বিশ্বজুড়ে এক অভূতপূর্ব পালাবদল ঘটছে। কোভিড মহামারির তিক্ত অভিজ্ঞতা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে বেজে ওঠা যুদ্ধের দামামা এবং ঘন ঘন প্রাকৃতিক বিপর্যয় প্রমাণ করেছে যে, আধুনিক বিশ্বের সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা ভঙ্গুর হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটেই বৈশ্বিক পরাশক্তি থেকে শুরু করে ইউরোপের শান্তিকামী রাষ্ট্রগুলোও তাদের নাগরিকদের এক নতুন বার্তা দিচ্ছে—"প্রস্তুত থাকুন।"

সাম্প্রতিক সময়ে ব্রিটেন, সুইডেন, নরওয়ে, জার্মানি ও জাপানের মতো উন্নত দেশগুলোর সরকার নাগরিকদের নিজ দায়িত্বে অন্তত কয়েক দিনের খাবার, পানীয় জল এবং জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী ঘরে মজুত করার আনুষ্ঠানিক নির্দেশিকা জারি করেছে। প্রশ্ন উঠছে, রাষ্ট্রগুলো হঠাৎ এমন কী আসন্ন বিপদের আশঙ্কা করছে, যার জেরে সাধারণ মানুষকে এভাবে সতর্ক করতে হচ্ছে?

কোন দেশ কী প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং কেনাকাটার হিড়িক

ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এই প্রস্তুতির মাত্রা এখন চোখে পড়ার মতো।

  • যুক্তরাজ্যের ‘বি রেডি’ ক্যাম্পেইন ও কেনাকাটার ধুম: সম্প্রতি ব্রিটিশ সরকার ‘বি রেডি’ (Be Ready) নামে একটি প্রচারাভিযান চালু করেছে, যেখানে নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা বা তিন দিনের খাবার ও জল মজুত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই ঘোষণার পর যুক্তরাজ্যে জরুরি সামগ্রী বিক্রির হিড়িক পড়ে যায়। সুপারমার্কেট চেইন ‘আইসল্যান্ড’-এ এক সপ্তাহান্তেই টিনজাত খাবারের বিক্রি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাপলিন’-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ঘোষণার পর রেডিওর বিক্রি ৯২ শতাংশ, টর্চলাইটের ২৮৪ শতাংশ এবং পাওয়ার ব্যাংকের বিক্রি ১০৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

  • ইউরোপীয় কমিশনের নতুন স্ট্র্যাটেজি: শুধু একক দেশ নয়, ইউরোপীয় কমিশন ২০২৫ সালের মার্চের জন্য ‘প্রিপেয়ার্ডনেস ইউনিয়ন স্ট্র্যাটেজি’ ঘোষণা করেছে। এর মূল লক্ষ্যই হলো সদস্য দেশগুলোর নাগরিকদের অন্তত ৭২ ঘণ্টা নিজেদের প্রয়োজন মেটানোর সক্ষমতা গড়ে তোলা।

  • সুইডেন, নরওয়ে ও জার্মানি: সুইডেন তাদের ‘ইফ ক্রাইসিস অর ওয়ার কামস’ পুস্তিকা আপডেট করে নাগরিকদের এক সপ্তাহ চলার মতো রসদ প্রস্তুত রাখতে বলেছে। নরওয়েও দিয়েছে এক সপ্তাহের প্রস্তুতির পরামর্শ। অন্যদিকে, জার্মানি ১০ দিনের খাবার ও ৫ দিনের জল মজুত রাখার গাইডলাইন আরও জোরালোভাবে প্রচার করছে।

  • মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ৯০ দিনের প্রস্তুতি: পেন্টাগনের ‘ফোর্ট্রেস আমেরিকা’ উদ্যোগের অধীনে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে আলাদা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য হলো, বাইরে থেকে কোনো সহায়তা না পেলেও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটিগুলো যেন নিজেদের মজুত করা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খাবার দিয়ে অন্তত ৯০ দিন কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারে।

