ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন ছবি ‘দ্য ওডিসি’ মাত্র ৯১ দিনের শুটিংয়ে শেষ হওয়ার খবর চলচ্চিত্র জগতে রীতিমতো আলোড়ন ফেলেছে। বিশাল বাজেট, একাধিক দেশে শুটিং এবং আন্তর্জাতিক তারকাখচিত কাস্ট—সব মিলিয়ে এত বড় মাপের একটি ছবি কীভাবে তিন মাসেরও কম সময়ে শেষ হল, সেই প্রশ্নই এখন ঘুরছে ভারতীয় চলচ্চিত্র মহলে।
এই বিতর্কে এবার নিজের মতামত জানালেন ‘U Turn’, ‘Dhoomam’ এবং নেটফ্লিক্স সিরিজ ‘Leila’-এর পরিচালক পবন কুমার। তাঁর মতে, এর কৃতিত্ব শুধু নোলানের ব্যক্তিগত দক্ষতার নয়। বরং দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করা একটি দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং পেশাদার টিমই এই সাফল্যের আসল চাবিকাঠি।
ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে পবন কুমার লেখেন, “নোলান কীভাবে ৯১ দিনে শুটিং শেষ করেন? কারণ তাঁর সঙ্গে এমন একদল পেশাদার কাজ করেন, যাঁরা তাঁদের কাজের যথাযথ স্বীকৃতি এবং পারিশ্রমিক পান। তাঁর প্রথম সহকারী পরিচালক এক দশকেরও বেশি সময় ধরে একই ব্যক্তি।”
পবনের মতে, বড় বাজেটের একটি ছবির সাফল্য শুধু ক্যামেরার সামনে থাকা তারকাদের উপর নির্ভর করে না। ক্যামেরার পিছনে থাকা সংগঠিত দলটির দক্ষতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হলিউডে সহকারী পরিচালক, প্রোডাকশন ম্যানেজার, লোকেশন ম্যানেজার, স্টান্ট কো-অর্ডিনেটর, আর্ট বিভাগ এবং অন্যান্য টেকনিক্যাল টিমের দায়িত্ব স্পষ্টভাবে ভাগ করা থাকে। ফলে সিদ্ধান্ত দ্রুত নেওয়া যায় এবং প্রতিদিনের শুটিং পরিকল্পনাও নির্ভুলভাবে বাস্তবায়িত হয়।
তাঁর বক্তব্য, ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে এখনও অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি-নির্ভর সংস্কৃতি কাজ করে। পরিচালক বা প্রধান অভিনেতাকে ঘিরেই একাধিক সিদ্ধান্ত আবর্তিত হয়। এর ফলে চিত্রনাট্য বদল, দৃশ্য পুনর্লিখন, সময়সূচি পরিবর্তন কিংবা শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তের কারণে শুটিংয়ে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব তৈরি হয়।
পবন আরও মনে করেন, হলিউডের বড় ছবিগুলিতে প্রি-প্রোডাকশন পর্ব অত্যন্ত বিস্তৃত এবং সুসংগঠিত। শুটিং শুরু হওয়ার আগেই লোকেশন, শট ডিভিশন, প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি, শিল্প নির্দেশনা, স্টান্ট এবং ভিএফএক্স-সহ অধিকাংশ বিষয় চূড়ান্ত করে ফেলা হয়। ফলে শুটিং ফ্লোরে গিয়ে বারবার নতুন করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
অন্যদিকে ভারতীয় ছবির ক্ষেত্রে অনেক সময় শুটিং চলাকালীনই চিত্রনাট্যে পরিবর্তন, নতুন দৃশ্য সংযোজন বা তারকাদের সময়সূচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পনা বদলাতে হয়। এর ফলে বাড়ে উৎপাদন খরচ, দীর্ঘ হয় শুটিং এবং অনেক সময় তৈরি হয় রি-শুটের পরিস্থিতি।
দীর্ঘ শুটিং, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, বাজেট বৃদ্ধি এবং রি-শুট নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। প্রযোজক ও পরিচালকদের একাংশের অভিযোগ, অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা এবং অদক্ষ সমন্বয়ের কারণে ছবির খরচ ক্রমশ বেড়ে চলেছে। এই প্রেক্ষাপটেই পবন কুমারের মন্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনেকের মতে, নোলানের মতো নির্মাতাদের সাফল্যের পিছনে তাঁর ব্যক্তিগত প্রতিভার পাশাপাশি রয়েছে বহু বছর ধরে একসঙ্গে কাজ করা একটি বিশ্বস্ত প্রযুক্তিগত দল। দীর্ঘদিনের পারস্পরিক বোঝাপড়া, দ্রুত যোগাযোগ এবং দায়িত্বের স্পষ্ট বিভাজন জটিল শুটিংকেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে সাহায্য করে।
হোমারের মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত ‘দ্য ওডিসি’ নোলানের অন্যতম উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। বিশ্বের একাধিক দেশে শুটিং হওয়া এই বিশাল ছবির কাজ মাত্র ৯১ দিনে শেষ হওয়া তাই স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময় তৈরি করেছে। তবে পবন কুমারের মতে, এটি কোনও অলৌকিক ঘটনা নয়; বরং বহু বছরের পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং পেশাদার কর্মসংস্কৃতির ফল।
তাঁর বক্তব্যের সারকথা স্পষ্ট—ভারতেও দ্রুত এবং দক্ষতার সঙ্গে বড় বাজেটের ছবি তৈরি করা সম্ভব। তবে তার জন্য প্রয়োজন ব্যক্তি-নির্ভরতার বদলে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পেশাদার কর্মসংস্কৃতি। পরিচালক বা তারকার উপর সমস্ত দায় চাপিয়ে না দিয়ে প্রতিটি বিভাগের দক্ষ পেশাদারকে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ এবং যথাযথ মর্যাদা দিতে হবে।
তবেই ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্প শুধু বড় ছবি বানানোর ক্ষেত্রেই নয়, আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতা, সময় ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীলতার দিক থেকেও বিশ্বমঞ্চে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারবে।