Home দৃষ্টিভঙ্গি অনীক দত্ত এবং মধ্যবিত্তের মানসিক দ্বিচারিতার সরস কৌতুকদর্পণ

অনীক দত্ত এবং মধ্যবিত্তের মানসিক দ্বিচারিতার সরস কৌতুকদর্পণ

by বাংলাস্ফিয়ার
0 comments 2 views 9 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এমন কিছু পরিচালক আছেন, যাঁদের গুরুত্ব বক্স অফিসের হিসেব দিয়ে মাপা যায় না। তাঁরা কোনও “মহান” নির্মাতা নন হয়তো, কিন্তু তাঁরা তাঁদের সময়ের সামাজিক মনস্তত্ত্বকে এমন এক বিশেষ ভঙ্গিতে ধরতে পারেন, যা পরে ইতিহাসের দলিলে পরিণত হয়। অনীক দত্ত (Anik Dutta) সেই বিরল প্রজাতির মানুষদের একজন। তিনি কখনও সত্যজিৎ রায়ের মতো সর্বজনস্বীকৃত নন্দনতাত্ত্বিক নন, ঋত্বিক ঘটকের মতো সভ্যতার অন্তিম আর্তনাদের কবিও নন, আবার মৃণাল সেনের মতো আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভাষ্যের নির্মাতাও নন। কিন্তু তিনি এমন এক চলচ্চিত্রকার (Anik Dutta movies), যিনি কলকাতার মধ্যবিত্ত বাঙালির আত্মপ্রবঞ্চনা, সাংস্কৃতিক ভান, রাজনৈতিক দ্বিচারিতা এবং তথাকথিত “বুদ্ধিজীবী” সমাজের আত্মতুষ্টিকে ধারালো ব্যঙ্গের মাধ্যমে পর্দায় তুলেছিলেন এমন সময়ে, যখন বাংলা সিনেমা হয় সম্পূর্ণ নির্বিষ হয়ে পড়েছে, নয়তো আত্মমুগ্ধ প্রতীকে ডুবে গেছে।

(অনীক দত্তকে নিয়ে এই সুদীর্ঘ আলোচনাটি কয়েকটি পর্বের আকারে প্রকাশিত হবে। আজ প্রথম পর্ব।)

অনীক দত্তকে বোঝার জন্য প্রথমেই একটা ভুল ধারণা ভাঙতে হবে। তাঁকে অনেকে “স্যাটায়ার ডিরেক্টর” (Bengali cinema satire) বলে হালকা করে দেন, যেন ব্যঙ্গচিত্র নির্মাণ কোনও গুরুতর শিল্প নয়। অথচ ব্যঙ্গই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন শিল্পরীতি। কারণ ট্র্যাজেডি মানুষের সহানুভূতি আদায় করে নেয় সহজেই, কিন্তু ব্যঙ্গকে একই সঙ্গে বুদ্ধিদীপ্ত, নির্মম এবং শিল্পসম্মত হতে হয়। ব্যর্থ হলে তা কেবল ঠাট্টা হয়ে দাঁড়ায়। সফল হলে তা সমাজের আয়না হয়ে ওঠে। অনীকের সেরা কাজগুলিতে এই দ্বিতীয় গুণটি দেখা যায়।

‘ভূতের ভবিষ্যৎ’: সাংস্কৃতিক স্মৃতিভ্রংশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ

তাঁর চলচ্চিত্রজীবনের আলোচনা শুরু করতেই হয় ভূতের ভবিষ্যৎ (Bhooter Bhabishyat) দিয়ে। বাংলা সিনেমার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন সাংস্কৃতিক বিস্ফোরণ খুব কম ছবিই ঘটাতে পেরেছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি “হরর কমেডি”—এক পুরোনো ভগ্নপ্রায় বাড়িতে বিভিন্ন যুগের ভূতেদের বসবাস। কিন্তু ছবিটি আসলে উত্তর-উদারীকরণ কলকাতার সাংস্কৃতিক স্মৃতিভ্রংশের বিরুদ্ধে এক তীব্র প্রতিবাদ।

ছবিটির সবচেয়ে বড় শক্তি তার রূপক নির্মাণ। যে বাড়িটি ভেঙে শপিং মল হতে চলেছে, সেটি কেবল একটি বাড়ি নয়—সেটি পুরোনো কলকাতার সাংস্কৃতিক স্মৃতি। সেখানে বাস করা ভূতেরা আসলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্তরের প্রতিনিধি। কেউ জমিদারি যুগের, কেউ নকশাল আমলের, কেউ অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান, কেউ থিয়েটারের মানুষ। তারা সবাই মৃত, কিন্তু তাদের স্মৃতি এখনও শহরের শরীরে রয়ে গেছে। নতুন প্রোমোটার-চালিত শহর সেই স্মৃতিকে বুলডোজার দিয়ে মুছে ফেলতে চাইছে।

এই রূপকটি অনীক অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করেন। তিনি কোনওদিন বক্তৃতামূলক হয়ে ওঠেন না। বরং হাস্যরসের আড়ালে এমন সব পর্যবেক্ষণ রাখেন, যা গভীরভাবে রাজনৈতিক। উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক ছবির সেই বিখ্যাত সংলাপ—“এখন আর মানুষ ভূতে ভয় পায় না, মানুষ মানুষকে ভয় পায়।” এই একটি বাক্যেই সমকালীন নাগরিক সভ্যতার সন্ত্রাস, দুর্নীতি এবং নৈতিক পতনের সারাংশ এসে যায়।

তবে ছবিটির সীমাবদ্ধতাও ছিল। অনীকের বড় সমস্যা হল তিনি অনেক সময় তাঁর বুদ্ধিমত্তা প্রদর্শনের লোভ সামলাতে পারেন না। ফলে কিছু দৃশ্যে ব্যঙ্গ অত্যন্ত স্পষ্ট ও সরাসরি হয়ে ওঠে। সূক্ষ্মতার জায়গায় আসে কার্টুন। নিউ ইয়র্কারের সমালোচকরা যাকে বলেন “over-insistence”—একই বক্তব্য বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা। তবু সামগ্রিকভাবে ভূতের ভবিষ্যৎ বাংলা সিনেমার ইতিহাসে একটি মাইলফলক, কারণ এটি প্রমাণ করেছিল যে তথাকথিত “ইন্টেলেকচুয়াল” সিনেমা না হয়েও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে গভীর হওয়া যায়।

. ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ ও মধ্যবিত্তের মনস্তত্ত্ব

এরপর আসে আশ্চর্য প্রদীপ। এই ছবিটি অনেক কম আলোচিত, কিন্তু অনীক দত্তকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে তাঁর মধ্যবিত্ত মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণের ক্ষমতা সবচেয়ে স্পষ্ট। একটি সাধারণ মানুষ হঠাৎ জাদুর প্রদীপ পেয়ে জীবনের সমস্ত অপূর্ণ বাসনা পূরণ করতে শুরু করে—এই গল্পটি আসলে বাঙালি মধ্যবিত্তের চিরন্তন হতাশা ও ক্ষমতালিপ্সার রূপক।

অনীকের সিনেমার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তিনি তাঁর চরিত্রদের ঘৃণা করেন না। তিনি তাঁদের নিয়ে হাসেন, কিন্তু সেই হাসির মধ্যে মমতা থাকে। আশ্চর্য প্রদীপ-এও তাই। নায়ক হাস্যকর, ছোটলোক মানসিকতার, সুবিধাবাদী—কিন্তু সে সম্পূর্ণ অমানবিক নয়। বরং দর্শক বুঝতে পারে, এই মানুষটিই আসলে চারপাশের হাজারো বাঙালি অফিসকর্মীর প্রতিচ্ছবি।

এখানেই অনীকের সঙ্গে অনেক তথাকথিত “আর্ট ফিল্ম” পরিচালকের পার্থক্য। তিনি তাঁর দর্শককে অপমান করেন না। তিনি জানেন তাঁর দর্শকরাই সেই মধ্যবিত্ত সমাজের অংশ, যাদের তিনি ব্যঙ্গ করছেন। ফলে তাঁর ব্যঙ্গ কখনও এলিট অবজ্ঞা হয়ে ওঠে না। বরং তা আত্মসমালোচনায় পরিণত হয়।

