Home SportsFIFA 2026 ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা: যুদ্ধ, ইতিহাস আর ফুটবলের সবচেয়ে আবেগী দ্বৈরথ

ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা: যুদ্ধ, ইতিহাস আর ফুটবলের সবচেয়ে আবেগী দ্বৈরথ

Authored By নির্ণয় চট্টোপাধ্যায়
45 views 4 minutes read
A+A-
Reset

ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার সম্পর্কের ইতিহাসে যেমন আছে যুদ্ধ, রাজনৈতিক তিক্ততা এবং উপনিবেশবাদের দীর্ঘ ছায়া, তেমনই আছে এমন এক ফুটবল-প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যাকে অনেকেই বিশ্বের সবচেয়ে আবেগঘন আন্তর্জাতিক লড়াই বলে মনে করেন। ১৮০৬ ও ১৮০৭ সালে ব্রিটিশদের আক্রমণ থেকে শুরু করে ১৯৮৬ সালের দিয়েগো মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’, ১৯৯৮ সালে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড—সবকিছু মিলিয়ে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু মাঠের নয়, ইতিহাসেরও।তবু এই উত্তেজনা ও বিরোধের মাঝেও দুই দেশের অনেক সাবেক ফুটবলার স্বীকার করেন, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা একে অপরের জন্য আদর্শ প্রতিপক্ষ। রাজনৈতিক বিভাজন যতই গভীর হোক, ফুটবলের ভাষায় তারা পরস্পরকে সর্বোচ্চ পরীক্ষায় ফেলে।

আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ফুটবলার এবং বর্তমান আতলেতিকো মাদ্রিদের কোচ দিয়েগো সিমেওনে সেই অনুভূতির অন্যতম প্রবল সমর্থক। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে বেকহ্যামের লাল কার্ডের ঘটনায় তিনিই ছিলেন কেন্দ্রীয় চরিত্র। বেকহ্যামের হালকা লাথির পর নাটকীয়ভাবে মাটিতে পড়ে গিয়ে তিনি রেফারির সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই ঘটনাই ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়।তবে ২০০২ বিশ্বকাপের আগে এক সাক্ষাৎকারে সিমেওনে বলেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খেলতে তিনি সবসময়ই ভালোবাসতেন।

“ইংরেজদের বিরুদ্ধে খেলতে আমার দারুণ লাগে। তাদের ফুটবল সবসময়ই খোলামেলা, আক্রমণাত্মক এবং আবেগপূর্ণ। জিতুন বা হারুন, মনে হয় সত্যিকারের একটা লড়াই খেললাম।”এরপর তিনি নিজের পায়ের প্যান্ট গুটিয়ে হাঁটুর নিচের একটি দাগ দেখিয়ে বলেন, “১৯৯১ সালে ওয়েম্বলিতে স্টুয়ার্ট পিয়ার্সের কাছ থেকে এই স্মৃতিচিহ্নটা পেয়েছিলাম। অসাধারণ ম্যাচ ছিল।”

‘আমার খেলা সেরা আন্তর্জাতিক ম্যাচ’

১৯৯৮ সালের সেই বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচটি আজও বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা ম্যাচ হিসেবে বিবেচিত হয়। সিমেওনের মতে, সেটিই ছিল তাঁর জীবনের সেরা আন্তর্জাতিক ম্যাচ।“ওই রাতে ইংল্যান্ড অবিশ্বাস্য খেলেছিল। অ্যালান শিয়ারার এবং পল ইন্স অসাধারণ ছিলেন। অনেক সময় মনে হচ্ছিল শিয়ারার একাই আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। মনে রাখবেন, তারা ১০ জন নিয়ে ৭০ মিনিট খেলেছিল।”মজার বিষয়, এই মন্তব্য করার সময় যেন তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন যে ইংল্যান্ডকে ১০ জনে নামিয়ে আনার পেছনে তিনিই ছিলেন প্রধান কারণ।

বেকহ্যামের প্রতি সহানুভূতি

বেকহ্যামের লাল কার্ডের পর ইংল্যান্ডে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তা ছিল নজিরবিহীন। একটি সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল—‘দশ বীর সিংহ, এক বোকা ছেলে’। লন্ডনের একটি পানশালার বাইরে বেকহ্যামের কুশপুতুল ফাঁসিতে ঝুলিয়ে প্রতিবাদও করা হয়।এই ঘটনা শুনে সিমেওনে বলেছিলেন,“ওটা একেবারেই বাড়াবাড়ি ছিল। শুধু আমার দোষ ছিল না। রেফারিও ছিলেন। ডেভিড ভুল করেছিল, কিন্তু সেটা ছিল মুহূর্তের আবেগ। এত বড় দোষ তার একার নয়।”

তিনি আরও বলেন, “ওর জন্য পরের কয়েক মাস খুব কঠিন ছিল। সংবাদমাধ্যম সব দোষ ওর ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিল। সেটা মোটেই ন্যায্য ছিল না।”সময়ের সঙ্গে সম্পর্কও বদলেছে। সম্প্রতি মিয়ামিতে আর্জেন্টিনার একটি ম্যাচের সময় সিমেওনে ও বেকহ্যামকে একসঙ্গে দেখা যায়। পরে বেকহ্যাম সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন, “এক পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।”

মারাদোনা বনাম ওয়েন

আর্জেন্টিনার কাছে ১৯৮৬ সালের মারাদোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং তার পরের অবিশ্বাস্য গোল ইতিহাসের অংশ। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে আছে ১৯৯৮ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সী মাইকেল ওয়েনের সেই বিস্ময়কর গোল।নিজের অর্ধ থেকে বল নিয়ে একের পর এক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোল করেছিলেন ওয়েন। আজও সেটিকে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে ধরা হয়।

২০১৮ সালে সেই ম্যাচের ২০ বছর পূর্তিতে ইংল্যান্ডের তৎকালীন কোচ গ্লেন হডল স্মৃতিচারণ করে বলেন,“মাইকেলের মধ্যে কোনও ভয়ই ছিল না। ও যখন প্রথম দু’জনকে কাটিয়ে এগোচ্ছিল, তখনই বুঝেছিলাম বড় কিছু হতে চলেছে। কিন্তু রবার্তো আয়ালা এত পিছনে দাঁড়িয়ে ছিল যে প্রথমে তাকে খেয়ালই করিনি। পরে বুঝলাম, আয়ালার কোনও ধারণাই ছিল না মাইকেলের গতি কতটা।”

ওয়েনও সেই মুহূর্তের কথা স্মরণ করে বলেন,“বেকহ্যাম প্রথম পাসটা দিয়েছিল। আমি শুধু ভেবেছিলাম, একটা ভালো প্রথম টাচ নিলে প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে আক্রমণ শুরু করতে পারব। কিন্তু প্রথম টাচ নেওয়ার পরই মাথায় এল—এখানে তো গোলের সুযোগ আছে।”“আয়ালাকে একা দেখে ঠিক করলাম, এমন জায়গায় বল ঠেলতে হবে যাতে শট নেওয়ার সেরা সুযোগ পাই। খুব কাছে গেলে ট্যাকল করবে, আবার বেশি বাইরে গেলে কোণ কঠিন হয়ে যাবে। তারপর শুধু নিখুঁত ফিনিশ।”

ওয়েন ছিলেন অজানা আতঙ্ক

সিমেওনে স্বীকার করেছিলেন, ইংল্যান্ডের তরুণ স্ট্রাইকার সম্পর্কে আর্জেন্টিনার প্রস্তুতি যথেষ্ট ছিল না।“ও আমাদের কাছে বড় ধাক্কা ছিল। আমরা ওকে আগে খেলতে দেখিনি। দর্শকদের জন্য সেটা ছিল দারুণ চমক, কিন্তু আমাদের জন্য নয়।”

বিতর্কিত লাল কার্ড

ডেনমার্কের রেফারি কিম মিল্টন নিলসেন বেকহ্যামকে সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়েছিলেন। নিয়মের দিক থেকে সিদ্ধান্তটির পক্ষে যুক্তি থাকলেও, সিমেওনের অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া সেই সিদ্ধান্তকে আজও বিতর্কিত করে রেখেছে।

গ্লেন হডল বলেন,“আমি ভেবেছিলাম হলুদ কার্ড দেখাবেন। কিন্তু হঠাৎ লাল কার্ড বেরিয়ে এল। আমি অবাক হয়ে ভাবছিলাম—এটা কী হচ্ছে?”তার মতে,“কোনও অবস্থাতেই এটা লাল কার্ড হওয়ার মতো ঘটনা ছিল না। বেকহ্যাম জানত সে ভুল করেছে। কিন্তু সেই স্তরের ফুটবলে প্রতিপক্ষ সেই ভুলকে অনেক বড় করে তুলবে—সেটাই হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে রেফারির আরও দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া উচিত ছিল।”ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার ফুটবল-দ্বৈরথের ইতিহাসে অসংখ্য বিতর্ক, ক্ষোভ এবং স্মরণীয় মুহূর্ত রয়েছে। কিন্তু সেই ইতিহাসের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক ধরনের পারস্পরিক শ্রদ্ধা। মাঠে তারা একে অপরের সবচেয়ে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী, আর সেই কারণেই হয়তো বিশ্বকাপের মঞ্চে এই লড়াই আজও অন্য সব ম্যাচের থেকে আলাদা মর্যাদা পায়।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles