ওয়াশিংটন: হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত আরও এক ধাপ বাড়ল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী কোনও জাহাজে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন বা অন্য কোনও অস্ত্র দিয়ে হামলা চালালে তার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের একটি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে। এমনকি রাজধানী তেহরানের কাছে বা শহরের ভিতরের পরিকাঠামোও এই হুমকির আওতার বাইরে নয় বলে স্পষ্ট করেছেন তিনি।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, হরমুজ প্রণালীতে ইরান কোনও জাহাজে হামলা চালালেই যুক্তরাষ্ট্র একটি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র বোমা মেরে ধ্বংস করবে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট, জাহাজে হামলার প্রতিটি ঘটনার জবাবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করা হবে।
ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারি এমন সময়ে এসেছে, যখন পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা তীব্র। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহণপথ এই প্রণালী দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হয়। ফলে সেখানে সামান্য সংঘর্ষও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের বক্তব্য কার্যত ‘হামলা হলে তাৎক্ষণিক পাল্টা আঘাত’-এর নীতি স্পষ্ট করছে। তাঁর হুমকি অনুযায়ী, কোনও জাহাজে হামলার পর দীর্ঘ তদন্ত বা কূটনৈতিক আলোচনার অপেক্ষা না করে সরাসরি ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় হামলা চালানো হতে পারে।
এই হুঁশিয়ারির পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, বেসামরিক ব্যবহারের পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করে এমন হামলা আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ। কোনও নির্দিষ্ট সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র সামরিক কাজে ব্যবহৃত হলে তার আইনি অবস্থান ভিন্ন হতে পারে; তবে কেবল প্রতিশোধের নীতি হিসেবে বেসামরিক পরিকাঠামোকে লক্ষ্য করার ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের এই হুঁশিয়ারির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে তেহরান অতীতে একাধিকবার জানিয়েছে, তাদের উপর হামলা হলে তারা পাল্টা জবাব দেবে। ফলে হরমুজে কোনও নতুন হামলা হলে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বার্তা শুধু ইরানকে সামরিক চাপ দেওয়ার কৌশল নয়; এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ও বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও। হরমুজ প্রণালীতে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটতে পারে, বাড়তে পারে পরিবহণ ব্যয় এবং অপরিশোধিত তেলের দামে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
কূটনৈতিক মহলের একাংশের মতে, ট্রাম্পের নতুন হুঁশিয়ারি ইরানকে আরও আগ্রাসী পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে দেওয়া হলেও, এর ফলে পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে কোনও বাণিজ্যিক বা সামরিক জাহাজ হামলার শিকার হলে এবং যুক্তরাষ্ট্র তার জবাবে ইরানের পরিকাঠামোয় আঘাত হানলে সংঘাত দ্রুত বৃহত্তর যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতিও ইতিমধ্যেই অত্যন্ত অস্থির। গাজা যুদ্ধ, ইয়েমেনের হুথি হামলা, লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল নিয়ে নিরাপত্তা সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত—সব মিলিয়ে গোটা অঞ্চল এক জটিল সামরিক ও কূটনৈতিক সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আগামী দিনগুলিই হবে গুরুত্বপূর্ণ। ইরান ট্রাম্পের হুঁশিয়ারির কী জবাব দেয় এবং হরমুজ প্রণালীতে নতুন কোনও সংঘর্ষ ঘটে কি না, তার উপরই নির্ভর করবে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—হরমুজে জাহাজে হামলাকে যুক্তরাষ্ট্র এখন সরাসরি পাল্টা সামরিক পদক্ষেপের কারণ হিসেবে দেখাতে প্রস্তুত।