বাংলাস্ফিয়ার: খাইবারের পাহাড়ি বাতাসে একসময় ব্যবসার গন্ধ মিশে থাকত। আফগানিস্তান থেকে আসা ট্রাকগুলো ধুলো উড়িয়ে ঢুকত বারা বাজারে। কোথাও শুকনো ফলের বস্তা নামছে, কোথাও চীনা ইলেকট্রনিক্স, কোথাও আবার কার্পেট, কাপড়, প্লাস্টিকের খেলনা কিংবা বিদেশি সিগারেটের কার্টন। পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল বহু দশক ধরে শুধু একটি বাজার ছিল না, ছিল এক ধরনের সীমান্তসভ্যতা যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি ছিল ক্ষীণ, কিন্তু বাণিজ্যের প্রাণশক্তি ছিল প্রবল।
আজ সেই বাজারে শুধুই নীরবতা। দোকানের টিনের চাল বৃষ্টিতে ভেঙে পড়ছে। আধখোলা শাটারের ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছে ধুলো জমা তাক। কোথাও ছিন্ন তার ঝুলছে, কোথাও ভাঙা সাইনবোর্ডে এখনও লেখা রয়েছে পুরোনো দোকানের নাম। যে বাজারে একসময় দশ হাজারের বেশি দোকান ছিল, সেখানে এখন মানুষের চেয়ে ধ্বংসস্তূপ বেশি চোখে পড়ে।
খাইবার জেলার বারা বাজার এবং তিরাহ উপত্যকার বাজারগুলোর এই পতন পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ব্যর্থতার এক প্রতীক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুদ্ধ, জঙ্গিবাদ এবং সরকারি অবহেলার যুগপৎ আঘাতে পুরো অঞ্চল কার্যত অর্থনৈতিক মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
দুই দশক আগে এই অঞ্চলকে পাকিস্তানের “ছায়া-বাণিজ্যের রাজধানী” বলা হত। আফগান ট্রানজিট ট্রেডের ফাঁক গলে আসা বিদেশি পণ্য এখানে বিক্রি হত অবাধে। করাচি কিংবা লাহোরের ব্যবসায়ীরাও খাইবারের বাজারের দিকে তাকিয়ে থাকতেন। কিন্তু ২০০৯ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যখন জঙ্গি দমনের নামে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন বাজারগুলিও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়।
বারা বাজার বন্ধ হয়ে যায়। হাজার হাজার দোকানদার পালিয়ে যান। অনেক পরিবার পেশোয়ার কিংবা আরও দূরের শহরে আশ্রয় নেয়। কেউ কেউ আফগানিস্তান সীমান্তের ওপারে আত্মীয়দের কাছে চলে যায়। সেই বন্ধ বাজার আবার খুলেছিল ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু পুনরুজ্জীবনের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবে আর কখনও পূরণ হয়নি।
স্থানীয় ট্রেডার্স ইউনিয়নের সভাপতি সৈয়দ আয়াজ ওয়াজির এখন প্রায় প্রতিদিনই সাংবাদিকদের সামনে একই আক্ষেপ করেন—“বাজার খুলেছে, কিন্তু জীবন আর আগের মতো নয়।”
তার কথার মধ্যে শুধু হতাশা নয়, এক ধরনের অপমানবোধও রয়েছে। কারণ, বহু ব্যবসায়ী মনে করেন ইসলামাবাদ তাদের অঞ্চলকে নিরাপত্তা সমস্যার বাইরে আর কিছু হিসেবে কখনও দেখেনি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে পুনর্গঠন, ক্ষতিপূরণ, অবকাঠামো—কোনও ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
এখন বর্ষা নামলেই আতঙ্ক শুরু হয়। ভাঙা ছাদ দিয়ে জল ঢুকে মালপত্র নষ্ট হয়। অনেক দোকানের ছাদ হঠাৎ ধসে পড়ে আহত হয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কয়েক মাসের মধ্যে ক্ষতির পরিমাণ নাকি পঞ্চাশ কোটি পাকিস্তানি রুপিরও বেশি। কিন্তু ক্ষতিপূরণ নেই, পুনর্নির্মাণ নেই।
তিরাহ উপত্যকার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। স্থানীয় ট্রেডার্স কমিউনিটির হিসাবে, আট হাজারের বেশি ব্যবসায়ী বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁদের মাত্র দশ শতাংশ কোনওভাবে ব্যবসায় ফিরতে পেরেছেন। বাকিরা হয় দিনমজুরিতে নেমেছেন, নয়তো ঋণের বোঝায় ডুবে আছেন।
