বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনগুলি অনেক সময় ভোটের ফলাফলে ধরা পড়ে না। সেগুলি ধরা পড়ে মানুষের প্রতিক্রিয়ায়। ধরা পড়ে বিস্ময়ে। ধরা পড়ে সেই অদ্ভুত মানসিক মুহূর্তে, যখন মানুষ হঠাৎ বুঝতে শুরু করে যে এতদিন যেটাকে সে “স্বাভাবিক” বলে মেনে নিয়েছিল, সেটি আদতে স্বাভাবিক ছিল না। বরং ছিল দীর্ঘ রাজনৈতিক অভ্যাসের ফল। ক্ষমতার একটানা পুনরাবৃত্তি মানুষের বিচারবোধের ওপর যে ধুলো জমায়, তার চেয়েও বিপজ্জনক আর কিছু নেই। কারণ তখন মানুষ আর শুধু সরকারকে মেনে নেয় না; সরকারের আচরণকেও প্রকৃতির নিয়ম বলে ধরে নিতে শুরু করে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দীর্ঘ শাসনকালে পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনিক সভার একটি নির্দিষ্ট সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। মুখ্যমন্ত্রী জেলা সফরে যাচ্ছেন, প্রশাসনিক বৈঠক করছেন, মঞ্চে জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তারা বসে আছেন, স্থানীয় তৃণমূল নেতারা সামনে, সরকারি দপ্তরের আধিকারিকরা নোট নিচ্ছেন কিন্তু সেই জেলার বিরোধী বিধায়ক বা সাংসদ কোথাও নেই। কেউ প্রশ্ন করত না। সংবাদমাধ্যমেও খুব কম আলোচনা হত। কারণ ধীরে ধীরে সবাই ধরে নিয়েছিল, এটাই নিয়ম। সরকার মানেই শাসকদল। প্রশাসন মানেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শক্তির সম্প্রসারিত ছায়া। বিরোধীরা সেখানে উপস্থিত থাকবে কেন?
অদ্ভুত বিষয় হল, তখন এই অনুপস্থিতিই স্বাভাবিক মনে হত।
এখন পরিস্থিতি উল্টো হয়েছে। শুভেন্দু অধিকারী বা নতুন সরকার প্রশাসনিক বৈঠকে বিরোধী প্রতিনিধিদের ডাকছে, বা অন্তত তাদের উপস্থিতিকে পুরোপুরি অস্বীকার করছে না এবং আচমকা একাংশ মানুষের মনে হচ্ছে, এ আবার কেমন ব্যাপার? যেন দীর্ঘদিন অন্ধকার ঘরে থাকার পরে কেউ জানালা খুলে দিলে প্রথমে আলোটাই অস্বস্তিকর লাগে। গণতান্ত্রিক স্বাভাবিকতা অনেক সময় স্বৈরতান্ত্রিক অভ্যাসের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে হয়।
এই মানসিক পরিবর্তনটাই আসলে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক গল্প।
ক্ষমতা বদলের পরে রাজ্যে বহু ছোট ছোট অভিজ্ঞতা তৈরি হচ্ছে, যেগুলি আপাতদৃষ্টিতে প্রশাসনিক, কিন্তু গভীরে গেলে সাংস্কৃতিক। ধরুন, একজন বিরোধী বিধায়ক জেলা প্রশাসনের সভায় বসে প্রশ্ন করছেন। এটি গণতন্ত্রে অত্যন্ত সাধারণ দৃশ্য হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলায় সেটি এখন প্রায় নতুন অভিজ্ঞতা। কারণ বহু বছর ধরে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রশাসনিক কাঠামো থেকে সরিয়ে রাখাই ছিল অলিখিত নিয়ম।
তারপর আসে সরকারি ভাষার পরিবর্তন। একসময় প্রশাসনের ভাষা প্রায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছিল। “দিদির প্রকল্প”, “দিদির নির্দেশ”, “দিদির দূত”—এই ধরনের শব্দবন্ধ এমনভাবে ব্যবহৃত হত যেন সরকার কোনও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এক ব্যক্তির সম্প্রসারিত ইচ্ছাশক্তি। এখন ধীরে ধীরে “রাজ্য সরকার”, “দপ্তর”, “মন্ত্রীসভা”, “প্রশাসন”—এই প্রাতিষ্ঠানিক শব্দগুলি ফিরে আসছে। বাইরে থেকে এটি খুব ছোট পরিবর্তন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্ররা জানেন, ভাষা কখনও নির্দোষ নয়। ভাষা ক্ষমতার প্রকৃতি প্রকাশ করে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তাঁর ব্যক্তিগত উপস্থিতি। তিনি সরকারকে ব্যক্তিগত নৈতিকতার রূপ দিয়েছিলেন। ফলে প্রশাসনও ক্রমশ প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল। মানুষ অনেক সময় থানায় যাওয়ার আগে স্থানীয় তৃণমূল নেতার কাছে যেত। সরকারি অফিসের কাজ দলীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করছে—এই অভিযোগ এত ঘন ঘন শোনা গিয়েছিল যে সেটিও পরে “বাস্তবতা” হয়ে ওঠে। সমাজে যখন কোনও অসঙ্গতি দীর্ঘদিন টিকে থাকে, তখন মানুষ সেটিকে আর অসঙ্গতি বলে দেখে না। সেটিই হয়ে ওঠে নতুন সামাজিক ব্যাকরণ।
