হাইলাইটস
- টানা দুই বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নতুন ইতিহাস গড়ল মরক্কো।
- কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবির নেতৃত্বে দলের প্রতি আস্থা বেড়েছে সমর্থকদের।
- ফ্রান্সের বিরুদ্ধে কঠিন লড়াইয়ের অপেক্ষায় অ্যাটলাস লায়ন্স।
- বিশেষজ্ঞদের মতে, সুশাসন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই আফ্রিকার সাফল্যের চাবিকাঠি।
- ঘানা ও সেনেগালের ব্যর্থতা দেখিয়ে দিল, প্রস্তুতির অভাব এখনও বড় সমস্যা।
আফ্রিকার ফুটবলের ইতিহাসে মরক্কো আবারও নতুন অধ্যায় লিখেছে। ১৯৭০ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে সরাসরি যোগ্যতা অর্জনকারী প্রথম আফ্রিকান দেশ ছিল তারা। ১৯৮৬ সালে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে শেষ ষোলোয় পৌঁছায়। ২০২২ সালে সেমিফাইনালে উঠে বিশ্বকে চমকে দেয়। এবারও সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নতুন নজির গড়েছে অ্যাটলাস লায়ন্স।
কেপ ভার্দে প্রশংসনীয় লড়াই করলেও আফ্রিকার আশা এখন একমাত্র মরক্কোকে ঘিরেই। বৃহস্পতিবার বোস্টন স্টেডিয়ামে তাদের সামনে শক্তিশালী ফ্রান্স। ফল যাই হোক, আফ্রিকার ফুটবলে মরক্কোর এই যাত্রা ইতিমধ্যেই ঐতিহাসিক।
কাসাব্লাঙ্কাভিত্তিক ফুটবল সাংবাদিক আমিন এল আমরি বলেন, মরক্কোর মানুষের মনে এখন একটাই অনুভূতি—গর্ব ও তৃপ্তি। তাঁর কথায়, বিশ্বকাপ শুরুর আগে দলের লক্ষ্যই ছিল কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠা। কারণ, কোচ পরিবর্তনের পর অনেক অনিশ্চয়তা ছিল। ওয়ালিদ রেগরাগুইয়ের বিদায় এবং মোহাম্মদ ওয়াহবির আগমন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।
তবে নেদারল্যান্ডসকে হারানোর পর সেই সন্দেহ অনেকটাই দূর হয়ে যায়। কানাডার বিরুদ্ধে কঠিন প্রথমার্ধ কাটিয়ে যেভাবে দল জিতেছে, তাতে সমর্থকদের আত্মবিশ্বাস আরও বেড়েছে। এল আমরি বলেন, কাসাব্লাঙ্কা, মারাকেশ থেকে ছোট ছোট শহর—সর্বত্র উৎসবের আবহ। শেষ ম্যাচের রাতে প্রায় কেউই ঘুমোয়নি।
এবার অবশ্য চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন। ফ্রান্সের বিধ্বংসী আক্রমণভাগে রয়েছেন কিলিয়ান এমবাপে, মাইকেল অলিসে ও উসমান দেম্বেলে। তাদের থামাতে হলে মরক্কোকে নিজেদের সেরা খেলাই খেলতে হবে।
ক্যামেরুনের প্রাক্তন কিংবদন্তি গোলরক্ষক জোসেফ-আঁতোয়ান বেল মনে করেন, মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মানসিক দৃঢ়তা। তাঁর মতে, এই দল কখনও আতঙ্কিত হয় না। পিছিয়ে পড়লেও মাথা ঠান্ডা রাখে এবং নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী খেলতে থাকে। কারণ, মাঠের বাইরের আর্থিক বা প্রশাসনিক সমস্যাগুলো তারা আগেই মিটিয়ে ফেলেছে।
বেলের কথায়, “মরক্কোর বিরুদ্ধে খেলতে নেমে কোনও দল নিশ্চিতভাবে জয়ের দাবি করতে পারে না। এটাই একটি সুসংগঠিত দলের লক্ষণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আফ্রিকার বেশিরভাগ দেশ এখনও এই পর্যায়ে পৌঁছতে পারেনি।”
তিনি উদাহরণ টানেন ঘানার। বিশ্বকাপের মাত্র দু’মাস আগে কার্লোস কুইরোজকে কোচ করা হয়। প্রস্তুতির জন্য হাতে ছিল মাত্র দুটি প্রীতি ম্যাচ। অধিনায়ক জর্ডান আইয়ুও স্বীকার করেছেন, এত অল্প সময়ে নতুন কৌশল রপ্ত করা সম্ভব নয়।
আইয়ুর কথায়, “এক বা দুই মাসে কোনও দলকে বদলে ফেলা যায় না। রক্ষণভাগে আমরা উন্নতি করেছি, কিন্তু আক্রমণে ভারসাম্য খুঁজে পাইনি।”
বিদায়বার্তায় কুইরোজও ইঙ্গিত দেন, শুধু মাঠে ভালো খেললেই হবে না। ফুটবল সংস্থাকেও আরও পেশাদার হতে হবে। জাতীয় দলের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, পরিকল্পনা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাই দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের ভিত্তি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
একই শিক্ষা নেওয়া উচিত সেনেগালেরও। শেষ বত্রিশে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে ৮৬ মিনিট পর্যন্ত ২-০ এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিতে হয় তাদের। অভিজ্ঞতার অভাবে নয়, ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই এই পরাজয় এসেছে বলে মনে করেন নাইজেরিয়ার প্রাক্তন অধিনায়ক সানডে অলিসেহ।
তিনি বলেন, ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে ইতালির বিরুদ্ধে নাইজেরিয়াও শেষ মুহূর্তে হার মেনেছিল। কিন্তু তখন তারা ছিল অনভিজ্ঞ। এখন আফ্রিকার ফুটবলাররা ইউরোপের বড় বড় ক্লাবে খেলেন। তাই এমন ভুল আরও হতাশাজনক।
জোসেফ-আঁতোয়ান বেলের মতে, আফ্রিকার ফুটবলের প্রকৃত অগ্রগতি ঘটবে তখনই, যখন বিভিন্ন দেশের ফুটবল সংস্থাগুলি সুশাসন, পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের ওপর জোর দেবে। তাঁর বিশ্বাস, ভবিষ্যতে আফ্রিকা শুধু বিশ্বকাপ জিততেই পারে না, একই সঙ্গে তিন বা চারটি দলকে নিয়মিত কোয়ার্টার ফাইনালে তুলতেও সক্ষম হবে।
এই বিশ্বকাপে মিশরের লড়াকু পারফরম্যান্স প্রশংসিত হলেও শেষ পর্যন্ত আফ্রিকার সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষার ভার এখন একাই বহন করছে মরক্কো।