প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের আর মাত্র দুই বছর বাকি। গত এক দশক ধরে মার্কিন রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করা ট্রাম্প এবং তার দল রিপাবলিকান পার্টি এবার এক কঠিন পরীক্ষার মুখে। আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস নিয়ন্ত্রণের এই গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন।
ভোটাররা জানিয়েছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে তারা সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। প্রেসিডেন্টের আক্রমণাত্মক শুল্ক নীতি এবং ইরানের সাথে অজনপ্রিয় যুদ্ধের কারণে দেশটিতে খাদ্য ও জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের সাথে যুদ্ধ শুরুর আগে এক গ্যালন ডিজেলের দাম ছিল ৩.৭৫ ডলার, যা সেপ্টেম্বরে রেকর্ড ৬.৫২ ডলারে পৌঁছেছে। এছাড়া ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার সময় মূল্যস্ফীতি ৩ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক নীতি না থাকলে মূল্যস্ফীতির এই হার আরও কম হতো।
উচ্চমূল্যের এই ধাক্কা সব পক্ষের ভোটারদের মাঝেই ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। আর এ কারণেই ট্রাম্পকে আইওয়া এবং কানসাসের মতো ঐতিহাসিকভাবে নিরাপদ রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্যগুলোতেও শেষ মুহূর্তে জোর প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে। নির্বাচনী বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ‘কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট’-এর ম্যানেজিং এডিটর ক্যারি ড্যান জানান, যেসব অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকানদের এমনিতেই জেতার কথা, সেখানে যখন তারা লাখ লাখ ডলার বিজ্ঞাপনের পেছনে খরচ করতে শুরু করে, তখনই বোঝা যায় তারা বিপদে আছে।
২০২৪ সালের বিপুল বিজয়ের পর ট্রাম্প যখন হোয়াইট হাউসে ফেরেন, তখন তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। গত মাসে এক সমাবেশে তিনি ভোটারদের কাছে আবেদন জানান, ব্যালটে তার নাম আছে ভেবেই যেন সাধারণ মানুষ ভোট দেন। কিন্তু ইরানের সাথে যুদ্ধ প্রলম্বিত হওয়া এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণে তার বর্তমান অ্যাপ্রুভাল রেটিং নেমে এসেছে মাত্র ৩৮ শতাংশে। পোলস্টার 'মোর ইন কমন'-এর গ্লোবাল ডিরেক্টর স্টিফেন হকিন্স বলেন, যেসব জায়গায় মাত্র দুই বছর আগেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১০-১৫ পয়েন্টের ব্যবধানে জিতেছিলেন, সেখানে এখন ডেমোক্র্যাটদের একটি সিনেট আসন জেতার দারুণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ভোটারদের ক্ষোভ থাকা সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটদের জন্য এই নির্বাচন খুব একটা সহজ হবে না। জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ২৯ শতাংশ ভোটার ডেমোক্রেটিক পার্টিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। অর্থাৎ, অনেক রিপাবলিকান ভোটার ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ হলেও তারা ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিতে প্রস্তুত নন। কারণ তারা মনে করেন, ডেমোক্র্যাটরা কখনোই তাদের রক্ষণশীল ও খ্রিষ্টান মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটাবে না। আইওয়ার এক রিপাবলিকান ভোটার টিম ম্যাকিনন বলেন, গ্যাসের দাম এক ডলার বাড়লেও তারা তাদের বিশ্বাস বদলাবেন না।
নির্বাচনের সর্বশেষ জরিপ এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রতি সাধারণ ক্ষোভ বিবেচনায় ডেমোক্র্যাটরা অন্তত 'হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস' জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী। ডেমোক্র্যাটরা হাউসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ট্রাম্পের বিভিন্ন তদন্ত শুরু করতে পারে। এমনকি ইরানের সাথে যুদ্ধের কারণে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) মুখেও ফেলতে পারে তারা। তবে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য অনেক কঠিন হবে। ৩৫টি আসনে নির্বাচন হচ্ছে এবং নিয়ন্ত্রণ নিতে তাদের অন্তত ৪টি আসনে নিট জয় পেতে হবে। মিশিগান, টেক্সাস, ওহাইও, আইওয়া, মেইন, আলাস্কা এবং নর্থ ক্যারোলাইনার ফলাফলই মূলত নির্ধারণ করবে সিনেট কার দখলে যাচ্ছে।
আগামী দুই বছর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতি ও কংগ্রেসের সাথে তার সম্পর্ক কেমন হবে এবং ২০২৮ সালের নির্বাচনের রাজনীতি কোন পথে যাবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে মঙ্গলবারের এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর। নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয় হলে ট্রাম্প স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে আবারও নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।