হাইলাইটস
- দীর্ঘ আইনি লড়াই ও অনিশ্চয়তার পর বাংলাদেশে ফিরলেন সুইটি বিবি ও তাঁর দুই সন্তান।
- সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে আগেই দেশে ফিরেছিলেন দানিশ শেখের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী।
- এবার দেশে ফিরলেন দানিশ শেখও; প্রথমবার নিজের নবজাতক কন্যাকে দেখবেন বলে জানালেন তিনি।
- ভারতে দীর্ঘদিন আটক থাকার পর পরিবারগুলির ঘরে ফেরায় স্বস্তি।
- মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপে সমাধান পেল বহুদিনের জটিলতা।
বাংলাস্ফিয়ার: দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, জেলবন্দি জীবন, আদালতের দোরগোড়ায় একের পর এক আবেদন—সবকিছুর শেষে অবশেষে বাড়ি ফিরলেন সুইটি বিবি। দিল্লি থেকে বাংলাদেশে ফেরার পর তাঁর মুখে একটাই কথা—“অবশেষে বাড়ি ফিরলাম।” তাঁর সঙ্গে ফিরেছে দুই সন্তানও। একই বিমানে দেশে ফিরেছেন দানিশ শেখ, যাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কয়েক সপ্তাহ আগেই বাংলাদেশে ফিরে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে এখন তাঁর সবচেয়ে বড় অপেক্ষা, জীবনে প্রথমবার কোলে তুলে নেওয়া নবজাতক কন্যাকে দেখা।
এই প্রত্যাবর্তন শুধু কয়েকজন মানুষের ঘরে ফেরা নয়; এটি দীর্ঘ প্রশাসনিক জট, সীমান্ত-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এবং মানবিক সংকটের অবসানের প্রতীক হিসেবেও উঠে এসেছে। বহু মাস ধরে পরিবারগুলি ভারতের বিভিন্ন আটক কেন্দ্রে ও সংশোধনাগারে কাটিয়েছে। নাগরিকত্ব, পরিচয়পত্র এবং প্রত্যাবাসনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না হওয়ায় তাঁদের মুক্তি বারবার পিছিয়ে গিয়েছিল।
সুইটি বিবির জীবন যেন গত কয়েক বছরে একের পর এক দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে গিয়েছে। দিল্লিতে আটক হওয়ার পর তাঁকে সন্তানদের নিয়ে জেলেই থাকতে হয়েছে। ছোট ছোট দুই সন্তানের শৈশব কেটেছে বন্দি পরিবেশে। শেষ পর্যন্ত ভারত ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় এবং আদালতের নজরদারির ফলে প্রত্যাবাসনের পথ খুলে যায়। দেশে ফিরে তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় স্বস্তি হচ্ছে নিজের মাটিতে ফিরে পরিবারের মানুষদের সঙ্গে আবার নতুন করে জীবন শুরু করার সুযোগ পাওয়া।
দানিশ শেখের গল্পও সমান হৃদয়বিদারক। তাঁর স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় ভারতে আটক ছিলেন। চিকিৎসা এবং মানবিক কারণ দেখিয়ে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে ওঠে। আদালত দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলে তাঁকে বাংলাদেশে ফেরানো হয়। পরে সেখানেই জন্ম হয় তাঁদের কন্যাসন্তানের। কিন্তু দানিশ তখনও ভারতে আটক ছিলেন। ফলে নিজের সন্তানের জন্মের খবর পেলেও তাকে একবারও দেখতে পারেননি।
অবশেষে দেশে ফেরার পর দানিশ বলেন, তাঁর কাছে এটাই জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। এতদিন শুধু ফোনে স্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে, আত্মীয়দের কাছ থেকে মেয়ের ছবি দেখেছেন। এবার সরাসরি মেয়েকে কোলে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁর কথায়, বন্দিদশার সব কষ্ট যেন সেই মুহূর্তেই ভুলে যাবেন।
আইনজীবীদের মতে, এই ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় পরিচয় যাচাই, নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের প্রশাসনিক অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অনেক সময় সাজা শেষ হলেও বিদেশি নাগরিকদের তাৎক্ষণিকভাবে দেশে ফেরানো যায় না। প্রয়োজনীয় নথিপত্র, দূতাবাসের অনুমোদন এবং সীমান্ত-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের আটক কেন্দ্রেই থাকতে হয়। ফলে সাজা শেষ হওয়ার পরও মাসের পর মাস, কখনও বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়।
এই মামলায় মানবিক বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয় আদালত। বিশেষ করে শিশুদের ভবিষ্যৎ, অন্তঃসত্ত্বা নারীর স্বাস্থ্য এবং পরিবারের বিচ্ছিন্ন অবস্থার দিকে নজর রেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। সেই নির্দেশের ফলেই ধাপে ধাপে প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
অধিকারকর্মীদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সীমান্ত অতিক্রম, নথিপত্রের অভাব বা অবৈধ প্রবেশের অভিযোগে বহু মানুষ দীর্ঘদিন আটক থাকেন। তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই সাজা শেষ হওয়ার পরও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে মুক্তি মিলতে দেরি হয়। শিশু ও নারীরা এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই এ ধরনের মামলায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং দ্রুত আন্তঃরাষ্ট্র সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে তুলে আসছেন।
বাংলাদেশে ফিরে সুইটি বিবি ও দানিশ শেখের পরিবারের সামনে এখনও নতুন করে জীবন গড়ার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতা, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক পুনর্বাসনের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে তাঁদের। তবে পরিবারের সদস্যরা বলছেন, এতদিন পরে সবাই একসঙ্গে থাকতে পারাটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
দীর্ঘ বন্দিদশার শেষে এই প্রত্যাবর্তন তাই শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি নয়; এটি একাধিক ভেঙে যাওয়া পরিবারের পুনর্মিলনের গল্প। সুইটি বিবির “অবশেষে বাড়ি ফিরলাম” আর দানিশ শেখের “এবার মেয়েকে দেখতে পাব”—এই দুই বাক্যেই ধরা পড়েছে বহু মাসের অপেক্ষা, কষ্ট এবং শেষ পর্যন্ত ঘরে ফেরার স্বস্তি।