Table of Contents
চার দশক পর বিশ্বজুড়ে আবার নাচছে ডিস্কোর তালে
হাইলাইটস
- ১৯৭৯ সালে ‘ডিস্কো ডেমোলিশন নাইট’-এ ডিস্কোর ‘মৃত্যু’ ঘোষণা হলেও ২০২৬-এ ঘরানাটি আবার মূলধারায়।
- ডুয়া লিপা, বিয়ন্সে, টাইলার দ্য ক্রিয়েটরদের গানে স্পষ্ট ডিস্কোর প্রভাব।
- ভারতীয় ডিস্কোও ফিরছে নতুনভাবে—সিনেমা, টিভি সিরিজ, ক্লাব ও রেকর্ড লেবেলের হাত ধরে।
- ইতিহাসবিদদের মতে, ডিস্কোবিরোধী আন্দোলনের পেছনে শুধু সঙ্গীত নয়, বর্ণ ও যৌন পরিচয়-রাজনীতিও কাজ করেছিল।
- হাউস, ইডিএম, আফ্রো-ফাঙ্ক, সিটি পপ—নানা ধারায় রূপ বদলে ডিস্কো কখনও হারিয়ে যায়নি।
এক সময় বলা হয়েছিল, ডিস্কো শেষ। আজ সেই ‘মৃত’ ঘরানাই আবার বিশ্বসংগীতের সবচেয়ে বড় প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখছে।
১৯৭৯ সালের ১২ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোর কমিস্কি পার্ক স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষের সামনে বিস্ফোরণ ঘটানো হয় ডিস্কো রেকর্ডভর্তি একটি বিশাল বাক্স। ‘ডিস্কো ডেমোলিশন নাইট’ নামে পরিচিত সেই অনুষ্ঠানে স্থানীয় রক ডিজে স্টিভ ডালের নেতৃত্বে দর্শকেরা নিজেদের আনা ডিস্কো রেকর্ডও আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন।
সেই রাতকেই অনেকেই ‘ডিস্কোর মৃত্যুদিবস’ বলে ঘোষণা করেছিলেন।
কিন্তু ইতিহাস বলছে, সেটি মৃত্যু নয়—ছিল এক নতুন অধ্যায়ের শুরু।
আবার মূলধারায় ডিস্কো
২০২৬ সালে এসে ডিস্কো শুধু ফিরে আসেনি, বরং আধুনিক পপ সংগীতের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
ডুয়া লিপার Dance the Night, বিয়ন্সের Cuff It ও Summer Renaissance, কিংবা টাইলার দ্য ক্রিয়েটরের একাধিক গানে সত্তরের দশকের ডিস্কো, ফাঙ্ক ও ইতালো-ডিস্কোর প্রভাব স্পষ্ট।
একসময়ের ‘পুরোনো’ ঘরানা আজ নতুন প্রজন্মের প্লেলিস্টেও সমান জনপ্রিয়।
ভারতেও ডিস্কোর নতুন জোয়ার
ডিস্কোর পুনর্জাগরণ শুধু পাশ্চাত্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
ভারতীয় ডিস্কো গানও নতুন করে আলোচনায় ফিরেছে। লস অ্যাঞ্জেলেসভিত্তিক রেকর্ড লেবেল Naya Beat দক্ষিণ এশিয়ার বহু হারিয়ে যাওয়া ডিস্কো গান পুনরায় প্রকাশ করছে।
এসব গান এখন আবার শোনা যাচ্ছে ক্লাব, বার, সিনেমা এবং টেলিভিশন সিরিজে।
চলতি বছরের ছবি ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ-এ ব্যবহার হয়েছে উষা উত্থুপের জনপ্রিয় গান রাম্বা হো। অন্যদিকে সিরিজ Bait-এ দক্ষিণ এশীয় ডিস্কোকে আধুনিক ব্রিটিশ ড্যান্স ও হিপ-হপের সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
নাচের মঞ্চ থেকে সামাজিক আন্দোলন
ডিস্কোর জন্ম সত্তরের দশকের নিউইয়র্কের ভূগর্ভস্থ ক্লাব ও গুদামঘরে।
এটি শুধু সঙ্গীত ছিল না; ছিল এক সামাজিক বিপ্লব।
কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো, সমকামী, অভিবাসী এবং শ্রমজীবী মানুষের জন্য ডিস্কো ক্লাব ছিল এমন এক নিরাপদ জায়গা, যেখানে পরিচয়ের চেয়ে বড় ছিল স্বাধীনভাবে নাচার অধিকার।
