মস্কোর পূর্বে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বড় ক্ষতি, রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগারে আঘাতের দাবি ইউক্রেনের

মস্কো, ১ নভেম্বর: রাতভর ড্রোন হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি পরিকাঠামোয় বড়সড় ধাক্কা। মস্কোর পূর্বে নিঝনি নভগোরদ অঞ্চলের কস্তোভো জেলার একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা স্বীকার করেছে রুশ প্রশাসন। অন্যদিকে, ইউক্রেনের দাবি, হামলার নিশানা ছিল রাশিয়ার অন্যতম বৃহৎ তেল শোধনাগার। তবে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানের নাম এখনও প্রকাশ করেনি মস্কো।

নিঝনি নভগোরদের গভর্নর গ্লেব নিকিতিন জানিয়েছেন, রাত থেকে সকাল পর্যন্ত ওই অঞ্চলে একের পর এক ড্রোন হামলা চালানো হয়। তাঁর দাবি, ১০০-রও বেশি ড্রোন ধ্বংস করেছে রুশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তা সত্ত্বেও কস্তোভোর একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে হতাহতের কোনও খবর মেলেনি। ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন জরুরি পরিষেবার কর্মীরা। চলছে ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন।

শুধু শিল্পক্ষতিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না হামলার প্রভাব। মেরামতির কাজ চলাকালীন কয়েকটি এলাকায় সাময়িক বিদ্যুৎ বিভ্রাট হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গভর্নর। আবাসিক ভবনের একাংশে গরম জল ও ঘর গরম রাখার ব্যবস্থাতেও ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থাৎ, জ্বালানি পরিকাঠামোয় আঘাতের জেরে স্থানীয় নাগরিক পরিষেবাও চাপে পড়তে পারে।

ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যম এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী কয়েকটি টেলিগ্রাম চ্যানেলের দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিল কস্তোভোয় অবস্থিত লুকঅয়েলের নিঝেগোরোদনেফতেওর্গসিনতেজ তেল শোধনাগার। ‘নরসি’ নামেও পরিচিত এই শোধনাগারটি রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকেন্দ্রগুলির একটি। ইউক্রেনের সংবাদসংস্থা ইউক্রিনফর্মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বছরে প্রায় ১ কোটি ৭০ লক্ষ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের ক্ষমতা রয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের। বিমানজ্বালানি ও ডিজেল-সহ বিভিন্ন পেট্রোপণ্যও উৎপাদিত হয় সেখানে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বিস্ফোরণের শব্দ শোনার খবরও সামনে এসেছে। তবে রুশ প্রশাসনের স্বীকার করা শিল্পক্ষতি এবং ইউক্রেনের দাবি করা শোধনাগারে হামলার মধ্যে এখনও সরাসরি যোগসূত্র নিশ্চিত করা যায়নি। শোধনাগারের ঠিক কোন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে কি না কিংবা মেরামতে কত দিন লাগতে পারে—এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।

ইউক্রিনফর্ম জানিয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল, মে ও অগস্টেও কস্তোভোর এই শোধনাগার ড্রোন হামলার নিশানা হয়েছিল। এদিকে, রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের দাবি, রাতভর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মোট ২৩৫টি ইউক্রেনীয় ড্রোন গুলি করে নামানো হয়েছে। তবে এই সংখ্যা গোটা দেশের হিসাব। নিঝনি নভগোরদ অঞ্চলে ১০০-র বেশি ড্রোন ধ্বংসের যে দাবি গভর্নর করেছেন, সেটি আলাদা পরিসরের।

রুশ সরকারি সংবাদসংস্থা তাসকে উদ্ধৃত করে অস্ট্রেলিয়ার এবিসি জানিয়েছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে ফৌজদারি মামলা শুরু করেছেন রুশ তদন্তকারীরা। পাশাপাশি, অঞ্চলের পেট্রল পাম্পগুলিতে জ্বালানির জোগান স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন। তবে সরবরাহে ঠিক কতটা ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও তথ্য সামনে আসেনি।

রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে নিশানা করার পিছনে রয়েছে ইউক্রেনের বৃহত্তর যুদ্ধকৌশল। ইউরোনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার অর্থনীতি এবং যুদ্ধ চালানোর আর্থিক সক্ষমতায় চাপ তৈরি করতে তেল শোধনাগার, জ্বালানি টার্মিনাল ও মজুতকেন্দ্রে হামলা বাড়িয়েছে কিয়েভ। সেই প্রেক্ষাপটে কস্তোভোর ঘটনা তাৎপর্যপূর্ণ। তবে হামলার প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে উৎপাদন কতটা ব্যাহত হয়েছে এবং জ্বালানি সরবরাহে তার প্রভাব কত দূর ছড়িয়েছে, তার উপর।

অন্যদিকে, ইউক্রেনের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোয় রুশ হামলাও অব্যাহত। রবিবার ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাতের হামলায় দেশের চারটি অঞ্চলে সাবস্টেশন, ট্রান্সফর্মার ও বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাঁর দাবি, কয়েক লক্ষ পরিবার বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবস্থা সচল করতে কাজ করছেন মেরামতির কর্মীরা।

দুই দেশের পাল্টাপাল্টি হামলায় স্পষ্ট, যুদ্ধের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ পরিকাঠামো। কস্তোভোয় বড় ধরনের শিল্পক্ষতির কথা রাশিয়া স্বীকার করলেও, তেল শোধনাগারটি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা এখনও নিশ্চিত নয়। উৎপাদন ও সরবরাহের উপর হামলার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে এখন পরবর্তী সরকারি বিবৃতি এবং ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাবের দিকেই নজর থাকবে।