Home International যুদ্ধের ছায়ায় ফাঁসির দড়ি

যুদ্ধের ছায়ায় ফাঁসির দড়ি

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
11 views 3 minutes read
A+A-
Reset

ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, যুদ্ধকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিরোধী, বিক্ষোভকারী, নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য এবং গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর দমননীতি চালাচ্ছে ইরান সরকার।

এর জেরে একের পর এক ফাঁসির ঘটনা নতুন করে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ তৈরি করেছে।

এই পরিস্থিতির অন্যতম আলোচিত নাম ৩৪ বছরের পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষক ও গবেষক ভাহিদ বানিয়ামেরিয়ান। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও আনুষ্ঠানিক নোটিস দেওয়া হয়নি। এমনকি তাঁর আইনজীবীকেও কিছু জানানো হয়নি।

পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারেন রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের রায় বহাল রাখার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর।

ইরানের বাইরে থাকা পরিবারের এক ঘনিষ্ঠ সদস্য সংবাদমাধ্যমকে বলেন, “কোনও সতর্কবার্তা ছিল না। আইনজীবীও কিছু জানতেন না। এমনকি ইরানের কঠোর আইন মেনেও এই প্রক্রিয়াকে বৈধ বলা যায় না।”

নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়ার অভিযোগ

বানিয়ামেরিয়ানের বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত পিপলস মুজাহিদিন অর্গানাইজেশন অব ইরান (MEK)-এর সদস্য হওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল।

একই মামলায় আরও পাঁচজনের সঙ্গে তাঁকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে তাঁদের সকলেরই ফাঁসি কার্যকর করা হয় বলে জানা গিয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, যুদ্ধ শুরুর পর রাজনৈতিক বন্দিদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

শুধু বিরোধী সংগঠনের সদস্য নয়—সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া প্রতিবাদকারী, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য এবং বিদেশি শক্তির হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও দ্রুত বিচার করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ।

বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, এই ধরনের মামলায় বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

অভিযুক্তদের আইনজীবীদের সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া হয় না। পরিবারের সদস্যদের আগাম জানানো হয় না। অনেক ক্ষেত্রে বিচারপ্রক্রিয়াও গোপনে সম্পন্ন হয় বলে অভিযোগ।

ফলে শুধু মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নয়, পুরো বিচারব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েই প্রশ্ন তুলছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

যুদ্ধ কি হয়ে উঠছে দমননীতির ঢাল?

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ইরান সরকার একদিকে অভ্যন্তরীণ বিরোধিতা দমন করতে চাইছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে কঠোর বার্তা দিতে চাইছে।

ইজরায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে সংঘাতের আবহে ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ এবং ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’-এর অভিযোগ আরও ঘন ঘন সামনে আসছে।

মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বিরোধিতা ও ভিন্নমতকে ক্রমশ নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।

ইরানের বক্তব্য: আইন মেনেই মৃত্যুদণ্ড

ইরান অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

সরকারের বক্তব্য, মৃত্যুদণ্ড শুধুমাত্র গুরুতর অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের মতো মামলায় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কার্যকর করা হয়। দেশের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং আদালত স্বাধীনভাবেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে বলেও দাবি তেহরানের।

তবে আন্তর্জাতিক মহল এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়।

মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, রাজনৈতিক মতপ্রকাশ এবং সরকারের বিরোধিতাকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। যুদ্ধের আবহকে কাজে লাগিয়ে ভিন্নমত দমনের অভিযান আরও জোরদার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠছে।

জাতিসংঘের উদ্বেগ

জাতিসংঘ-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইরানে মৃত্যুদণ্ডের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

তাদের দাবি, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে, রাজনৈতিক বন্দিদের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।

যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই ইরানে মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা বাড়ছে।

বিরোধী সংগঠন, অধিকারকর্মী এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নিরাপত্তার নামে রাষ্ট্রের কঠোরতা বাড়তে থাকলে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের পরিসর আরও সংকুচিত হতে পারে।

ভাহিদ বানিয়ামেরিয়ানের মতো ঘটনাগুলি সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।

যুদ্ধের বিস্ফোরণ যতটা দৃশ্যমান, তার ছায়ায় নিঃশব্দে সংকুচিত হয়ে আসা নাগরিক অধিকার নিয়ে উদ্বেগও ততটাই গভীর।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles