বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে অন্নপূর্ণা যোজনার ১১ পাতার ফর্ম প্রকাশের পরেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে, এটি শুধু লক্ষ্মীর ভান্ডারের মতো আর একটি মহিলা ভাতা প্রকল্প নয়। এই ফর্মের মাধ্যমে সরকার আসলে প্রতিটি আবেদনকারী পরিবারকে খুব গভীরভাবে যাচাই করতে চাইছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, লক্ষ্মীর ভান্ডার থেকে অন্নপূর্ণা যোজনায় রূপান্তরের সময় “বেনোজল” বাদ দিয়ে প্রকৃত উপভোক্তার তালিকা তৈরি করাই সরকারের লক্ষ্য। এই কারণেই ফর্মটি এত দীর্ঘ করা হয়েছে।

প্রথম ধাপ: পরিবারের প্রধানের পরিচয়

ফর্মের শুরুতেই আবেদনকারীর পরিবারের প্রধানের নাম, জন্মতারিখ, পূর্ণ ঠিকানা, আধার নম্বর এবং আধারের সঙ্গে যুক্ত মোবাইল নম্বর চাওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সরকার প্রথমেই বুঝতে চাইছে—এই পরিবারের প্রশাসনিক পরিচয় কী, এবং সরকারি ডেটাবেসে পরিবারটিকে কীভাবে শনাক্ত করা যাবে।

এর রাজনৈতিক অর্থও আছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারে মূল গুরুত্ব ছিল মহিলা আবেদনকারীর ওপর। অন্নপূর্ণা ফর্মে শুরু থেকেই পরিবারকে একক হিসেবে ধরা হচ্ছে।

দ্বিতীয় ধাপ: পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের তথ্য

এর পর পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের নাম, বয়স, জন্মতারিখ, আধার নম্বর, মোবাইল নম্বর এবং পরিবারের প্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক লিখতে হবে। অর্থাৎ শুধু যিনি টাকা পাবেন, তাঁর তথ্য নয়, পুরো পরিবারের সামাজিক মানচিত্র তৈরি করা হচ্ছে।

এখানেই লক্ষ্মীর ভান্ডারের সঙ্গে বড় পার্থক্য। লক্ষ্মীর ভান্ডার তুলনামূলকভাবে আবেদনকারী মহিলাকে কেন্দ্র করে। অন্নপূর্ণা ফর্ম পরিবারকে কেন্দ্র করে।

তৃতীয় ধাপ: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও আধার সংযোগ

পরিবারের প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর চাওয়া হয়েছে। সেই অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার সংযুক্ত থাকতে হবে।

এর উদ্দেশ্য স্পষ্ট—সরকার জানতে চাইছে পরিবারের আর্থিক লেনদেনের সম্ভাব্য কাঠামো কী। শুধু আবেদনকারীর অ্যাকাউন্ট নয়, পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যদের ব্যাংক-পরিচয়ও যাচাইয়ের আওতায় আসছে।

চতুর্থ ধাপ: ভোটার কার্ড, বিধানসভা ও পার্ট নম্বর

ফর্মে পরিবারের প্রধান-সহ প্রত্যেক সদস্যের ভোটার কার্ড নম্বর, বিধানসভা কেন্দ্র এবং পার্ট নম্বর লিখতে বলা হয়েছে।

এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সরকার বলছে, লক্ষ্মীর ভান্ডারের তালিকায় এমন বহু নাম রয়েছে যাদের ভোটার তালিকা থেকে স্থায়ীভাবে নাম বাদ গিয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, এমন প্রায় ৩০ লক্ষ নাম পাওয়া গিয়েছে।

অর্থাৎ অন্নপূর্ণা ফর্মে ভোটার তথ্য চাওয়ার উদ্দেশ্য শুধু পরিচয় যাচাই নয়; নাগরিকত্ব, ভোটার-স্থিতি এবং প্রকৃত বাসিন্দা নির্ধারণও এর সঙ্গে যুক্ত।

পঞ্চম ধাপ: রেশন কার্ডের তথ্য

ডিজিটাল রেশন কার্ড থাকলে তার বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। রেশন কার্ডের ধরনও গুরুত্বপূর্ণ কারণ তা পরিবারের আর্থিক অবস্থার একটি প্রাথমিক সূচক হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।

এখানে সরকার বুঝতে চাইছে পরিবারটি খাদ্যসুরক্ষা ব্যবস্থার কোন স্তরে আছে। অর্থাৎ তারা কি অগ্রাধিকারভুক্ত দরিদ্র পরিবার, না তুলনামূলকভাবে সচ্ছল?