খাইবারের এই অর্থনৈতিক ধস শুধু বাজারের গল্প নয়, এটি এক বৃহত্তর সামাজিক বিপর্যয়ের কাহিনী। কারণ সীমান্ত অঞ্চলের অর্থনীতি ভেঙে পড়লে তার প্রথম আঘাত লাগে যুবসমাজের উপর। কাজ নেই, বিনিয়োগ নেই, শিল্প নেই। শিক্ষার সুযোগও সীমিত। ফলে বেকারত্ব এখানে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, নিরাপত্তাজনিত বিপদের উৎসও।
স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, যে তরুণেরা আগে দোকানে কাজ করত, ট্রাক চালাত, গুদামে মাল তুলত, তারা এখন দিশাহীন। কেউ কেউ অবৈধ পাচারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে, কেউ আবার উগ্রপন্থী সংগঠনের সহজ শিকার হয়ে উঠছে।
খাইবারের বাজারগুলোর পতনের মধ্যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রচরিত্রের একটি গভীর সংকটও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে সামরিক ও কৌশলগত অগ্রাধিকারকে অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের উপরে স্থান দিয়েছে। সীমান্ত অঞ্চলগুলোকে মূলধারার অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার বদলে প্রায়শই সেগুলোকে “নিরাপত্তা অঞ্চল” হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।
এই মানসিকতার ফলেই যুদ্ধ শেষ হলেও শান্তি ফেরেনি।
বারা বাজারের এক প্রবীণ ব্যবসায়ী সম্প্রতি একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলছিলেন, “আমরা সেনাবাহিনীকে স্বাগত জানিয়েছিলাম, কারণ আমরা জঙ্গিদের হাত থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম। কিন্তু যুদ্ধের পরে রাষ্ট্রও আমাদের ভুলে গেল।”
এই অভিযোগের রাজনৈতিক তাৎপর্যও কম নয়। খাইবার পাখতুনখোয়ার বহু মানুষ মনে করেন, তাঁদের অঞ্চল পাকিস্তানের মূল ভূখণ্ডের তুলনায় দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো আচরণ পায়। উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো, ব্যাংক ঋণ, শিল্প বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই বৈষম্যের অভিযোগ বহু পুরোনো।
তার উপর পাকিস্তানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সঙ্কট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। মূল্যস্ফীতি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ঋণের চাপে গোটা দেশের অর্থনীতি টালমাটাল। এই অবস্থায় খাইবারের মতো প্রান্তিক অঞ্চলের জন্য বিশেষ পুনর্বাসন প্যাকেজ ঘোষণা করার রাজনৈতিক সদিচ্ছাও কার্যত অনুপস্থিত।
তবু বাজারের মানুষ বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। কেউ ভাঙা দোকানের সামনে ছোট চায়ের স্টল খুলেছেন। কেউ অর্ধেক ধসে পড়া ঘরে পুরোনো কাপড় বিক্রি করছেন। শিশুরা এখনও বাজারের সরু গলিতে ক্রিকেট খেলছে। সন্ধ্যায় কোথাও কোথাও কাবাবের ধোঁয়া উঠছে। জীবন পুরোপুরি থেমে যায়নি।
কিন্তু সেই জীবন আজ ক্লান্ত।
একসময় যে বারা বাজার সীমান্ত-বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র ছিল, আজ তা পাকিস্তানের উন্নয়ন-বৈষম্যের এক নিঃশব্দ স্মারক। রাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি, সামরিক অভিযানের ভাষণ, পুনর্গঠনের আশ্বাস এই সবকিছুর ফাঁকে পড়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে এখন একটাই প্রশ্ন: যুদ্ধের মূল্য কি শুধু তারাই দেবে?