Home খবর প্রার্থী নেই, নন্দীগ্রামে ভাঙছে তৃণমূল

প্রার্থী নেই, নন্দীগ্রামে ভাঙছে তৃণমূল

0 comments 21 views
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: নন্দীগ্রামের সকালগুলো এক সময় অন্য রকম ছিল। ভোরের আলো ফোটার আগেই চায়ের দোকানে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত দলীয় পতাকা লাগানো মোটরবাইক, কাঁচা রাস্তার ধারে বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো থাকত শাসক দলের হাসিমুখ পোস্টার, আর বাজারে ঢুকলেই বোঝা যেত কে ক্ষমতায়। ক্ষমতা তখন শুধু প্রশাসনিক শব্দ ছিল না; সেটি ছিল বাতাসের মতো এক অদৃশ্য উপস্থিতি। কেউ উচ্চস্বরে তার নাম বলত না, অথচ সবাই জানত সে কোথায় বসে আছে।

আজ সেই নন্দীগ্রামেই তৃণমূল কংগ্রেস উপনির্বাচনের প্রার্থী খুঁজে পাচ্ছে না।

মাত্র পক্ষকাল আগে পর্যন্ত যে দল পনেরো বছরের শাসনের আত্মবিশ্বাসে কথা বলত, সেই দলের নেতারা এখন ফোন ধরছেন না, বৈঠক এড়িয়ে যাচ্ছেন এবং সবচেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে — “প্রার্থী হতে চাই না” বাক্যটি উচ্চারণ করছেন প্রকাশ্যে। রাজনীতিতে পরাজয় নতুন কিছু নয়। কিন্তু এমন পরাজয়, যেখানে হারের চেয়েও দ্রুত ভেঙে পড়ে সংগঠনের মানসিক কাঠামো, তা বিরল।

সদ্য পরাজিত প্রার্থী পবিত্র কর আর লড়তে রাজি নন। তাঁর অস্বীকৃতিতে রাজনৈতিক কৌশলের চেয়ে ক্লান্তির আভাস বেশি স্পষ্ট। যে মানুষটি কয়েক সপ্তাহ আগেও সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন যে নন্দীগ্রাম “ফিরে আসবে”, তিনি এখন আর ফিরে যেতে চাইছেন না সেই যুদ্ধক্ষেত্রে। স্থানীয়দের ভাষায়, “ওঁর শরীরের চেয়ে মনটাই বেশি ভেঙে গেছে।”

কিন্তু ঘটনাটি আরও নাটকীয় হয়ে ওঠে শেখ সুফিয়ানকে ঘিরে।

এক সময় নন্দীগ্রামের আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন সুফিয়ান। তাঁর বাড়ি এক সময় ছিল রাজনৈতিক তীর্থক্ষেত্রের মতো। সাংবাদিক, কর্মী, মন্ত্রী সকলের আনাগোনা ছিল সেখানে। সেই মানুষটির বাড়িতে যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূত হিসেবে দোলা সেন যান, তখন দলের আশা ছিল অন্তত আন্দোলনের পুরনো আবেগকে কাজে লাগানো যাবে। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাসে কখনও কখনও একটি সংক্ষিপ্ত বাক্য পুরো যুগের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সুফিয়ান নাকি দোলা সেনকে বসিয়েই বললেন, শুভেন্দু অধিকারী এবার নন্দীগ্রামের উন্নয়ন করবেন “জোর কদমে”।

এই বাক্যটি নিছক প্রশংসা নয়। এটি আসলে ক্ষমতার নতুন ভূগোলকে স্বীকার করে নেওয়া। বাংলার গ্রামীণ রাজনীতিতে মানুষ আদর্শের চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেয় প্রশাসনিক প্রবাহকে — রাস্তা কোথায় হবে, কার ফোনে থানা নড়ে, কার কথায় বিডিও অফিসে ফাইল এগোয়। নন্দীগ্রামের মানুষ এখন বুঝে গিয়েছে ক্ষমতার কেন্দ্র সরে গেছে। সুফিয়ানের মন্তব্য সেই বাস্তবতারই প্রকাশ।

এখানেই তৃণমূলের সংকট কেবল নির্বাচনী নয়; এটি অস্তিত্বগত।

দলটি দীর্ঘদিন ধরে এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করেছিল যেখানে “ক্ষমতা” এবং “দল” প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল। বিরোধী অবস্থানে কীভাবে সংগঠন বাঁচিয়ে রাখতে হয়, পরাজয়ের পরে কীভাবে ক্যাডারকে ধরে রাখতে হয়, স্থানীয় নেতৃত্বকে কীভাবে পুনর্গঠিত করতে হয় — এই রাজনৈতিক দক্ষতাগুলি ধীরে ধীরে হারিয়ে গিয়েছিল। কারণ দীর্ঘ ক্ষমতা মানুষকে সবচেয়ে আগে শেখায় যে পরাজয় অসম্ভব।

ফলে হারটি যখন সত্যিই আসে, তখন সেটি শুধু ভোটের বাক্সে আসে না; সেটি এসে আঘাত করে মানসিক জগতে।

নন্দীগ্রামে এখন তৃণমূলের বহু পুরনো কর্মী এমনভাবে কথা বলেন যেন তাঁরা একটি মৃত সাম্রাজ্যের শেষ প্রহরী। তাঁদের কথাবার্তায় ক্ষোভ আছে, কিন্তু বিশ্বাস নেই। অনেকে বলেন, “কলকাতার নেতারা ভোটের আগে আসেন, পরে আর খোঁজ নেন না।” কেউ কেউ আরও তীব্র। তাঁদের অভিযোগ, আইপ্যাক-নির্ভর রাজনীতি সংগঠনকে ফাঁপা করে দিয়েছে। বুথ কমিটির জায়গায় এসেছে ডেটা শিট; রাজনৈতিক সম্পর্কের জায়গায় এসেছে অ্যাপ-ভিত্তিক ম্যানেজমেন্ট।

এক প্রবীণ তৃণমূল কর্মী স্থানীয় বাজারে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, “আগে দল মানে ছিল মানুষ। এখন দল মানে স্ক্রিন।”

এই বিচ্ছিন্নতাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় কারণ কেন প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ স্থানীয় নেতারা বুঝতে পারছেন, এটি কেবল একটি উপনির্বাচন নয়। এটি আসলে জনসমক্ষে আত্মসমর্পণের ঝুঁকি।

আর অন্যদিকে শুভেন্দু অধিকারী এই মুহূর্তে এমন এক রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন যা প্রায় সামন্ততান্ত্রিক প্রভাবের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। তিনি এখন শুধু একজন বিধায়ক নন; নন্দীগ্রামে তিনি “জয়ী শক্তি”-র প্রতীক। তাঁর চারপাশে এখন প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, রাজনৈতিক গতি এবং বিজয়ের মনস্তত্ত্ব, তিনটিই একসঙ্গে কাজ করছে।

রাজনীতিতে মানুষ প্রায়শই মতাদর্শের চেয়ে গতির দিকে ছুটে যায়। যে ট্রেন এগোচ্ছে, যাত্রীরা শেষ পর্যন্ত সেটিতেই উঠতে চায়। নন্দীগ্রামে এখন সেই মনস্তত্ত্ব স্পষ্ট।

তৃণমূলের দুর্দশার আরও একটি দিক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দলটি দীর্ঘদিন ধরে “মমতা বনাম বাকিরা” মডেলে চলেছে। এই কাঠামো নির্বাচনে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু সংগঠনগতভাবে বিপজ্জনক। কারণ সব শক্তি যদি এক ব্যক্তির চারপাশে কেন্দ্রীভূত হয়, তবে স্থানীয় নেতৃত্ব ধীরে ধীরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারায়। তারা অপেক্ষা করতে শেখে, নির্দেশ পালন করতে শেখে, কিন্তু ঝুঁকি নিতে শেখে না।

আজ তার ফল দৃশ্যমান।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও জনসমক্ষে সবচেয়ে পরিচিত মুখ। কিন্তু নন্দীগ্রামের মতো জায়গায় প্রশ্ন উঠছে — তাঁর নামে কি এখনও মানুষ লড়াই করতে প্রস্তুত? নাকি তাঁরা এখন কেবল নিরাপদ দূরত্ব থেকে সম্মান জানাতে চান?

দোলা সেনের সফরের মধ্যে এক ধরনের শেষ চেষ্টার আভাস ছিল। যেন দিল্লির পতনের আগে মুঘল দরবার থেকে দূত পাঠানো হয়েছে প্রাদেশিক সুবেদারের কাছে আনুগত্য যাচাই করতে। কিন্তু ইতিহাসের নির্মমতা হল, ক্ষমতা সরে গেলে আনুগত্যও দ্রুত মতাদর্শ বদলায়।

নন্দীগ্রামের বর্তমান দৃশ্য তাই শুধু একটি উপনির্বাচনের প্রস্তুতি নয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তিত সমাজতত্ত্বের প্রতিচ্ছবি। এখানে দেখা যাচ্ছে, কীভাবে দীর্ঘকালীন শাসক দল হঠাৎ করে নিজের ভিতরেই অপরিচিত হয়ে পড়ে। কীভাবে কর্মীরা রাতারাতি বাস্তববাদী হয়ে ওঠেন। কীভাবে নেতারা বুঝে যান যে পরাজিত পতাকার নিচে দাঁড়ানো মানে শুধু রাজনৈতিক ঝুঁকি নয়, সামাজিক নিঃসঙ্গতাও।

আর সবচেয়ে বড় কথা, এটি দেখাচ্ছে যে ক্ষমতার পতন কখনও ধীরে ধীরে ঘটে না। বাইরে থেকে সাম্রাজ্যকে অনেক সময় অটুট মনে হয়। কিন্তু ভিতরে ভিতরে যদি বিশ্বাস ক্ষয়ে যেতে শুরু করে, তবে একদিন দেখা যায় দুর্গ এখনও দাঁড়িয়ে আছে, শুধু তার ভিতরে আর কেউ থাকতে চায় না।

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles