Table of Contents
হাইলাইটস
- ১৫ বছরের কম বয়সিদের টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট-সহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার বিল অনুমোদন ফরাসি পার্লামেন্টে।
- ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা বন্ধ; জানুয়ারি ২০২৭ থেকে পুরনো অ্যাকাউন্টও বন্ধ করার পরিকল্পনা।
- প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁর দাবি, শিশু-কিশোরদের অনলাইন সুরক্ষায় এটি “ঐতিহাসিক পদক্ষেপ”।
- বয়স যাচাইয়ের দায়িত্ব থাকবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংস্থাগুলির ওপর।
- শিক্ষা, তথ্য ও অনলাইন বিশ্বকোষের মতো প্ল্যাটফর্ম নিষেধাজ্ঞার বাইরে থাকবে।
শিশু-কিশোরদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে এবার কড়া লাগাম। ১৫ বছরের কম বয়সিদের টিকটক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাটের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞার বিল অনুমোদন করেছে ফ্রান্সের পার্লামেন্ট। এই আইন কার্যকর হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম দেশ হিসেবে ফ্রান্স ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ কার্যত বন্ধ করে দেবে।
প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাক্রোঁ তাঁর দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ নীতির অংশ হিসেবে এই উদ্যোগকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর লক্ষ্য, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকেই আইনটি কার্যকর করা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় মাক্রোঁ বলেন, “শিশু ও কিশোরদের সুরক্ষার প্রশ্নে ইউরোপে ফ্রান্স পথ দেখাচ্ছে।” বিলটি সমর্থন করার জন্য সংসদ সদস্যদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি।
তবে আইন কার্যকর হওয়ার আগে ফ্রান্সের সাংবিধানিক পরিষদের অনুমোদন প্রয়োজন। পরিষদ সবুজ সংকেত দিলেই অনলাইন জগতে শিশুদের সুরক্ষায় এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে।
মঙ্গলবার সকালে সিনেটে পাস হওয়ার পর জাতীয় পরিষদেও ২৭৯-৮১ ভোটে বিলটি অনুমোদিত হয়।
কীভাবে কার্যকর হবে নিষেধাজ্ঞা?
আইনটি দুই ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
- ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬: ১৫ বছরের কম বয়সিরা নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট খুলতে পারবে না।
- জানুয়ারি ২০২৭: আগে থেকে থাকা অ্যাকাউন্টগুলিও বন্ধ করে দেওয়া হবে।
ফ্রান্সের ডিজিটাল বিষয়ক মন্ত্রী অ্যান লে এনাফ জানিয়েছেন, বয়স যাচাইয়ের প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ইতিমধ্যেই রয়েছে এবং আরও উন্নত ব্যবস্থা তৈরির কাজ চলছে। তাঁর মতে, বয়স যাচাইয়ের দায়িত্ব মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংস্থাগুলিরই—তাদের নিশ্চিত করতে হবে যে ১৫ বছরের কম বয়সিদের অ্যাকাউন্ট সক্রিয় না থাকে।
আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ফ্রান্সে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে বয়সের প্রমাণ দেওয়ার ব্যবস্থা চালু হতে পারে। তবে ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষারও আশ্বাস দিয়েছে সরকার।
কেন এমন সিদ্ধান্ত?
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগেই আইনটি কার্যকর করতে চাইছে ফরাসি সরকার। একই সময় স্কুলে মোবাইল ফোন ব্যবহারে আরও কড়াকড়ির বিধানও কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ গত বছর জানিয়েছিল, টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাটের মতো প্ল্যাটফর্ম কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। যদিও মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির একমাত্র কারণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দায়ী করা হয়নি।
আইন নিয়ে বিতর্কও কম নয়
বিলটি নিয়ে পার্লামেন্টে সমর্থন থাকলেও বাস্তবে আইনটি কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।
সিনেট প্রথমে প্রস্তাব দিয়েছিল, ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত কিছু প্ল্যাটফর্ম পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হবে এবং অন্য কিছু প্ল্যাটফর্মে অভিভাবকের অনুমতি নিয়ে প্রবেশের সুযোগ থাকবে। কিন্তু জাতীয় পরিষদ শেষ পর্যন্ত সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষেত্রেই ১৫ বছরের কম বয়সিদের জন্য একই নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়।
বামপন্থী কয়েকজন আইনপ্রণেতা বয়স যাচাইয়ের পদ্ধতি, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তবে অনলাইন বিশ্বকোষ, শিক্ষা-সংক্রান্ত ওয়েবসাইট ও শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না। শিশু বা তাদের অভিভাবকদের জন্য কোনও শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়নি।
ইউরোপে নতুন নজির
শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ নিয়ে ইতিমধ্যেই কাজ করছে ইউরোপীয় কমিশন। ফ্রান্স, গ্রিস ও স্পেন-সহ একাধিক দেশ এ বিষয়ে যৌথভাবে উদ্যোগ নিয়েছে।
ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডের লায়েন সম্প্রতি বলেছেন, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবেশ “ধাপে ধাপে এবং বয়স অনুযায়ী” হওয়া উচিত।
এই লক্ষ্যেই কমিশন একটি ডিজিটাল বয়স যাচাই ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করেছে। ফ্রান্স-সহ কয়েকটি সদস্য রাষ্ট্র ইতিমধ্যেই সেই প্রযুক্তি পরীক্ষা করছে।
বিশ্বের অন্য দেশগুলিতেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। গত ডিসেম্বরে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে ১৬ বছরের কম বয়সিদের টিকটক, ইউটিউব, স্ন্যাপচ্যাট-সহ বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে সরিয়ে দেওয়ার আইন কার্যকর করে।
মাক্রোঁ সরকারের পেনশন সংস্কার স্থগিত হওয়ার পর, ১৫ বছরের কম বয়সিদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাকেই তাঁর মেয়াদের শেষ বড় অভ্যন্তরীণ নীতিগত পদক্ষেপগুলির একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এখন নজর থাকবে একটাই দিকে—ফ্রান্সের এই ‘সোশ্যাল মিডিয়া নো-এন্ট্রি’ নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয় এবং ইউরোপের অন্য দেশগুলি সেই পথ অনুসরণ করে কি না।