চিত্রনাট্যের জোর বনাম ভিজ্যুয়াল ভাষার সীমাবদ্ধতা

কিন্তু এই ছবিতেই অনীকের একটি বড় দুর্বলতাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তিনি সবসময় সিনেমাটিক ফর্মে সমান শক্তিশালী নন। তাঁর অনেক দৃশ্য নাটকের মতো সাজানো, ক্যামেরা ব্যবহারে বিশেষ অভিনবত্ব নেই, এবং ভিজ্যুয়াল ভাষা অনেক সময় টেলিভিশনের কাছাকাছি চলে যায়। অর্থাৎ তিনি মূলত “writer-director”—চিত্রনাট্য ও সংলাপ তাঁর আসল শক্তি। ভিজ্যুয়াল কবিতার পরিচালক তিনি নন।

এই কারণেই তাঁকে সত্যজিৎ বা ঋত্বিকের পাশে বসানো যায় না। তাঁদের সিনেমা শব্দ বন্ধ করেও দেখা যায়। অনীকের সিনেমা শব্দ ছাড়া অর্ধেক শক্তি হারায়। তাঁর সিনেমা মূলত ভাষানির্ভর। সংলাপই তার প্রধান অস্ত্র।

তবু এখানেই তাঁকে ছোট করলে ভুল হবে। কারণ বাংলা সিনেমার এক বিশেষ ঐতিহ্য—সংলাপ-ভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক সামাজিক চলচ্চিত্র—তিনি নতুনভাবে পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। এই ধারার পূর্বসূরি ছিলেন তপন সিংহ-এর কিছু কাজ, আবার অন্যদিকে সত্যজিৎ রায়-এর পরশ পাথর বা হীরক রাজার দেশে। অনীক সেই ধারাটিকে একবিংশ শতকের কলকাতায় ফিরিয়ে আনেন।

 

‘অপরাজিত’: সত্যজিৎ-প্রেম অথবা বিকল্প ইতিহাসের সমান্তরাল জগৎ

তাঁর সবচেয়ে বিতর্কিত এবং সম্ভবত সবচেয়ে ব্যক্তিগত ছবি হল ‘অপরাজিত’ (Aparajito movie Anik Dutta)। এই ছবিকে কেবল “সত্যজিৎ রায়কে শ্রদ্ধাঞ্জলি” বললে ভুল হবে। এটি আসলে সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং বাঙালির আত্মপরিচয় নিয়ে নির্মিত এক আবেগঘন রাজনৈতিক বক্তব্য।

ছবির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল, অনীক এখানে সরাসরি সত্যজিৎ রায়ের নাম ব্যবহার করেননি, কিন্তু গোটা চলচ্চিত্রজুড়ে সেই উপস্থিতি এত প্রবল যে দর্শক কার্যত এক বিকল্প ইতিহাসের ভেতরে ঢুকে পড়ে। যেন এক সমান্তরাল জগৎ, যেখানে “পথের পাঁচালী” অন্য নামে তৈরি হচ্ছে।

এই ছবিতে অনীকের নির্মাণ অনেক বেশি সংযত। তাঁর আগের ছবিগুলির মতো অতিরিক্ত সংলাপ নেই। বরং তিনি প্রথমবার nostalgia-কে একটি সিনেমাটিক টেক্সচার হিসেবে ব্যবহার করেন। সাদা-কালো ফ্রেম, আলোছায়া, পঞ্চাশের দশকের কলকাতার পুনর্নির্মাণ—সব মিলিয়ে ছবিটি তাঁর কেরিয়ারের সবচেয়ে পরিণত কাজ।

তবে এখানেও প্রশ্ন আছে। অনীক কি কখনও অতিরিক্ত reverential হয়ে পড়েননি? তিনি কি সত্যজিৎকে এতটাই পবিত্র প্রতীকে পরিণত করেননি যে মানুষটির জটিলতা হারিয়ে যায়? সম্ভবত গিয়েছে। কিন্তু সেটাই হয়তো ছবিটির প্রকৃতি। এটি বিশ্লেষণ নয়, প্রেমপত্র।

আর এখানেই অনীক দত্তের শিল্পীসত্তার সবচেয়ে গভীর সূত্রটি ধরা পড়ে। তিনি মূলত “হারিয়ে যাওয়া কলকাতা”-র (Kolkata cultural nostalgia) চলচ্চিত্রকার। তাঁর ছবির ভেতরে বারবার ফিরে আসে এক সাংস্কৃতিক উদ্বেগ—বাঙালি কি তার স্মৃতি হারিয়ে ফেলছে? শহর কি তার আত্মা বিক্রি করে দিচ্ছে? বুদ্ধিজীবী সমাজ কি সম্পূর্ণ ভণ্ড হয়ে গেছে?

