হ্যারি বনাম ডেইলি মেল: ১১ বছরের গোপন অভিযান, শেষে আদালতে বড় ধাক্কা

যা জানা জরুরি
- হাইলাইটস: প্রিন্স হ্যারির গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মামলা খারিজ, রায়ে সামনে এল ১১ বছরের গোপন অভিযান।
- সাবেক ট্যাবলয়েড সাংবাদিক ও প্রাক্তন এমপির নেতৃত্বে ডেইলি মেলের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের পরিকল্পনা।
- বিচারকের মন্তব্য, তদন্ত ও মামলার প্রস্তুতির মধ্যে ছিল বিতর্কিত সমন্বয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হাইলাইটস:
- প্রিন্স হ্যারির গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মামলা খারিজ, রায়ে সামনে এল ১১ বছরের গোপন অভিযান।
- সাবেক ট্যাবলয়েড সাংবাদিক ও প্রাক্তন এমপির নেতৃত্বে ডেইলি মেলের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের পরিকল্পনা।
- বিচারকের মন্তব্য, তদন্ত ও মামলার প্রস্তুতির মধ্যে ছিল বিতর্কিত সমন্বয়।
প্রিন্স হ্যারির বহুল আলোচিত গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মামলা শেষ পর্যন্ত আদালতে টিকল না। কিন্তু মামলার রায়ে উঠে এসেছে আরও চমকপ্রদ এক গল্প—ডেইলি মেলের বিরুদ্ধে প্রমাণ জোগাড় করতে প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা একটি গোপন ও সুসংগঠিত অভিযান।
এই অভিযানের কেন্দ্রে ছিলেন দুই ভিন্ন জগতের মানুষ। একজন সাবেক ট্যাবলয়েড সাংবাদিক, যিনি নিজেকে প্রকাশ্যে ‘পেশাদার মিথ্যাবাদী’ বলে স্বীকার করেছিলেন। অন্যজন সংবাদমাধ্যমে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্চার সাবেক লিবারেল ডেমোক্র্যাট এমপি ইভান হ্যারিস। তাঁদের উদ্যোগেই শেষ পর্যন্ত প্রিন্স হ্যারি, অভিনেতা হিউ গ্রান্ট, সংগীতশিল্পী এলটন জন ও তাঁর স্বামী ডেভিড ফার্নিশ, অভিনেত্রী এলিজাবেথ হার্লি এবং ডোরিন লরেন্স-সহ একাধিক পরিচিত মুখ আইনি লড়াইয়ে নামেন।
শুরু ১১ বছর আগে
ঘটনার সূত্রপাত ১১ বছর আগে। সাবেক সাংবাদিক গ্রাহাম জনসন তখন ফোন হ্যাকিং কাণ্ডে দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছ থেকে দুই মাসের স্থগিত কারাদণ্ড পেয়েছেন। প্রাক্তন সহকর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু হওয়ার পর তিনি নিজেই পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
আদালতের বাইরে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন ইভান হ্যারিস। প্রশ্ন ছিল একটাই—এবার কি তিনি সংবাদমাধ্যমের অনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে আনতে সাহায্য করবেন?
জনসনের সম্মতিতেই শুরু হয় দীর্ঘ সহযোগিতা।
হিউ গ্রান্টের সঙ্গে বৈঠক, বদলে যায় পরিকল্পনা
জনসনের মাধ্যমেই অভিনেতা হিউ গ্রান্টের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। পরে এই বৈঠকের কথা চ্যানেল ফোরের Dispatches তথ্যচিত্রেও উঠে আসে।
সেই সময় ব্রিটেনে ফোন হ্যাকিং কেলেঙ্কারির তদন্ত মূলত News of the World এবং Mirror গোষ্ঠীকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ ছিল। ডেইলি মেলের বিরুদ্ধে কোনও ফৌজদারি তদন্ত শুরু হয়নি।
এমন সময় একটি অভিযোগ সামনে আসে—২০০২ সালের বহুল আলোচিত সোহাম শিশু হত্যা মামলার দোষী ইয়ান হান্টলিকে নাকি ডেইলি মেল অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
জনসন বিষয়টি তদন্তের প্রস্তাব দেন, আর সেই অনুসন্ধানের অর্থায়নে রাজি হন হিউ গ্রান্ট।
যদিও সেই তদন্তে উল্লেখযোগ্য কিছু মেলেনি, তবে এখান থেকেই ডেইলি মেলের বিরুদ্ধে আরও বড় পরিসরে প্রমাণ সংগ্রহের পরিকল্পনার সূচনা হয়।
‘অপারেশন ব্লুবার্ড’
এই গোপন অভিযানের কোডনেম ছিল ‘অপারেশন ব্লুবার্ড’।
জনসন ও হ্যারিস পুরনো সংবাদপত্র ঘাঁটেন, প্রাক্তন ব্যক্তিগত গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এমন ব্যক্তিদের খুঁজতে থাকেন, যাঁরা ডেইলি মেলের বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন।
তাঁদের লক্ষ্য ছিল দেখানো যে সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে শুধু নৈতিক সীমা নয়, আইনও লঙ্ঘন করা হয়েছে।
সেই সময় ডেইলি মেল ও Mail on Sunday-এর বিরুদ্ধে একাধিক বিতর্ক ছিল। প্রিন্স হ্যারি ও চেলসি ডেভির সম্পর্ক নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন, এলিজাবেথ হার্লির ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে লেখা কিংবা অভিনেত্রী স্যাডি ফ্রস্টের চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ—সবই প্রশ্নের মুখে পড়েছিল।
বিতর্কে অর্থের উৎস
প্রমাণ সংগ্রহের এই দীর্ঘ অভিযানের জন্য অর্থের ব্যবস্থাও করেছিলেন জনসন।
তাঁর দাবি, অর্থ এসেছিল প্রয়াত গোপনীয়তা অধিকারকর্মী ম্যাক্স মসলির পরিবারের কাছ থেকে এবং ব্যবসায়ী জেমস স্টান্টের কাছ থেকেও। সেই অর্থের একটি অংশ ব্যয় করা হয় প্রাক্তন ব্যক্তিগত গোয়েন্দাদের পারিশ্রমিক দিতে, যাঁদের মধ্যে কয়েকজনের ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার অতীতও ছিল।
পরবর্তীকালে তাঁদের কেউ কেউ আদালতে ডেইলি মেলের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেন।
জনসনের দাবি ছিল, এই অর্থ সাংবাদিকতা, বই লেখা এবং তথ্যচিত্র তৈরির কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়েছে।
বিচারকের কড়া পর্যবেক্ষণ
তবে আদালত সেই ব্যাখ্যা মানেনি।
বিচারপতি মি. জাস্টিস নিকলিন তাঁর পর্যবেক্ষণে বলেন, নথিপত্রে স্পষ্ট যে সাংবাদিকতা এবং মামলা পরিচালনার প্রস্তুতি—দুই উদ্দেশ্যকে একসঙ্গে মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি সমন্বিত কার্যক্রম চালানো হয়েছে।
ইভান হ্যারিসও সমালোচনার মুখে পড়েন। অভিযোগ, তিনি সাবেক এমপি সাইমন হিউজকে ডেইলি মেলের বিরুদ্ধে মামলা করতে উৎসাহিত করেছিলেন এবং সময়সীমার আইনি বাধা কাটাতে একটি সংবাদ প্রকাশ করানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন।
বিচারকের ভাষায়, সেটি ছিল “অসৎ ও অনুচিত প্রস্তাব।”
শেষ পর্যন্ত কী হল?
শেষ পর্যন্ত প্রিন্স হ্যারি ও অন্যদের আনা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মামলাটি আদালত খারিজ করে দেয়।
তবে এই রায় শুধু মামলার আইনি দুর্বলতাই সামনে আনেনি। একই সঙ্গে প্রকাশ্যে এসেছে ডেইলি মেলের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহের জন্য বছরের পর বছর ধরে চলা এক গোপন, সুসংগঠিত এবং বিতর্কিত অভিযানের অন্তরালের কাহিনিও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