নতুন সরকার এসে সেই ব্যাকরণ বদলানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু ব্যাকরণ বদলানো খুব কঠিন কাজ। কারণ শুধু প্রশাসন নয়, মানুষের মনও আগের নিয়মে অভ্যস্ত।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে মজার দিক সম্ভবত প্রশাসনিক শরীরী ভাষায় ধরা পড়ছে। বহু আমলা, যাঁরা এতদিন প্রকাশ্যে রাজনৈতিক আনুগত্যের ইঙ্গিত দিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তাঁরা এখন দৃশ্যত বেশি সতর্ক। কারণ তাঁরা বুঝেছেন ক্ষমতা স্থায়ী নয়। বাংলার আমলাতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে এমন এক রাজনৈতিক আবহাওয়ায় কাজ করেছে যেখানে নিরপেক্ষতা প্রায় বিলুপ্তপ্রায় শব্দ হয়ে উঠেছিল। এখন নতুন ক্ষমতা এসে সেই একই আমলাদের কাছ থেকে “পেশাদারিত্ব” দাবি করছে। ফলে প্রশাসনের ভিতরে এক ধরনের মানসিক অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।
রাজনীতির সমাজতত্ত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আছে—people internalise power. অর্থাৎ মানুষ ক্ষমতার নিয়মকে নিজের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়। পশ্চিমবঙ্গে গত এক দশকে সেটিই ঘটেছিল। ব্লক অফিসের সামনে দলীয় নেতার চেয়ার, থানার ভেতরে রাজনৈতিক ফোনকল, সরকারি মঞ্চে একদলের আধিপত্য—সব মিলিয়ে নাগরিকরা ধরে নিয়েছিলেন, এটাই ভারতের গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রূপ। এখন নতুন সরকার এসে কিছু নিয়ম উল্টো করতেই মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছে। কারণ তারা আসলে দুই সরকারের তুলনা করছে না; তারা নিজেদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভ্যাসের সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার তুলনা করছে।
এই অভিজ্ঞতা শুধু প্রশাসনে নয়, জনজীবনের বহু স্তরে ছড়িয়ে আছে। আগে সরকারি অনুষ্ঠান অনেক সময় দলীয় সমাবেশের রূপ নিত। এখন নতুন সরকার সচেতনভাবে সরকারি অনুষ্ঠানকে তুলনামূলক নিরপেক্ষ দেখানোর চেষ্টা করছে। আগে সরকারি বিজ্ঞাপনে মুখ্যমন্ত্রীর ব্যক্তিগত উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত প্রবল; এখন সেখানে প্রতীক, দপ্তর ও সরকারের নামকে কিছুটা বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগে জেলা সফর মানেই আবেগ, নাটকীয়তা, সরাসরি জনসংযোগ; এখন সেটিকে অপেক্ষাকৃত ফাইলকেন্দ্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক করার চেষ্টা চলছে।
অবশ্য এটাও সত্যি যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির গভীর রোগ এক সরকার বদলালেই সেরে যায় না। প্রতিহিংসার রাজনীতি এখনও আছে, শুধু ভাষা বদলেছে। আগে বিরোধীরা অভিযোগ করত তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হচ্ছে; এখন তৃণমূলের বহু নেতা সেই একই অভিযোগ করছেন। আগে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের ভয় ছিল; এখন নতুন শাসকের স্থানীয় শক্তিকেন্দ্র তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ সমস্যা কেবল ব্যক্তি বা দল নয়—ক্ষমতার চরিত্রের মধ্যেই কিছু স্থায়ী প্রবণতা রয়ে গেছে।
তবু পরিবর্তন ঘটছে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন সম্ভবত মানুষের ভিতরে। দীর্ঘদিন পরে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ আবার তুলনা করতে শুরু করেছেন। আগে এক ধরনের রাজনৈতিক অনিবার্যতার বোধ তৈরি হয়েছিল যেন এই ব্যবস্থার কোনও বিকল্প নেই। এখন মানুষ দেখছেন, ক্ষমতা বদলালে প্রশাসনিক রীতিও বদলাতে পারে। ফলে তাঁরা অতীতকে নতুন চোখে বিচার করছেন।
এবং সেখানেই এই সময়ের সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ লুকিয়ে আছে।
যে সমাজ একসময় বিরোধীদের প্রশাসনিক সভায় না ডাকা স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছিল, সেই সমাজই আজ বিরোধীদের উপস্থিতি দেখে বিস্মিত হচ্ছে। অর্থাৎ ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া শুধু প্রতিষ্ঠানকে বদলায় না; মানুষের স্বাভাবিকতার ধারণাকেও বদলে দেয়। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহূর্ত সম্ভবত সেটাই যখন নাগরিকরা অস্বাভাবিকতার সঙ্গে এতটাই মানিয়ে নেয় যে স্বাভাবিকতাই তাদের কাছে অচেনা বলে মনে হয়।