খ্যাতনামা ডিজে ডেভিড ম্যানকুসোর কিংবদন্তি The Loft পার্টির মূল দর্শনই ছিল—
“তুমি কে, সেটা নয়; তুমি নাচতে পারো কি না, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।”
তীব্র জনপ্রিয়তা, তারপর পাল্টা আঘাত
১৯৭৭ সালে Saturday Night Fever মুক্তির পর ডিস্কো বিশ্বজুড়ে বিস্ফোরক জনপ্রিয়তা পায়।
কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার মধ্যেই শুরু হয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া।
বাজারে একের পর এক ডিস্কো গান আসতে থাকায় সমালোচকেরা একে “একঘেয়ে” ও “বাণিজ্যিক” বলে আক্রমণ করেন।
তবে ইতিহাসবিদদের মতে, এর পেছনে শুধু সঙ্গীতগত আপত্তি ছিল না।
বর্ণ, যৌন পরিচয় এবং সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজের অস্বস্তিও ডিস্কোবিরোধী আন্দোলনকে উসকে দিয়েছিল।
ডিস্কো হারায়নি, বদলে গেছে
ডিস্কো কখনও সত্যিই হারিয়ে যায়নি।
শিকাগোতে ডিজে ফ্র্যাঙ্কি নাকলস ডিস্কোর ছন্দকে নতুন রূপ দিয়ে তৈরি করেন হাউস মিউজিক। তিনি একে মজা করে বলতেন—
“ডিস্কোর প্রতিশোধ।”
এরপর হাউস, গ্যারেজ, বুগি, ইলেকট্রনিক ড্যান্স মিউজিক—সবকিছুর ভেতরেই ডিস্কোর ছায়া থেকে যায়।
বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন রূপ
ডিস্কোর পতন মূলত আমেরিকার ঘটনা ছিল।
ইউরোপে এটি ইউরো-ডিস্কো হয়ে ওঠে।
জাপানে জন্ম দেয় সিটি পপ।
নাইজেরিয়া ও ঘানায় মিশে যায় আফ্রো-ফাঙ্ক ও হাইলাইফ-এর সঙ্গে।
ক্যারিবিয়ানে যুক্ত হয় সোকা ও ক্যালিপসো ধারায়।
ভারতও তৈরি করে নিজের স্বতন্ত্র ডিস্কো পরিচয়।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত সংগীত প্রযোজক বিদ্দু ইউরো-ডিস্কোর অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিতি পান। পরে তাঁর হাত ধরেই আসে আপ জ্যায়সা কোই ও নাজিয়া হাসানের ডিস্কো দিওয়ানে—যা আজও দক্ষিণ এশীয় পপ সংগীতের মাইলফলক।
কেন ফিরল ডিস্কো?
অনেকের মতে, আধুনিক ডিস্কো-জাগরণের সূচনা ২০১৩ সালে ড্যাফট পাঙ্কের Get Lucky দিয়ে।
এরপর ডুয়া লিপার Future Nostalgia, রইসিন মারফির Róisín Machine এবং বিয়ন্সের Renaissance-এর মতো অ্যালবাম ডিস্কোকে আবার বৈশ্বিক মূলধারায় ফিরিয়ে আনে।
একই সময়ে বিশ্বের নানা দেশের বিস্মৃত ডিস্কো গান খুঁজে বের করে নতুন করে প্রকাশ করতে শুরু করেন ডিজে, সংগ্রাহক ও স্বাধীন রেকর্ড লেবেলগুলো।
ডিস্কোর আসল শক্তি এখনও অটুট
আজ সিনেমা, টেলিভিশন ও ক্লাব সংস্কৃতিতে ডিস্কো শুধু নস্টালজিয়ার প্রতীক নয়।
এটি স্বাধীনতা, আনন্দ, প্রেম এবং একসঙ্গে উদ্যাপনের ভাষা।
ডিজে ও Naya Beat-এর প্রতিষ্ঠাতা রাঘব মানির কথায়, ডিস্কো মানুষকে এমন এক সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয়, যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষের আশা ছিল বেশি এবং একসঙ্গে আনন্দ করার সংস্কৃতি ছিল আরও প্রাণবন্ত।
আর শেষ পর্যন্ত একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই—
ভালো ডিস্কো গান বাজলে আজও মানুষ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না; নাচতে বাধ্য হয়।