Home SportsFIFA 2026 ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা: যুদ্ধের স্মৃতি ছাপিয়ে আবারও বিশ্বকাপের মহারণ

ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা: যুদ্ধের স্মৃতি ছাপিয়ে আবারও বিশ্বকাপের মহারণ

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
17 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • সেমিফাইনালের আগে ফকল্যান্ডস/মালভিনাস যুদ্ধের প্রসঙ্গ উড়িয়ে দিলেন লিওনেল স্কালোনি।
  • রদ্রিগো দে পল বললেন, যুদ্ধের স্মৃতি আলাদা, মাঠে এটি শুধুই ফুটবল।
  • ১৯৮৬-র মারাদোনার ‘ঈশ্বরের হাত’ ও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ এখনও এই দ্বৈরথের প্রতীক।
  • ১৯৯৮-এ বেকহ্যামের লাল কার্ড, ২০০২-এ তাঁর প্রত্যাবর্তন—দুই দেশের লড়াইয়ের অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
  • উত্তেজনা থাকলেও দুই দেশের ফুটবল-সম্পর্কে আছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সংস্কৃতি ও বন্ধুত্বের ইতিহাসও।

বিশ্বকাপের ১০২ নম্বর ম্যাচ—সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ যে আর্জেন্টিনা, তা নিশ্চিত হওয়ার পর থেকেই আবার সামনে এসেছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) যুদ্ধের স্মৃতি। কিন্তু আর্জেন্টিনা শিবির স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা এই ম্যাচকে রাজনৈতিক বা ঐতিহাসিক প্রতিশোধের লড়াই হিসেবে দেখতে চায় না।

আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনি সংবাদ সম্মেলনে যুদ্ধের প্রসঙ্গ উঠতেই কার্যত থামিয়ে দেন প্রশ্ন। তিনি বলেন, “না, না, না। এটা শুধু একটা ফুটবল ম্যাচ। অন্য কিছু খোঁজার দরকার নেই। দুর্দান্ত একটি দলের বিরুদ্ধে, এমন এক কোচের বিরুদ্ধে খেলব যাকে আমি ভীষণ শ্রদ্ধা করি। এর বেশি কিছু নয়।”

মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পলও একই সুরে বলেন, “আমরা জানি এই ম্যাচ অনেক স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। দিয়েগো যা করেছিলেন, তা আজও মানুষ মনে রাখে। আমরা মালভিনাসের বীরদের নিয়ে গান গাই, কারণ তাঁদের স্মরণ করি। কিন্তু মালভিনাস নিয়ে আলোচনা অন্য জায়গায় হওয়া উচিত। মাঠে আমরা শুধু জিতে ফাইনালে উঠতে চাই।”

মারাদোনার দুই গোল, দুই বিপরীত মুখ

দে পলের কথায় যে “দিয়েগো যা করেছিলেন”, তা বলতে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালকেই বোঝানো হচ্ছে।

সেই ম্যাচে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দিয়েগো মারাদোনা দুটি সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী গোল করেন। প্রথমটি ছিল হাতে বল ঠেলে জালে পাঠানো—যা পরে ‘ঈশ্বরের হাত’ নামে কিংবদন্তি হয়ে যায়। দ্বিতীয়টি ছিল প্রায় অর্ধেক মাঠ পেরিয়ে একের পর এক ইংরেজ ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে করা অবিশ্বাস্য গোল, যা আজও ‘শতাব্দীর সেরা গোল’ হিসেবে বিবেচিত।মারাদোনা পরে মজা করে বলেছিলেন, “হয়তো এটা ঈশ্বরের হাত ছিল।” আরও পরে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, “একজন ইংরেজের পকেট মারার মতোই আনন্দ লেগেছিল।”এই মন্তব্য থেকেই অনেকে মনে করেন, গোলটি ছিল ফকল্যান্ডস যুদ্ধে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের প্রতীকী প্রতিশোধ। যদিও ২০১৪ সালে মারাদোনা নিজেই বলেন, যুদ্ধটি ছিল “দুই খুনি সরকারের তৈরি এক অর্থহীন সংঘর্ষ।”