ষষ্ঠ ধাপ: জমি ও বাড়ির বিবরণ

ফর্মের তৃতীয় পর্যায়ে আবেদনকারীর পরিবারের সম্পত্তির খতিয়ান চাওয়া হয়েছে। পাকা বাড়ি আছে কি না, পরিবার কতটা জমির মালিক, জমির মিউটেশন ও রেজিস্ট্রেশনের নথি আছে কি না—এসব তথ্য দিতে হবে।

এটি সম্ভবত ফর্মের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ। কারণ বাংলার গ্রামে অনেক পরিবারের সামান্য জমি আছে, কিন্তু নগদ আয় নেই। আবার কারও পাকা বাড়ি আছে, কিন্তু নিয়মিত রোজগার নেই। ফলে এই অংশের ভিত্তিতে যোগ্যতা বিচার করলে বহু বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

সপ্তম ধাপ: গাড়ি বা বড় সম্পদের তথ্য

পরিবারের কারও চার চাকার গাড়ি আছে কি না, তাও জানাতে হবে।

এটি মূলত সচ্ছলতা যাচাইয়ের সরাসরি সূচক। সরকার বোঝার চেষ্টা করছে, যে পরিবার মাসিক মহিলা ভাতা চাইছে, তারা বাস্তবে উচ্চ-মধ্যবিত্ত বা সচ্ছল কি না।

অষ্টম ধাপ: অন্য সরকারি প্রকল্পের সুবিধা

আবেদনকারী বা তাঁর পরিবার ইতিমধ্যে রাজ্য সরকারের অন্য কোনও প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছেন কি না, তা জানাতে হবে। স্বাস্থ্যবিমা আছে কি না, সেটিও জানতে চাওয়া হয়েছে।

এর অর্থ, অন্নপূর্ণা ফর্ম শুধু এক প্রকল্পের আবেদনপত্র নয়; এটি ভবিষ্যতের সরকারি সুবিধা বণ্টনের জন্য একটি পারিবারিক ডেটাবেস হিসেবেও ব্যবহার হতে পারে। শুভেন্দু নিজেও বলেছেন, ভবিষ্যতে অন্য প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও এই তথ্য বিবেচনা করা হবে।

নবম ধাপ: প্যান কার্ড ও আয়-সংক্রান্ত তথ্য

পরিবারের সদস্যদের প্যান কার্ড থাকলে তার নম্বর দিতে হবে। পরিবারের প্রত্যেকের পেশাও লিখতে হবে। বক্তব্যের পক্ষে উপযুক্ত কাগজ জমা দিতে হবে।

এখানে সরকার পরিবারের আয়, করদানের সম্ভাবনা এবং আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করতে চাইছে। অর্থাৎ শুধু “আমি দরিদ্র” বললেই হবে না; পেশা, প্যান, ব্যাংক ও সম্পত্তির তথ্য মিলিয়ে সরকার নিজে সিদ্ধান্ত নিতে চাইবে।

সারকথা

অন্নপূর্ণা যোজনার ১১ পাতার ফর্ম আসলে তিনটি কাজ একসঙ্গে করছে।

প্রথমত, মহিলাদের মাসিক ৩,০০০ টাকা দেওয়ার আগে প্রকৃত উপভোক্তা চিহ্নিত করার চেষ্টা।

দ্বিতীয়ত, লক্ষ্মীর ভান্ডারের বর্তমান তালিকা ছেঁকে “অযোগ্য” বা সন্দেহজনক নাম বাদ দেওয়ার উদ্যোগ।

তৃতীয়ত, রাজ্যের প্রতিটি পরিবারের একটি বিশদ সামাজিক-আর্থিক ডেটাবেস তৈরি করার প্রচেষ্টা।

লক্ষ্মীর ভান্ডার ছিল সহজ, দ্রুত, বিস্তৃত ও আবেগনির্ভর প্রকল্প। অন্নপূর্ণা যোজনার ফর্ম দেখাচ্ছে, নতুন প্রকল্পটি অনেক বেশি যাচাই-নির্ভর, নথি-নির্ভর এবং পরিবার-কেন্দ্রিক হতে চলেছে। এখানেই দুই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় পার্থক্য।