বিষাক্ত নস্ট্যালজিয়া এবং শৈল্পিক দ্বন্দ্ব

এই প্রশ্নগুলির উত্তর তিনি কখনও সরাসরি দেন না। তিনি হাসেন। ব্যঙ্গ করেন। ঠাট্টা করেন। কিন্তু সেই হাসির তলায় থাকে গভীর বিষণ্ণতা। অনেকটা উডি অ্যালেনের নিউ ইয়র্ক বা মিলোশ ফোরম্যানের পূর্ব ইউরোপীয় ব্যঙ্গচিত্রের মতো—যেখানে কৌতুক আসলে সভ্যতার অবক্ষয়ের ভাষা।

অনীক দত্ত তাই “মহান” পরিচালক নাও হতে পারেন বিশ্ব সিনেমার নিরিখে। তাঁর ফর্ম সীমিত, তাঁর ভিজ্যুয়াল কল্পনা অসমান, এবং কখনও কখনও তিনি অত্যন্ত self-indulgent। কিন্তু তিনি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তিনি সেই বিরল নির্মাতাদের একজন, যিনি তাঁর সময়ের কলকাতাকে ধরে রাখতে পেরেছেন তার সমস্ত হাস্যকরতা, কৃত্রিমতা, বেদনা এবং সাংস্কৃতিক ক্লান্তিসহ।

এবং সম্ভবত সেই কারণেই তাঁর মৃত্যু বা আত্মহননের খবর মানুষকে এত নাড়া দেয়। কারণ তাঁর ছবির ভিতরেই যেন এক দীর্ঘ হতাশার ছায়া ছিল—এক শহরের, এক সংস্কৃতির, এক রাজনৈতিক প্রজন্মের হতাশা।

অনীক দত্তের চলচ্চিত্রজগতের সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক দিক সম্ভবত এই যে, তিনি কখনও সম্পূর্ণ মূলধারার পরিচালক হতে পারেননি, আবার তথাকথিত “গম্ভীর শিল্পী” হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেননি। তিনি যেন দুই জগতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক অস্বস্তিকর মানুষ। বাংলা সিনেমার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থানটি খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরে একটি অদ্ভুত বিভাজন কাজ করেছে—একদিকে তথাকথিত “বুদ্ধিদীপ্ত” সিনেমা, অন্যদিকে “জনপ্রিয়” সিনেমা। মাঝখানের অঞ্চল প্রায় শূন্য। অনীক দত্ত সেই ফাঁকাটাই পূরণ করতে চেয়েছিলেন।

এই কারণেই তাঁর ছবিগুলি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে কেবল গল্প বা অভিনয় নয়, তাঁর সাংস্কৃতিক অবস্থানটিও বুঝতে হয়। তিনি মূলত উত্তর-সত্তরের কলকাতার সন্তান। এমন এক প্রজন্ম, যারা একদিকে বামপন্থী বৌদ্ধিকতার ঐতিহ্যে বড় হয়েছে, অন্যদিকে উদারীকরণের বাজার-সভ্যতার মধ্যে এসে পড়ে হঠাৎ। ফলে তাদের চেতনার মধ্যে একই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ এবং রিয়েল এস্টেট, ঋত্বিক ঘটক এবং শপিং মল, নকশাল স্মৃতি এবং কর্পোরেট চাকরি—সব একসঙ্গে মিশে আছে। অনীকের সিনেমা এই বিভ্রান্ত, সাংস্কৃতিকভাবে স্কিৎজোফ্রেনিক মধ্যবিত্ত শ্রেণির দলিল।

