বাংলাস্ফিয়ার: মে মাসের ইউরোপ সাধারণত নরম রোদ, ফুলে ভরা পার্ক আর দীর্ঘ সন্ধ্যার ঋতু। প্যারিসের ক্যাফেগুলিতে তখনও পর্যটকেরা কফির কাপ হাতে বসে থাকেন, লন্ডনের পার্কে শিশুরা খেলাধুলা করে, আর স্কটল্যান্ডের পাহাড়ি ঘাসভূমিতে বাতাসে ঠান্ডার আভাস থাকে। কিন্তু এ বছর সেই পরিচিত ইউরোপ যেন আচমকাই বদলে গিয়েছে। ক্যালেন্ডারে এখনও গ্রীষ্ম পুরোপুরি শুরু হয়নি, অথচ পশ্চিম ইউরোপ জুড়ে নেমে এসেছে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ (Early summer heatwave climate change)। ফ্রান্স, ব্রিটেন, স্কটল্যান্ড, স্পেন— একের পর এক দেশ অস্বাভাবিক উষ্ণতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। কোথাও তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পেরিয়ে গেছে, কোথাও আবার মে মাসের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
লন্ডনে পারদ পৌঁছেছে ৩৪.৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এত উষ্ণ মে মাস ব্রিটেন আগে দেখেনি (UK record temperature May)। যে শহর সাধারণত হালকা জ্যাকেট আর ছাতার জন্য পরিচিত, সেই শহরের পাতাল রেলে এখন যাত্রীরা গরমে হাঁসফাঁস করছেন। হাসপাতালগুলিতে হিটস্ট্রোক, ডিহাইড্রেশন এবং শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। বিশেষ উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছেন প্রবীণ নাগরিকেরা এবং শিশুরা। ব্রিটেনের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ মানুষকে বারবার সতর্ক করছে— প্রয়োজন ছাড়া দুপুরে বাইরে না বেরোতে, প্রচুর জল খেতে এবং একা থাকা বয়স্ক আত্মীয়দের খোঁজ নিতে।
ফ্রান্সের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মৃত্যুর খবর। ভয়াবহ গরমে বহু মানুষ নদী, হ্রদ বা সমুদ্রসৈকতে ছুটছেন স্বস্তির খোঁজে। কিন্তু সেই জলই অনেকের মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছে। প্রশাসনের হিসাব বলছে, কয়েকটি অঞ্চলে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। উদ্ধারকারী বাহিনীকে দিনে অসংখ্যবার তৎপর হতে হচ্ছে। দক্ষিণ ফ্রান্সের কিছু এলাকায় বনাঞ্চলে আগুনও ছড়িয়ে পড়েছে। শুকনো ঘাস, তপ্ত বাতাস এবং দীর্ঘদিন বৃষ্টিহীন আবহাওয়া মিলিয়ে দাবানলের ঝুঁকি ভয়ঙ্কর আকার নিয়েছে।
স্কটল্যান্ডেও পরিস্থিতি অস্বাভাবিক। এডিনবরার কাছে বিস্তীর্ণ ঘাসজমিতে আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। সাধারণত যে অঞ্চলে ঠান্ডা ও আর্দ্র আবহাওয়া থাকে, সেখানে এই ধরনের আগুন এখন নতুন বাস্তবতা। দমকলকর্মীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লড়াই করছেন আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে। স্থানীয় প্রশাসন বাসিন্দাদের সতর্ক করে বলেছে, কেউ যেন খোলা জায়গায় আগুন না জ্বালান, এমনকি সিগারেটের অবশিষ্ট অংশও যেখানে সেখানে না ফেলেন।
এই তাপপ্রবাহের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল এর সময়কাল। ইউরোপে জুন-জুলাইয়ে তাপদাহ নতুন নয়, কিন্তু মে মাসেই এই মাত্রার গরম বিশেষজ্ঞদের আতঙ্কিত করছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনও ঘটনা নয়। গত এক দশকে ইউরোপে চরম আবহাওয়ার ঘটনা দ্রুত বেড়েছে— কখনও তীব্র গরম, কখনও ভয়াবহ বন্যা, কখনও দীর্ঘ খরা। বিজ্ঞানীদের মতে, পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
একসময় ইউরোপের বহু শহর গরম মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিল না। কারণ ঐতিহাসিকভাবে সেখানকার আবহাওয়া ছিল তুলনামূলক শীতল। ফলে বহু বাড়িতে এখনও এয়ার কন্ডিশনার নেই। পুরনো ইমারতগুলিতে বায়ু চলাচলের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। গরম বাড়লেই সেই ঘরগুলি যেন অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, ইউরোপের পরিকাঠামো আসলে শীতের জন্য তৈরি, গরমের জন্য নয়। ফলে তাপপ্রবাহ এখন কেবল আবহাওয়ার সমস্যা নয়, জনস্বাস্থ্য এবং নগর পরিকল্পনার বড় সংকট হয়ে উঠছে।
পরিবেশবিদেরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, কয়েক বছর আগেও ইউরোপে দাবানল বা প্রাণঘাতী গরমকে দক্ষিণ ইউরোপের সমস্যা বলে মনে করা হতো। এখন সেই বিপদ উত্তর ইউরোপেও পৌঁছে গেছে। ব্রিটেন, জার্মানি কিংবা স্ক্যান্ডিনেভিয়ার মতো দেশগুলিও আর নিরাপদ নয়। আবহাওয়ার পুরনো ছক ভেঙে যাচ্ছে দ্রুত।
তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। কৃষিক্ষেত্রে উদ্বেগ বাড়ছে। অতিরিক্ত গরমে ফসলের ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। জলসংকটও ধীরে ধীরে প্রকট হচ্ছে। ফ্রান্সের কিছু অঞ্চলে জল ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনার আলোচনা শুরু হয়েছে। পর্যটন শিল্পেও প্রভাব পড়ছে। যে ইউরোপকে মানুষ আরামদায়ক গ্রীষ্মের জন্য চিনত, সেই ইউরোপে এখন গরম এড়াতে পর্যটকেরা পরিকল্পনা বদলাচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপ বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার দাবি করেছে। কিন্তু বাস্তবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমানো, পরিবহণ ব্যবস্থাকে পরিবেশবান্ধব করা বা নবীকরণযোগ্য শক্তির বিস্তার— সব ক্ষেত্রেই অগ্রগতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর। সমালোচকেরা বলছেন, ইউরোপীয় দেশগুলি বিপদের পূর্বাভাস বহুদিন ধরেই পেয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে প্রস্তুতি যথেষ্ট হয়নি।
পশ্চিম ইউরোপের এই তাপপ্রবাহ তাই কেবল একটি আবহাওয়ার খবর নয়। এটি ভবিষ্যতের এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা। পৃথিবীর জলবায়ু যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তার নির্মম প্রমাণ এখন ইউরোপের রাস্তাঘাট, হাসপাতাল, বনভূমি এবং মানুষের ক্লান্ত মুখে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। যে মহাদেশ একসময় নিজেকে নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার নিরাপদ অঞ্চল বলে ভাবত, সেই মহাদেশই আজ বুঝতে শুরু করেছে— জলবায়ু সঙ্কট কোনও দূরের বিপদ নয়, তা ইতিমধ্যেই দরজায় কড়া নাড়ছে।