Table of Contents
হাইলাইটস:
- বাঁশে বিরল ফুল ফোটার পর মিজোরামে বেড়েছে ইঁদুরের উপদ্রব, ক্ষতিগ্রস্ত ৫,৩০০-রও বেশি কৃষক।
- ধান, ভুট্টা, আদা-সহ একাধিক ফসল প্রায় শেষ; খাদ্যসংকটের আশঙ্কা বাড়ছে।
- বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এটি শুধু কৃষি নয়—পুরো বাস্তুতন্ত্রের জন্যও বড় সংকেত।
মিজোরামের পাহাড়ি গ্রামগুলিতে একটি দৃশ্য দেখলেই কৃষকদের বুক কেঁপে ওঠে। স্থানীয় ভাষায় ‘থাংনাং’ নামে পরিচিত দুর্গন্ধযুক্ত স্টিঙ্ক বাগের ঝাঁক দেখা মানেই সামনে বড় বিপদের ইঙ্গিত। কারণ, এই পোকাদের উপস্থিতির পরই সাধারণত পাহাড় থেকে নেমে আসে ইঁদুরের বিশাল বাহিনী। আর সেই ইঁদুরের হানাই বহুবার ডেকে এনেছে দুর্ভিক্ষ।
এবারও যেন সেই পুরনো ইতিহাসই ফিরে আসছে।
মামিত জেলার ৬২ বছরের কৃষক মাউনসাঙ্গা প্রতিদিন ভোরে নিজের ধানের জমিতে যান। কিন্তু সবুজ ফসলের বদলে এখন চোখে পড়ে ভাঙা ধানের শিষ আর নষ্ট ক্ষেত। চার দশকের কৃষিজীবনের অভিজ্ঞতায় তিনি বলেন, “এমন ক্ষতি আগে কখনও দেখিনি। রাতভর পাহারা দিয়েও ফসল বাঁচানো যাচ্ছে না।”
শুরুটা বাঁশে ফুল ফোটা থেকেই
এই সংকটের বীজ রোপিত হয়েছিল ২০২৫ সালের শেষদিকে। তখন Melocanna baccifera এবং Bambusa tulda প্রজাতির বাঁশে একযোগে ফুল ফোটা শুরু হয়।
বাঁশের এই বিরল প্রাকৃতিক ঘটনাই মিজোরামে বহুদিন ধরেই আতঙ্কের কারণ। Melocanna baccifera-র ফুল ফোটাকে বলা হয় ‘মাউতাম’, আর Bambusa tulda-র ক্ষেত্রে নাম ‘থিংতাম’।
সাধারণত একটি মাউতামের প্রায় ১৮ বছর পরে থিংতাম হয় এবং থিংতামের প্রায় ৩০ বছর পরে আবার মাউতাম ফিরে আসে। অর্থাৎ, এই প্রাকৃতিক চক্র প্রায় ৪৮ থেকে ৫০ বছর অন্তর পুনরাবৃত্ত হয়।
কেন বাঁশে ফুল মানেই ইঁদুরের উপদ্রব?