মজুতদারির নেপথ্যে থাকা প্রধান তিন শঙ্কা

১. ভূ-রাজনৈতিক সংঘাত ও যুদ্ধঝুঁকি: রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত গ্লোবাল সাপ্লাই চেইনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। সরকারগুলোর আশঙ্কা, এই সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে। যেকোনো সামরিক সংকটে প্রথম আঘাত আসে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর, যা গোটা দেশকে স্থবির করে দিতে পারে।

২. সাইবার যুদ্ধ ও ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্ল্যাকআউট: আধুনিক নাগরিক জীবনে বিদ্যুৎ, পানি, ইন্টারনেট, ব্যাংকিং ও যোগাযোগব্যবস্থা পরস্পরের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। একটি পরিষেবা বন্ধ হলে অন্যগুলোও ব্যাহত হয়। উন্নত রাষ্ট্রগুলো আশঙ্কা করছে, শত্রু রাষ্ট্র বা হ্যাকাররা যদি ন্যাশনাল গ্রিড বা ওয়াটার সাপ্লাই সিস্টেমে ম্যালওয়্যার হামলা চালায়, তবে মুহূর্তের মধ্যে গোটা দেশ অন্ধকারে তলিয়ে যেতে পারে। এই ব্ল্যাকআউট সামাল দিতেই বিকল্প মজুতের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

৩. জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়: বিশ্বজুড়ে চরম আবহাওয়া, তীব্র দাবদাহ, আকস্মিক বন্যা এবং সামুদ্রিক ঝড়ের প্রকোপ বাড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে বা বিদ্যুৎ সংযোগ কাটলে সরকারি ত্রাণ পৌঁছাতে সময় লাগে। ওই ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা প্রাথমিক দিনগুলোতে নাগরিকদের নিজেদের মজুতের ওপরই নির্ভর করতে হয়।

নাগরিক স্তরে প্রস্তুতির চেকলিস্ট: কী কী মজুত রাখতে বলা হচ্ছে?

জরুরি ব্যবস্থাপনা সংস্থাগুলোর গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রতিটি পরিবারের একটি 'সারভাইভাল কিট' বা জরুরি মজুত থাকা উচিত:

  • পানীয় জল: প্রতি ব্যক্তির জন্য প্রতিদিন অন্তত ৩ লিটার হারে ন্যূনতম তিন থেকে সাত দিনের নিরাপদ পানীয় জল।

  • শুকনো ও ক্যালরিযুক্ত খাবার: ক্যানজাত মাংস বা সবজি, প্রোটিন বার, বাদাম, বিস্কুট এবং সহজে রান্না করা যায় বা রান্না ছাড়াই খাওয়া যায় এমন দীর্ঘস্থায়ী খাদ্যসামগ্রী।

  • প্রাথমিক চিকিৎসা সরঞ্জাম: জীবনরক্ষাকারী প্রেসক্রিপশন ওষুধ, পেইনকিলার, ব্যান্ডেজ এবং ফার্স্ট এইড বক্স।

  • বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ বিকল্প: ব্যাটারিচালিত বা হাতল ঘোরানো (ক্র্যাঙ্ক) রেডিও, টর্চলাইট, অতিরিক্ত ব্যাটারি এবং চার্জড পাওয়ার ব্যাংক।

আতঙ্ক বনাম আত্মনির্ভরশীলতা: প্রশাসনের মূল বার্তা

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের সতর্কবার্তার উদ্দেশ্য নাগরিকদের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্ক সৃষ্টি করে বাজার খালি করা নয়; কিংবা আগামী কালই যুদ্ধ বাধছে—এমন কোনো নিশ্চিত পূর্বাভাসও এটি নয়।

এর মূল উদ্দেশ্য হলো, সমাজকে যেকোনো সংকটের মোকাবিলায় আরও বেশি স্থিতিস্থাপক (Resilient) করে তোলা। যেকোনো বড় বিপর্যয়ের পর একটি রাষ্ট্রের পক্ষে একা সব নাগরিকের দোরগোড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধারকারী দল বা সাহায্য পৌঁছে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই ঘরে আগে থেকেই থাকা সামগ্রীর সাথে ধীরে ধীরে কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস যোগ করে প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়ে রাখাটা কেবল বুদ্ধিমানের কাজই নয়, বরং বিপদের দিনে তা জীবনরক্ষাকারী প্রমাণিত হতে পারে।