রোমন্থনের রাজনীতি ও অনীকের অনন্যতা

এই সূত্র ধরেই দেখতে হয় মেঘে ঢাকা তারা-কে ঘিরে তাঁর বিতর্ক এবং পরবর্তী সময়ে অপরাজিত নির্মাণ। বাংলা সিনেমায় “ঐতিহ্য” নিয়ে কাজ করা সবসময় বিপজ্জনক। কারণ এখানে চলচ্চিত্রকারদের প্রায় দেবতার পর্যায়ে বসানো হয়। বিশেষত সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটক-এর ক্ষেত্রে। অনীকের মধ্যে সেই দেবত্ব নিয়ে এক অদ্ভুত দ্বৈততা ছিল। তিনি তাঁদের গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন, কিন্তু একই সঙ্গে বুঝতেন যে বাংলা সমাজ এই মানুষগুলিকে প্রায় মমির মতো সংরক্ষণ করেছে—জীবন্ত শিল্পী হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক প্রতীক হিসেবে।

তাই তাঁর সিনেমায় বারবার দেখা যায় স্মৃতির সঙ্গে সংঘর্ষ। তাঁর চরিত্ররা অতীতকে ভালোবাসে, কিন্তু সেই অতীতের ভারেই পিষ্ট হয়। ভূতের ভবিষ্যৎ-এর ভূতেরা যেমন শহরের স্মৃতি, তেমনই তারা শহরের অক্ষমতাও। তারা বর্তমানকে বদলাতে পারে না। কেবল পুরোনো দিনের গল্প বলে।

এই নস্ট্যালজিয়ার রাজনীতিই অনীককে অন্যদের থেকে আলাদা করে। বাংলা সিনেমায় নস্ট্যালজিয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু অধিকাংশ পরিচালক অতীতকে রোম্যান্টিক করেন। অনীক তা করেন না। তাঁর নস্ট্যালজিয়া বিষাক্ত। সেখানে অতীতের সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সেই সৌন্দর্যের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ব্যর্থতা, আত্মপ্রবঞ্চনা এবং ঐতিহাসিক অক্ষমতা।

এই জায়গায় এসে তাঁর চলচ্চিত্রভাষার সীমাবদ্ধতা এবং শক্তি দুটোই স্পষ্ট হয়। একজন খাঁটি সিনেমাটিক উদ্ভাবক হিসেবে অনীককে খুব উঁচু স্থানে রাখা কঠিন। তাঁর ক্যামেরা ভাষা সচরাচর নিরাপদ। ফ্রেম নির্মাণে সচেতনতা আছে, কিন্তু বিপ্লব নেই। তিনি দৃশ্যের ভেতরে বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে ভয় পান। তাঁর সিনেমা মূলত পরিষ্কার, পরিপাটি, মধ্যবিত্ত রুচির সিনেমা। এমনকি যখন তিনি রাজনৈতিক ব্যঙ্গ করছেন, তখনও তাঁর নির্মাণে এক ধরনের “সুশীলতা” থেকে যায়।

এখানেই তাঁর সঙ্গে ঋত্বিক ঘটক-এর মৌলিক পার্থক্য। ঋত্বিকের সিনেমা ভেঙে পড়ে, চিৎকার করে, শব্দে-ছবিতে বিস্ফোরিত হয়। অনীকের সিনেমা কখনও ভেঙে পড়ে না। তিনি বিশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁর ব্যঙ্গ কখনও বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছয় না। অনেক সময় মনে হয় তিনি নিজেই তাঁর রাগকে পরিমিত করে ফেলছেন, যাতে তা সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য থাকে।

কিন্তু সম্ভবত এটাই তাঁর প্রজন্মের সীমা। নব্বই-পরবর্তী শহুরে বাঙালি মধ্যবিত্ত মূলত নিরাপত্তাকামী। তারা বিদ্রোহ ভালোবাসে, কিন্তু দূর থেকে। তারা বিপ্লবের গল্প শুনতে চায়, কিন্তু এয়ারকন্ডিশন্ড অডিটোরিয়ামে বসে। অনীক সেই শ্রেণিরই পরিচালক। ফলে তাঁর সিনেমায় রাগ আছে, কিন্তু তা সভ্য; ব্যঙ্গ আছে, কিন্তু তা নিয়ন্ত্রিত; হতাশা আছে, কিন্তু তা সম্পূর্ণ নৈরাজ্যে পৌঁছয় না।

(চলবে…)

Author

You may also like

Leave a Comment

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles