হাইলাইটস:
- ২০১৬ সালের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়কে ফের সমর্থন জানাল ভারত।
- দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের বিস্তৃত সার্বভৌমত্বের দাবির কোনও আইনি ভিত্তি নেই বলে ওই রায়ে উল্লেখ ছিল।
- ভারত বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন মেনে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা ও বাধাহীন বাণিজ্য নিশ্চিত করা জরুরি।
- রায়কে ‘মূল্যহীন কাগজের টুকরো’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে চীন।
ভারত ফের স্পষ্ট করে জানিয়ে দিল, দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের যে ঐতিহাসিক রায় হয়েছিল, তার পক্ষেই নয়াদিল্লির অবস্থান অটুট। একই সঙ্গে ভারত জোর দিয়েছে আন্তর্জাতিক আইন মেনে সমুদ্রপথে অবাধ নৌ-চলাচল, বাধাহীন বাণিজ্য এবং শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির উপর। এমন এক সময়ে ভারতের এই অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, যখন দক্ষিণ চীন সাগরকে কেন্দ্র করে বেজিং এবং প্রতিবেশী কয়েকটি দেশের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে।
মঙ্গলবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিয়মিত সাংবাদিক বৈঠকে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ২০১৬ সালের রায়ের দশম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ফিলিপিন্স, আমেরিকা এবং আরও ১২টি দেশ যে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেছে, সে বিষয়ে ভারতের মত কী।
জয়সওয়াল বলেন, ভারত বরাবরই আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে সমুদ্র আইন সংক্রান্ত রাষ্ট্রসংঘের সনদ (UNCLOS)-এর ভিত্তিতে সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির পক্ষে। তিনি বলেন, সমুদ্রপথে নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা, আকাশপথে অবাধ যাতায়াত এবং বৈধ বাণিজ্যের স্বার্থ রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত বিশ্বাস করে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলির উচিত আন্তর্জাতিক আইন মেনে শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান করা।
২০১৬ সালে নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত স্থায়ী সালিশি আদালতের (Permanent Court of Arbitration) ট্রাইব্যুনাল ফিলিপিন্সের দায়ের করা মামলার রায়ে জানায়, দক্ষিণ চীন সাগরের প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকার উপর চীনের তথাকথিত ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ দাবি আন্তর্জাতিক আইনে গ্রহণযোগ্য নয়। ট্রাইব্যুনাল স্পষ্টভাবে জানায়, ওই দাবির কোনও আইনি ভিত্তি নেই।
কিন্তু বেজিং শুরু থেকেই এই রায় মানতে অস্বীকার করেছে। রায়ের দশ বছর পূর্তিতে রবিবার চীনের বিদেশ মন্ত্রক আবারও জানায়, এই রায় তাদের কাছে ‘একটি মূল্যহীন কাগজের টুকরো’ ছাড়া আর কিছুই নয়। চীনের দাবি, ট্রাইব্যুনালের এই সিদ্ধান্ত অবৈধ এবং তারা তা কখনও মেনে নেবে না।
দক্ষিণ চীন সাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ। প্রতিবছর কয়েক লক্ষ কোটি ডলারের পণ্য এই সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। পাশাপাশি এই অঞ্চলে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের বিপুল সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক—দুই দিক থেকেই এই সমুদ্রসীমার গুরুত্ব অপরিসীম।
ভারত সরাসরি এই বিরোধের পক্ষভুক্ত না হলেও, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবে ফিলিপিন্স, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর-সহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলির সঙ্গে প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক ক্রমশ জোরদার করেছে। ফিলিপিন্সকে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহের পর দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে শুধু একটি কূটনৈতিক অবস্থান নয়, বরং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থনের পুনর্ব্যক্তি হিসেবেও দেখা হচ্ছে। যদিও ভারত সরাসরি চীনের নাম উল্লেখ করে কোনও সমালোচনা করেনি, তবু ২০১৬ সালের ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রতি সমর্থন জানিয়ে নয়াদিল্লি কার্যত স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে একতরফাভাবে সমুদ্রসীমার দাবি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।