যুদ্ধ আর ফুটবল এক নয়

১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের একটি অংশের সঙ্গে ইংল্যান্ডের উগ্র সমর্থকদের সংঘর্ষও হয়েছিল। সেই দলে একজন প্রাক্তন মালভিনাস যুদ্ধ-সেনাও ছিলেন।বহু বছর পরে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এক সাংবাদিক জানতে চান, ফুটবলের গ্যালারি কি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো?উত্তরে তিনি বলেন, “যুদ্ধকে একজন সৈনিকের চেয়ে বেশি কেউ ঘৃণা করে না। এখানে ভালোবাসা, সৌন্দর্য আর আনন্দের জন্য আসা হয়। এর সঙ্গে ঘৃণার কোনও সম্পর্ক নেই।”

বোর্হেস থেকে ফুটবল

আর্জেন্টিনার খ্যাতনামা সাহিত্যিক ও ক্রীড়া-লেখক হুয়ান সাস্তুরাইন একবার বলেছিলেন, “ইংরেজদের কাছে আমাদের অনেক ঋণ আছে। তারা আমাদের বোর্হেসকে দিয়েছে, আবার ফুটবলও দিয়েছে।”বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক হোর্হে লুইস বোর্হেস নিজেও ফকল্যান্ডস যুদ্ধকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, “এটা যেন একটি চিরুনি নিয়ে দুই টাকমাথা মানুষের ঝগড়া।”যদিও বোর্হেস ফুটবল ভালোবাসতেন না, তবু ২০২৬ বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার জয়সূচক আত্মঘাতী গোলটি করেছিলেন ডিনেই বোর্হেস নামে এক ফুটবলার—এ নিয়েও আর্জেন্টিনায় নানা রসিকতা ও প্রতীকী ব্যাখ্যা শোনা গেছে।

১৯৯৮ ও ২০০২: নতুন অধ্যায়

১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে মাইকেল ওয়েনের অবিশ্বাস্য একক গোল যেমন স্মরণীয়, তেমনই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল ডিয়েগো সিমিওনের প্ররোচনায় ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড।চার বছর পরে, ২০০২ সালে, সেই অপমানের জবাব দেন বেকহ্যামই। পেনাল্টি থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে জেতান এবং আর্জেন্টিনাকে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ের পথে ঠেলে দেন।সেই সময় ইংল্যান্ডের কোচ সভেন-গোরান এরিকসনের দলে একজন ক্রীড়া-মনোবিজ্ঞানী ছিলেন। তাঁর পরামর্শ ছিল, আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের চোখে চোখ না রাখতে। তাই সিমিওনে যখন পেনাল্টির আগে হাত বাড়িয়ে মানসিক চাপ তৈরির চেষ্টা করেন, বেকহ্যাম তাঁর দিকে না তাকিয়েই বল জালে পাঠিয়ে দেন।

আজকের আর্জেন্টিনা, নতুন নেতৃত্ব

দুই দেশের শেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল ২০০৫ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে। সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনার রক্ষণে ছিলেন ওয়াল্টার স্যামুয়েল ও রবার্তো আয়ালা।আজ সেই দু’জনই স্কালোনির কোচিং দলে। তাঁদের সঙ্গে আছেন পাবলো আইমারও। পারস্পরিক বিশ্বাস, বন্ধুত্ব এবং ফুটবল উপভোগ করার দর্শনের উপরই গড়ে উঠেছে বর্তমান আর্জেন্টিনা দল।

ইতিহাস থাকবে, সিদ্ধান্ত হবে মাঠে

কোয়ার্টার ফাইনালের পরে স্কালোনি ও ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল—দু’জনেই স্বীকার করেছেন, তাঁদের দল এখনও নিখুঁত নয়। কিন্তু মানসিক দৃঢ়তা অসাধারণ।ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার ইতিহাসে যুদ্ধের স্মৃতি, বিতর্ক, উত্তেজনা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেমন আছে, তেমনই রয়েছে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাহিত্য, সঙ্গীত, সংস্কৃতি এবং বন্ধুত্বের গল্পও।বুধবারের সেমিফাইনাল তাই শুধু পুরনো হিসাবের পুনরাবৃত্তি নয়। এটি এমন এক ফুটবল-ঐতিহ্যের নতুন অধ্যায়, যেখানে ইতিহাসের ভার কাঁধে নিয়েই দুই দল আবার বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হবে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles