হাইলাইটস:
- আন্না হাজারে ও সোনম ওয়াংচুকের অনশন—দুটি আন্দোলনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ আলাদা।
- আন্নার আন্দোলনে বিরোধী দল, সংবাদমাধ্যম ও সুশীল সমাজের প্রবল সমর্থন ছিল; ওয়াংচুক কার্যত একাই লড়ছেন।
- ১৫ বছরে ভারতের রাজনৈতিক পরিবেশ, গণআন্দোলনের চরিত্র এবং জনপরিসরের নৈতিক অবস্থান আমূল বদলে গেছে।
- প্রশ্ন উঠছে—গণতন্ত্র কি এখনও প্রতিবাদের ভাষা শুনতে সক্ষম, নাকি দেশ ক্রমশ নীরবতার দিকে এগোচ্ছে?
বাংলাস্ফিয়ার: মাত্র পনেরো বছরের ব্যবধানে ভারতের ইতিহাসে এমন দু’জন মানুষের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁরা নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে অনশনকে অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের আন্দোলনের পরিণতি ও সামাজিক-রাজনৈতিক অভিঘাত একেবারেই ভিন্ন। এই দুই কাহিনি শুধু দুই ব্যক্তির নয়; এগুলি ভারতের গণতন্ত্র, রাজনীতি এবং সমাজের বিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি।
প্রথমজন আন্না হাজারে। নব্বইয়ের দশক থেকেই মহারাষ্ট্রে আন্দোলনের পরিচিত মুখ হলেও, ২০১১ সালের ৫ এপ্রিল দিল্লিতে দুর্নীতিবিরোধী অনশন শুরু করার পর তিনি জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে আসেন। মাত্র ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে, ৯ এপ্রিল, তৎকালীন ইউপিএ সরকার যৌথ খসড়া কমিটি গঠনে সম্মত হলে তাঁর প্রথম অনশন শেষ হয়। একই বছরের ১৬ আগস্ট রামলীলা ময়দানে শুরু হয় তাঁর দ্বিতীয় অনশন, যা টানা ১২ দিন চলার পর ২৮ আগস্ট শেষ হয়। সংসদ তাঁর মূল দাবিগুলিকে নীতিগতভাবে সমর্থন জানায়।
আন্নার দাবি ছিল একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন লোকপাল প্রতিষ্ঠা করা, যাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ভারতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত বরাবরই প্রবল। সাধারণ মানুষের ধারণা, দুর্নীতি সমাজজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে। সেই কারণেই দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন সহজেই জনসমর্থন পায়, যদিও বাস্তবে দুর্নীতি পুরোপুরি নির্মূল হয় না।
সেই সময় মনমোহন সিং সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠছিল। ফলে আন্নার আন্দোলন দ্রুত জনমনে সাড়া ফেলে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলি আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্ত সরাসরি সম্প্রচার করছিল। প্রাক্তন আইপিএস অফিসার কিরণ বেদী, যোগগুরু বাবা রামদেবসহ বহু পরিচিত মুখ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান প্রকাশ করা যেন এক সামাজিক মর্যাদার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
তবে আন্দোলনের নেপথ্যে আরও বড় রাজনৈতিক শক্তির উপস্থিতির অভিযোগও ছিল। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সংগঠনিক নেটওয়ার্ক এই আন্দোলনকে শক্তি জুগিয়েছিল বলে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে আলোচনা হয়। অন্যদিকে সমাজতন্ত্রী ও বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের একাংশ—মেধা পাটকর, যোগেন্দ্র যাদব, প্রশান্ত ভূষণদের মতো ব্যক্তিত্বরাও আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লাভবান হয় ভারতীয় জনতা পার্টি। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফল সেই বাস্তবতাকেই প্রতিষ্ঠা করে।
