৩ নভেম্বরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন মধ্যবর্তী (Midterm) নির্বাচন কেবল ওয়াশিংটনের অভ্যন্তরীণ দলীয় রাজনীতির জন্যই নির্ধারক নয়, বরং ক্যাপিটল হিলের ক্ষমতার সামান্য ভারসাম্য পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে, বিশেষ করে ভারতের কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং আইটি খাতে বড় ধরণের তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে। মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদ (House of Representatives)-এর ৪৩৫টি আসন এবং সেনেটের ৩৫টি আসনের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতে চলেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদকালের শেষ দুই বছরে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে। যদি ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ বা সেনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাসিল করে, তবে ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি, একতরফা শুল্ক আরোপ এবং কঠোর অভিবাসন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের ওপর সংসদীয় নজরদারি (Congressional Oversight) বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
১. ভারত-মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি ও ট্রাম্পের শুল্কনীতি (Trade & Tariffs)
ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের ক্ষেত্র হলো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও ট্রাম্পের আরোপিত আমদানি শুল্ক। ২০২৬ সালের শুরুর দিকে ওয়াশিংটন ও নয়া দিল্লির মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী বাণিজ্য চুক্তির রূপরেখা তৈরি হলেও ভারতের বিভিন্ন পণ্যে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত পারস্পরিক শুল্ক (Reciprocal Tariff) প্রয়োগের পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে বজায় ছিল। যদিও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জরুরি ক্ষমতার অধীনে অতিরিক্ত শুল্ক চাপানোর চেষ্টা ধাক্কা খেয়েছে, তবুও বড় ধরণের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তি নীতিগতভাবে স্থবিরতায় পৌঁছেছে।
যদি কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে তারা প্রেসিডেন্টের একতরফা শুল্ক নীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা বা বাজেট সংক্রান্ত আইনি বাধা তৈরি করার চেষ্টা করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে তাত্ক্ষণিকভাবে মার্কিন বাণিজ্য নীতি বদলে যাবে না, কারণ মার্কিন সংবিধানে চুক্তি সই বা ভেটো (Veto) প্রয়োগের মূল ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতেই ন্যস্ত থাকে।
২. এইচ-ওয়ানবি (H-1B) ভিসা এবং ভারতীয় আইটি পেশাদারদের ভবিষ্যৎ (Immigration & Visas)
ভারতীয় প্রযুক্তিবিদ ও আইটি সংস্থাগুলির দৃষ্টি আটকে রয়েছে মার্কিন অভিবাসন সংক্রান্ত নীতির ওপর। ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এইচ-ওয়ানবি (H-1B) আবেদন প্রক্রিয়ায় $১০০,০০০ ডলার সমপরিমাণ বিশাল ফি আরোপের যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তা সম্প্রতি মার্কিন আদালতের সাময়িক স্থগিতাদেশের মুখে পড়েছিল।
কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয় হলে বা অন্তত হাউস অফ রিপ্রেজেন্টেটিভস তাদের নিয়ন্ত্রণে এলে, এই ধরণের চরম অভিবাসন বিরোধী আইনি প্রস্তাবগুলিকে প্রতিনিধি পরিষদে আটকে দেওয়া সহজ হবে। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখা প্রয়োজন যে, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অন্দরেও মার্কিন স্থানীয় কর্মসংস্থান সুরক্ষার একটি শক্তিশালী গোষ্ঠী রয়েছে। ফলে গ্রিন কার্ডের ব্যাকলগ (Green Card backlog) দূর করা বা ভিসার কোটা বাড়ানো রাতারাতি সম্ভব হবে না।
৩. প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক (Defense & Global Geopolitics)
ভূ-রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে ভারত-মার্কিন অক্ষের সম্পর্ক সুদৃঢ়ই থাকবে। মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান— উভয় পক্ষের মধ্যেই চীনকে প্রতিহত করা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ও ‘কোয়াড’ (QUAD) জোটভিত্তিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে ব্যাপক দ্বি-দলীয় সমর্থন (Bipartisan consensus) রয়েছে।
তবে বিভক্ত কংগ্রেস থাকলে ওয়াশিংটনে বাজেট পাস বা নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে সরকার স্তরে যে প্রশাসনিক জটিলতা (Gridlock) তৈরি হবে, তার প্রভাবে ভারত সংক্রান্ত বেশ কিছু কূটনৈতিক প্রস্তাব কিছুটা মন্থর গতি লাভ করতে পারে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।