দিল্লির বস্তিবাসীদের উচ্ছেদ ঠেকানোর আন্দোলন থেকে আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরের মেয়র পদে—নিত্যা রামনের যাত্রাপথে জড়িয়ে রয়েছে শহরের প্রান্তিক মানুষের অধিকারের প্রশ্ন। বর্তমান মেয়র কারেন বাসকে হারিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেসের প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র হতে চলেছেন কেরলে জন্মানো এই নগর পরিকল্পনাবিদ। তাঁর সাফল্যে উচ্ছ্বসিত ত্রিশূরের আত্মীয়েরা। তাঁদের কাছে দূর আমেরিকার এই নির্বাচনী জয় ঘরের মেয়ের অসাধারণ কৃতিত্ব।
পঁয়তাল্লিশ বছরের নিত্যার জন্ম ১৯৮১ সালে ত্রিশূরে। বাবা ভেঙ্কটরামন কাজ করতেন কেরলের সরকারি সংস্থা কেলট্রনে, মা সুধা ছিলেন ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাংকের কর্মী। শৈশবের কিছুটা সময় কেটেছে তিরুঅনন্তপুরমে। ত্রিশূরে ভারতীয় বিদ্যাভবনে পড়াশোনার শুরু। প্রায় ছয় বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে আমেরিকায় চলে যান তিনি। আত্মীয়দের স্মৃতিতে আজও উজ্জ্বল ছোট্ট নিত্যার নাচের প্রতিভা। ভরতনাট্যমের তালিমও নিয়েছিলেন ভবিষ্যতের এই জননেত্রী।
ত্রিশূরের প্রবীণ আত্মীয় অধ্যাপক টি কে দেবনারায়ণনের উচ্ছ্বাসে ধরা পড়েছে পরিবারের আবেগ। ভোটগণনার সময় নিত্যার সাফল্য কামনায় স্থানীয় ধর্মশাস্তা মন্দিরে বিশেষ পুজোর আয়োজন করেছিলেন তাঁরা। মায়ের মাধ্যমে নিয়মিত খবর আসছিল নির্বাচনের। বিদেশে বড় হলেও কেরলের সঙ্গে যোগাযোগ ছিন্ন হয়নি নিত্যার। ২০১৯ সালে পারিবারিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে ত্রিশূরে এসেছিলেন। আত্মীয়দের কাছে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি সমান প্রিয় সেই পারিবারিক বন্ধন।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানের আন্তঃবিষয়ক ‘সোশ্যাল স্টাডিজ’-এ স্নাতক হওয়ার পরে এমআইটি থেকে নগর পরিকল্পনায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন নিত্যা। কিন্তু পেশাগত জীবনে তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রে জায়গা করে নেয় শহরের দারিদ্র্য ও বঞ্চনা। ভারতে ফিরে দিল্লির বস্তিবাসীদের নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলির সঙ্গে যুক্ত হন। ২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসের আগে বস্তি উচ্ছেদের বিরুদ্ধে আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন তিনি।
পরে চেন্নাইয়ে গড়ে তোলেন ‘ট্রান্সপারেন্ট চেন্নাই’ উদ্যোগ। শহরের দরিদ্র মানুষের প্রয়োজনকে প্রশাসনের সামনে তুলে ধরতে ব্যবহার করেন তথ্য ও মানচিত্র। বস্তি অঞ্চলের শৌচাগার কোথায়, কোথায় পরিষেবা নেই, বাসের রুট কী—এমন তথ্য সংগ্রহ ছিল সেই কাজের অংশ। সরকারি মানচিত্রে উপেক্ষিত বসতিগুলিতে স্যানিটেশনের ব্যবস্থা বাড়ানোর দাবি তোলেন তাঁরা। পাশাপাশি উচ্ছেদমুখী নীতির বিরুদ্ধেও সরব হন।
২০১৩ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে নগর প্রশাসনের দপ্তরে কাজ শুরু করেন নিত্যা। গৃহহীনতা মোকাবিলায় শহরের খরচ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির দায়িত্ব পান। সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে স্থানীয় সমস্যার আরও কাছে নিয়ে যায়। ২০১৭ সালে গৃহহীনদের সাহায্যের সংগঠন ‘সেলা নেবারহুড হোমলেস কোয়ালিশন’ গড়ে তোলায় যুক্ত হন। খাবার, পোশাক ও স্বাস্থ্যসেবার সহায়তার পাশাপাশি আশ্রয়ের সঙ্গে মানুষকে যুক্ত করত সংগঠনটি।
স্বেচ্ছাসেবার অভিজ্ঞতা থেকেই নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রবেশ। ২০২০ সালে তৎকালীন কাউন্সিলর ডেভিড রিউকে হারিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস সিটি কাউন্সিলে নির্বাচিত হন নিত্যা। সতেরো বছরে প্রথম কোনও প্রতিদ্বন্দ্বী সেখানে ক্ষমতাসীন কাউন্সিলরকে পরাজিত করেন। ২০২৪ সালে ফের নির্বাচিত হন তিনি। সুলভ আবাসন, ভাড়াটেদের অধিকার এবং গৃহহীনতা মোকাবিলা তাঁর রাজনীতির প্রধান বিষয়। ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও এই রাজনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে।
আবাসন ও সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রার খরচকে গুরুত্ব দেওয়ায় নিউ ইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানির সঙ্গে তাঁর তুলনা হচ্ছে। দু’জনেরই রাজনৈতিক পরিচয়ে গণতান্ত্রিক সমাজবাদের প্রভাব রয়েছে। তবে নিত্যার সামনে সমাধানের জন্য অপেক্ষা করছে লস অ্যাঞ্জেলেসের নিজস্ব সমস্যাগুলি। স্থানীয় স্তরে মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়েই সেই দায়িত্ব সামলাতে হবে নবনির্বাচিত এই মেয়রকে।
নিত্যার স্বামী ভালি চন্দ্রশেখরন টেলিভিশনের চিত্রনাট্যকার; তাঁদের যমজ সন্তানের নাম কর্ণ ও কাবেরী। পরিবার নিয়ে থাকেন লস অ্যাঞ্জেলেসের সিলভার লেক এলাকায়। মেয়র হিসেবে এখন তাঁর সামনে আবাসনের ব্যয়, গৃহহীনতা এবং নাগরিক পরিষেবার কঠিন পরীক্ষা। ত্রিশূরের আনন্দের সঙ্গে তাই জড়িয়ে থাকছে বড় প্রত্যাশাও। যে শহরের অসহায় বাসিন্দাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর রাজনৈতিক উত্থান, সেই শহর পরিচালনার দায়িত্বেই এবার নিত্যা।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।