ফরেস্ট রিসার্চ সেন্টার ফর ব্যাম্বু অ্যান্ড র্যাটানের গবেষক ড. লালথানজামির ব্যাখ্যা, বাঁশে ফুল ফোটার পর বিপুল পরিমাণ বীজ উৎপন্ন হয়, যা ইঁদুরের জন্য যেন অফুরন্ত খাদ্যভাণ্ডার। পর্যাপ্ত খাবার পেয়ে অল্প সময়েই তাদের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু বীজ ফুরিয়ে গেলেই সেই বিশাল ইঁদুর বাহিনী নেমে আসে কৃষিজমিতে।
ফলাফল—রাতারাতি ফসল শেষ।
শুধু ফসল নয়, বিপদ পুরো পরিবেশের
বিজ্ঞানীদের মতে, সংকট এখানেই থেমে নেই।
ফুল ফোটার পর বিশাল এলাকা জুড়ে বাঁশ স্বাভাবিকভাবেই শুকিয়ে মারা যায়। এতে পাহাড়ি ঢালে মাটি ধরে রাখার প্রাকৃতিক শক্তি কমে যায় এবং বর্ষাকালে ভূমিধস ও মাটিক্ষয়ের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
আইজলের পাচহুঙ্গা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অধ্যাপক ড. আর. জোরামথাঙ্গার কথায়, “এটি শুধু কৃষির সমস্যা নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের সূচনা।”
মাঠে রাতভর পাহারা, তবুও রক্ষা নেই
লুংলেই জেলার হ্রিফাও, মামতে-সহ একাধিক গ্রামের কৃষকেরা জানিয়েছেন, গত বছরের শেষ থেকেই ইঁদুরের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে।
কৃষক সি. লালহ্রিলিয়ানা বলেন, “রাতে প্রথমে ঘাসের মধ্যে শব্দ হয়, তারপর দেখা যায় শত শত ইঁদুর মাঠে ঢুকছে। সকালে উঠে দেখি ফসলের বড় অংশ শেষ।”
মাউনসাঙ্গার কথায়, আগে তাঁর জমি থেকে ৩০–৪০ বস্তা ধান উঠত। এ বছর হয়েছে মাত্র তিন বস্তা—যা নিজের পরিবারের জন্যও যথেষ্ট নয়।
৫,৩০০-র বেশি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত
রাজ্যের কৃষি দপ্তরের হিসাব বলছে, ইতিমধ্যেই ৫,৩০০-রও বেশি কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে ধানে। পাশাপাশি ভুট্টা, আদা, কুমড়ো ও শিমের ক্ষেতও ব্যাপকভাবে নষ্ট হয়েছে। ফলে বহু পরিবার এখন নিজেদের উৎপাদিত খাদ্যের বদলে সরকারি রেশন ও ভর্তুকির চালের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছে।
সরকারের লড়াই, গ্রামবাসীর দ্বিধা
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার আক্রান্ত এলাকায় ইঁদুর দমন অভিযান শুরু করেছে। জিঙ্ক ফসফাইড ও ব্রোমাডিওলোন-সহ বিভিন্ন ইঁদুরনাশক বিতরণ করা হচ্ছে এবং কৃষকদের নিরাপদ ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
তবে অনেক গ্রামবাসীর আশঙ্কা, রাসায়নিক বিষ পানীয় জলের উৎস দূষিত করতে পারে।
ফলে বহু এলাকায় মানুষ আবার ফিরে গিয়েছেন ঐতিহ্যবাহী বাঁশের ফাঁদ—‘ভাইথাং’ ও ‘চেপথাং’-এর কাছে। রাতভর টর্চ হাতে কৃষকেরা সেই ফাঁদ পরীক্ষা করছেন। তবুও ইঁদুরের সংখ্যা এত বেশি যে তাতে খুব একটা ফল মিলছে না।
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা
মিজোরামের ইতিহাসে ১৯৫৮-৬০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ বাঁশে ফুল ফোটা এবং তার পরবর্তী ইঁদুর বিস্ফোরণের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে। সেই দুর্ভিক্ষ শুধু খাদ্যসংকটই নয়, রাজ্যের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি জরুরি। বাঁশে ফুল ফোটার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, উন্নত শস্য সংরক্ষণ, বিকল্প ফসলচক্র এবং আগাম খাদ্য মজুত—এসবের ওপর এখনই জোর দেওয়া উচিত।
কিন্তু কৃষকদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখনও একটাই—আগামী কয়েক মাস কীভাবে টিকে থাকবেন?
মাউনসাঙ্গার কণ্ঠে ধরা পড়ে সেই উদ্বেগই—“আমরা জানি, একদিন এই ঘটনা আবার ঘটবে। কিন্তু প্রতিবারই আমাদের আবার শূন্য থেকে শুরু করতে হয়।”