হাইলাইটস
- ৩০ বছরের বেশি বয়সী সক্রিয় ও রিজার্ভ সেনাদের বার্ষিক টেস্টোস্টেরন পরীক্ষার নির্দেশ পেন্টাগনের।
- প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের দাবি, এতে সেনাদের কর্মক্ষমতা ও যুদ্ধ-প্রস্তুতি বাড়বে।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসর্গ ছাড়া গণহারে পরীক্ষা ও চিকিৎসার পক্ষে যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
- অপ্রয়োজনীয় টেস্টোস্টেরন থেরাপিতে বন্ধ্যাত্ব, হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা ও অন্যান্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
- চিকিৎসকদের পরামর্শ, উপসর্গ থাকলেই কেবল পরীক্ষা ও চিকিৎসা বিবেচনা করা উচিত।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নতুন নির্দেশ ঘিরে চিকিৎসক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী, ৩০ বছর বা তার বেশি বয়সী সক্রিয় ও রিজার্ভ সেনাসদস্যদের প্রতি বছর টেস্টোস্টেরনের মাত্রা পরীক্ষা করা হবে। হেগসেথের যুক্তি, এতে সেনাদের শারীরিক সক্ষমতা, মানসিক দৃঢ়তা, সহনশীলতা এবং যুদ্ধ-প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী হবে।
কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান কি সেই দাবিকে সমর্থন করে? অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের উত্তর—না, অন্তত এখনও নয়।
রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা ছয়জন পুরুষস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মধ্যে পাঁচজনই জানিয়েছেন, শুধুমাত্র বয়সের ভিত্তিতে সবার টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা করার পক্ষে শক্ত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। তাঁদের মতে, উপসর্গহীন ব্যক্তিদের গণহারে স্ক্রিনিং করলে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বাড়তে পারে, যার ঝুঁকি উপকারের চেয়ে বেশি।
এই সিদ্ধান্ত ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক স্বাস্থ্যনীতি পরিবর্তনের ধারাবাহিকতার অংশ। এর আগে পেন্টাগন সেনাবাহিনীতে বাধ্যতামূলক ফ্লু টিকার নিয়ম শিথিল করেছিল। পরে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় সেই অবস্থান আংশিক বদলাতে হয়। একই সময়ে স্বাস্থ্য দপ্তরও টিকা-পরামর্শদাতা কমিটিতে বড় রদবদল করেছে।
চিকিৎসকদের মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই ধীরে ধীরে কমে। সাধারণত ৩০–৪০ বছরের পর প্রতিবছর প্রায় ১ শতাংশ হারে এই হ্রাস ঘটে। তবে এটি রোগ নয়, বরং বয়সজনিত স্বাভাবিক পরিবর্তন। তাই শুধু ৩০ বছর পূর্ণ হলেই পরীক্ষা করার কোনও চিকিৎসাবিজ্ঞানসম্মত বাধ্যবাধকতা নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন এবং এন্ডোক্রাইন সোসাইটির নির্দেশিকাও একই কথা বলছে। তাদের মতে, যাঁদের রক্তে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম এবং সেই সঙ্গে যৌন আগ্রহ কমে যাওয়া, ইরেক্টাইল ডিসফাংশন, দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, পেশিশক্তি হ্রাস বা হাড় দুর্বল হওয়ার মতো উপসর্গ রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রেই টেস্টোস্টেরন থেরাপি বিবেচনা করা উচিত।
ডার্টমাউথ হিচকক মেডিক্যাল সেন্টারের অন্তঃস্রাব বিশেষজ্ঞ ডা. ইউগিস গ্রান্টম্যানিসের মতে, সেনাদের মধ্যে হরমোনের প্রবণতা নিয়ে গবেষণা অবশ্যই মূল্যবান হতে পারে। তবে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য ছাড়া এত বড় কর্মসূচি চালু করা ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ টেস্টোস্টেরন থেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে। শরীরে বাইরে থেকে টেস্টোস্টেরন দেওয়া হলে অণ্ডকোষের স্বাভাবিক হরমোন উৎপাদন কমে যেতে পারে, অণ্ডকোষের আকার ছোট হতে পারে এবং ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সেই ক্ষমতা পুরোপুরি ফিরে নাও আসতে পারে।
এ ছাড়া রক্ত ঘন হয়ে যাওয়া, হৃদ্যন্ত্রের ছন্দের সমস্যা, প্রোস্টেটজনিত জটিলতা, ব্রণ, চুল পড়া, পুরুষের স্তনবৃদ্ধি এবং মেজাজের ওঠানামার মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা দিতে পারে।
সম্প্রতি একটি বড় গবেষণার পর মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (FDA) টেস্টোস্টেরন ওষুধের গায়ে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি সংক্রান্ত পুরনো সতর্কবার্তা তুলে নিলেও, একই গবেষণায় অনিয়মিত হৃদ্স্পন্দন এবং হাড় ভাঙার ঝুঁকি কিছুটা বেশি পাওয়া গেছে। সেনাবাহিনীর মতো পেশায় এই তথ্যকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করছেন চিকিৎসকেরা।
হেগসেথ এই কর্মসূচির পক্ষে যুক্তি হিসেবে তথাকথিত “অপারেটর সিনড্রোম”-এর কথাও উল্লেখ করেছেন। বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে বিস্ফোরণের অভিঘাত, মস্তিষ্কে আঘাত, ঘুমের সমস্যা এবং কম টেস্টোস্টেরনের মতো একাধিক সমস্যা একসঙ্গে দেখা যায়।
তবে এই ধারণার অন্যতম প্রবর্তক ডা. ক্রিস্টোফার ফ্রুহ নিজেই সতর্ক করে বলেছেন, বিশেষ বাহিনীর অভিজ্ঞতা সাধারণ সেনাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। তাই পুরো বাহিনীর জন্য একই ধরনের স্ক্রিনিংয়ের প্রয়োজনীয়তা এখনও প্রমাণিত হয়নি।
তাঁর মতে, অনেক তরুণ সেনার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ঘুম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই টেস্টোস্টেরনের মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারে। ফলে সব সমস্যার সমাধান ওষুধ নয়।
অবশ্য কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বিস্তৃত স্ক্রিনিংয়েরও সুফল থাকতে পারে। এতে স্থূলতা বা জীবনযাত্রাজনিত সমস্যার মতো সংশোধনযোগ্য কারণগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে ওষুধের বদলে জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেকের অবস্থার উন্নতি সম্ভব।
এখনও পর্যন্ত পেন্টাগন জানায়নি, পরীক্ষায় অস্বাভাবিক ফল পাওয়া গেলে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হবে বা এই নীতি নারী সেনাদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে কি না। ফলে নতুন এই কর্মসূচি কার্যকর হওয়ার আগেই তা নিয়ে বিতর্ক আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।