প্রথমদিকে মনমোহন সিং সরকার আন্দোলনের প্রকৃতি ঠিকমতো বুঝতে পারেনি। পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে প্রণব মুখোপাধ্যায় ও এ কে অ্যান্টনির পাশাপাশি মহারাষ্ট্রের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বিলাসরাও দেশমুখ এবং প্রাক্তন আইএএস অফিসার উমেশচন্দ্র সারঙ্গীকে আলোচনায় যুক্ত করা হয়। তাঁরা শেষ পর্যন্ত অনশন প্রত্যাহারে ভূমিকা রাখলেও ততক্ষণে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গিয়েছিল। আন্দোলনের অভিঘাত থামানো আর সম্ভব হয়নি।
সোনম ওয়াংচুকের বর্তমান অনশন এই প্রেক্ষাপট থেকে একাধিক ক্ষেত্রে আলাদা।
প্রথমত, তাঁর দাবি অনেক বেশি নির্দিষ্ট ও প্রত্যক্ষ। আন্না যেখানে একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের দাবি তুলেছিলেন, সেখানে ওয়াংচুক কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছেন। তাঁর অভিযোগ, পরীক্ষা ব্যবস্থায় অনিয়ম ও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় সরকারের রাজনৈতিক দায় এড়ানো যায় না। ফলে এই দাবি সরাসরি সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়।
এই তুলনায় লেখকের মতে, আন্নার দাবি সরকার তুলনামূলক সহজে মেনে নিতে পেরেছিল, কারণ তা রাজনৈতিকভাবে ততটা অস্বস্তিকর ছিল না। কিন্তু ওয়াংচুকের দাবি ক্ষমতার কেন্দ্রকে স্পর্শ করছে। ফলে আপসের সম্ভাবনাও অনেক কম।
দ্বিতীয়ত, ওয়াংচুক কার্যত রাজনৈতিকভাবে একা। আন্না হাজারের আন্দোলনের সময় বিজেপি একটি সুসংগঠিত বিরোধী শক্তি হিসেবে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে সেই আন্দোলনকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়েছিল। আজকের পরিস্থিতিতে বিরোধী শিবির বিভক্ত এবং দুর্বল। ওয়াংচুকের আন্দোলনের সাফল্যে কোনও বিরোধী রাজনৈতিক দল নিজেদের সরাসরি লাভ দেখতে পাচ্ছে না। ফলে তাঁর পাশে দাঁড়ানোর রাজনৈতিক আগ্রহও সীমিত।
এই প্রেক্ষাপটে লেখক আরও এক ধাপ এগিয়ে দাবি করেছেন, আন্না হাজারে কার্যত বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিলেন, কিন্তু সোনম ওয়াংচুক সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজের লড়াই লড়ছেন। তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি নন; বরং একক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।
এই দুই আন্দোলনের তুলনা আরও একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে। গত পনেরো বছরে ভারতীয় সমাজ কি বদলে গেছে? আমরা কি এখন কেবল নির্বাচনের ফলাফল দিয়েই নৈতিকতার বিচার করি? কোনও আন্দোলনের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার আগে কি রাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসাবই একমাত্র বিবেচ্য হয়ে উঠেছে?
আন্না আন্দোলনের সময় চলচ্চিত্র জগত, ব্যবসায়ী সমাজ, নাগরিক সমাজ—সকলের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। বহু পরিচিত মানুষ প্রকাশ্যে সরকারের সমালোচনা করেছিলেন। সংবাদমাধ্যমও আন্দোলনকে দিনরাত প্রচার করেছিল। কিন্তু সোনম ওয়াংচুকের অনশন সেই ধরনের সর্বজনীন সমর্থন বা প্রচার পাচ্ছে না। শিল্প-বাণিজ্য মহলের বড় অংশও কার্যত নীরব।
এই নীরবতাকেই লেখক আজকের ভারতের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, মাত্র দেড় দশকে ভারতের প্রাণবন্ত, সরব ও বিতর্কমুখর গণতন্ত্র অনেকটাই স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—এই নীরবতাকে কি ভারতীয় সমাজ ভাঙতে পারবে? সোনম ওয়াংচুকের অনশনের পরিণতি শুধু একটি আন্দোলনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; তা হয়তো বলে দেবে ভারতীয় গণতন্ত্র এখনও নিজের কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়ার ক্ষমতা রাখে কি না। যদি না পারে, তবে এই নীরবতা ভবিষ্যতে আরও গভীর সংকটের পূর্বাভাস হয়ে উঠতে পারে।