন্নাই গ্র্যান্ডমাস্টার্সে একটি ম্যাচও জিততে পারেননি তিনি।
ফলে তাঁর লাইভ রেটিং নেমে হয়েছে ২৭০৩ এবং বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ে তিনি ৩১ নম্বরে নেমে গেছেন। সামনে সমরকন্দ অলিম্পিয়াডের পরই তাঁর বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচ। তার আগে এই ফর্ম নিশ্চয়ই গুকেশের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
ফিদে নির্বাচনেও জমছে লড়াই
এদিকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে সমরকন্দ অলিম্পিয়াড চলাকালীন আন্তর্জাতিক দাবা সংস্থা ফিদের সভাপতি নির্বাচন হওয়ার কথা।
বর্তমান সভাপতি আরকাদি দ্বোরকোভিচ ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিষেধাজ্ঞার মুখে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ভারতের প্রাক্তন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বিশ্বনাথন আনন্দ অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এখন পর্যন্ত ফিদে সভাপতি পদে চারজন প্রার্থীর নাম সামনে এসেছে—আরকাদি দ্বোরকোভিচ, জার্মান উদ্যোক্তা ইয়ান হেনরিক বিউটনার, ব্যবসায়ী ভাদিম রোজেনস্টাইন এবং সাবেক ফিদে সভাপতি কিরসান ইলিউমঝিনভ।
শেষোক্ত প্রার্থী ইতিমধ্যেই বড় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। নির্বাচিত হলে বিশ্বের এক নম্বর দাবাড়ু ম্যাগনুস কার্লসেনকে আবার ক্লাসিক্যাল দাবায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
তবে এই মুহূর্তে দাবার দুনিয়ায় সবচেয়ে বড় আলোচনার নাম একটাই—বোধনা শিবানন্দন।
মাত্র ১১ বছরেই তিনি শুধু একজন গ্র্যান্ডমাস্টারকে হারাননি, ভেঙেছেন কিংবদন্তি জুডিত পোলগারের ৩৮ বছরের পুরনো রেকর্ডও। দাবার বোর্ডে তাঁর এই ঝড় যে এখনও শুরু মাত্র, তা বলাই যায়।