হাইলাইটস:
- হরমুজ প্রণালী ‘বন্ধ’ ঘোষণা করল ইরান, জাহাজে হামলার দাবি
- ইরানের ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক হামলার কথা জানাল মার্কিন সেন্টকম
- কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি আইআরজিসির, প্রমাণ মেলেনি
- নতুন করে যুদ্ধের আবহে অনিশ্চিত কূটনৈতিক উদ্যোগ
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ফের জ্বলে উঠেছে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত। রবিবার ভোরে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও বিস্ফোরক হয়ে উঠেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা একটি কনটেনার জাহাজে আঘাত হেনেছে এবং ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত’ হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে। এর কিছুক্ষণের মধ্যেই মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, ইরানের ১৪০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।
এই সংঘর্ষ এমন এক সময়ে শুরু হল, যখন ওমানের মধ্যস্থতায় হরমুজ প্রণালীকে নিরাপদ রাখার বিষয়ে নতুন করে আলোচনার চেষ্টা চলছিল। ফলে সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমাধান আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
আইআরজিসির দাবি, যে কনটেনার জাহাজটিতে হামলা চালানো হয়েছে, সেটি পরিচয় ও অবস্থান জানানোর ব্যবস্থা বন্ধ রেখে অনুমোদিত রুটের বাইরে চলছিল এবং সামুদ্রিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করছিল। তবে জাহাজটির নাম বা মালিকানা সম্পর্কে কোনও তথ্য প্রকাশ করেনি তেহরান।
এর জবাবে মার্কিন সেন্টকম জানায়, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, নৌসামরিক অবকাঠামো, গোলাবারুদের ভাণ্ডার, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং নজরদারি কেন্দ্র-সহ অন্তত ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ওয়াশিংটনের দাবি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকদের উপর হামলার ক্ষমতা দুর্বল করাই এই অভিযানের মূল উদ্দেশ্য।
মার্কিন বাহিনীর আরও দাবি, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি কনটেনার জাহাজে ইরানের হামলায় ইঞ্জিন কক্ষ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এক নাবিক এখনও নিখোঁজ।
এদিকে ব্রিটেনের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমান উপকূল থেকে প্রায় নয় নটিক্যাল মাইল দূরে একটি কনটেনার জাহাজের পেছনের অংশে বিস্ফোরণের পর আগুন ধরে যায়। যদিও হামলার জন্য দায়ী পক্ষের নাম তারা উল্লেখ করেনি।
কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা উপসাগরীয় অঞ্চলে। সংযুক্ত আরব আমিরশাহি ও কুয়েত জানায়, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে সক্রিয় রয়েছে। বাহরিনে বিমান হামলার সাইরেন বাজানো হয় এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেয় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।
এর মধ্যেই আইআরজিসি আরও দাবি করেছে, হরমুজে আরেকটি জাহাজ অচল করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কাতারের আল-উদেইদে অবস্থিত মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে যুদ্ধবিমান রক্ষণাবেক্ষণ কেন্দ্র ও কমান্ড ব্যবস্থায় আঘাত হানা হয়েছে। তবে এই দাবির পক্ষে এখনও স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনও প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি।
আমেরিকার ‘হস্তক্ষেপ’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকবে বলেও ঘোষণা করেছে আইআরজিসি। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে যায়। ফলে পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড়সড় প্রভাব পড়তে পারে।
তবে যুদ্ধের আবহের মধ্যেও কূটনৈতিক তৎপরতা পুরোপুরি থেমে যায়নি। ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি ও ওমানের বিদেশমন্ত্রী সাইয়্যিদ বদর আলবুসাইদির মধ্যে বৈঠক হয়েছে। তেহরানের দাবি, হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিরাপদ জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার উপায় নিয়েই আলোচনা হয়েছে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে ইরানি সূত্রের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ইরান, আমেরিকা, কাতার ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি বহুপাক্ষিক বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে সেই প্রচেষ্টা কতটা এগিয়েছে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
সামরিক সংঘর্ষের পাশাপাশি দুই দেশের রাজনৈতিক বাকযুদ্ধও তীব্র আকার নিয়েছে। ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেই তাঁর প্রথম লিখিত বার্তায় ঘোষণা করেছেন, প্রাক্তন সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনেইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া হবেই। তাঁর দাবি, এটি কোনও ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নয়, বরং গোটা জাতির দাবি।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, তাঁকে হত্যার কোনও চেষ্টা হলে ইরানকে ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ করে দেওয়া হবে। তাঁর দাবি, বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও বড় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলির দাবি, ওয়াশিংটন তেহরানকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে— হরমুজ দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক নৌপথ খোলা রয়েছে, তা স্বীকার করতে হবে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে শুরু হওয়া ইরান-আমেরিকা-ইজরায়েল সংঘাতের পর যে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল, তা এখন কার্যত ভেঙে পড়েছে। হরমুজকে কেন্দ্র করে নতুন সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় পশ্চিম এশিয়ায় আরও বড় যুদ্ধের আশঙ্কা আবারও জোরালো হয়ে উঠেছে।