পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতের প্রধানকে সাসপেন্ড করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুক্রবার রাতে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ওয়ারশ। আদালতের বাইরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা-নিয়ন্ত্রণ পুলিশের সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। এর মধ্যেই পুলিশের বাধা পেরিয়ে আদালত ভবনে ঢোকেন প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি। আদালতটির বৈধতা নিয়ে এক দশক ধরে চলা বিরোধ এই ঘটনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিচারপতিদের বেঞ্চের বৈধতা নিয়ে মতবিরোধের জেরে সরকার-সমর্থিত একদল বিচারপতি আদালতের বিতর্কিত প্রধান বগদান শ্ভিয়েঞ্চকোভস্কি এবং তাঁর ডেপুটি বার্তওমিয়েই সোখানস্কিকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত নেন। এই পদক্ষেপ ঘিরেই নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত।
সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দক্ষিণপন্থী বিরোধী দল ল অ্যান্ড জাস্টিস বা পিআইএস। দলের নেতা ইয়ারোস্লাভ কাচিনস্কি একে আদালতের উপর ‘আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
এই আদালত একাধিক ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনের তুলনায় পোল্যান্ডের আইনকে প্রাধান্য দিয়ে রায় দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিযোগ, পোল্যান্ডের শীর্ষ আদালত তৎকালীন জাতীয়তাবাদী শাসকদলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল।
পিআইএস-সমর্থিত রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট কারোল নাভরোৎস্কি সেনেগালে রাষ্ট্রীয় সফরে যাওয়ার পথে বিমানের গতিপথ বদলে ওয়ারশয় ফিরে আসেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র নাভরোৎস্কি শুক্রবার রাতেই আদালতে গিয়ে হস্তক্ষেপ করেন।
সাসপেন্ড হওয়া বিচারপতিদের সমর্থনে আদালত ভবনের বাইরে জড়ো হন কয়েকশো বিক্ষোভকারী। তাঁদের মধ্যে বিরোধী দলের সাংসদেরাও ছিলেন। পুলিশের দাবি, কয়েক জন বিক্ষোভকারী ট্রাইব্যুনালের বেড়া টপকে ভিতরে ঢুকে পড়েন। অন্যেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু ছোড়েন। তিন জনকে আটক করা হয়।
শনিবার রাত ১টার কিছু আগে আদালতের বাইরে পৌঁছন নাভরোৎস্কি। পুলিশের বেষ্টনী পেরিয়ে তিনি ভবনের ভিতরে ঢোকেন। একটি ভিডিয়োয় দেখা যায়, ভিতরে প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মী ও অন্য বিচারপতিদের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি হচ্ছে। স্থানীয় সময় ভোর ৪টে পর্যন্ত তিনি আদালত ভবনের ভিতরেই ছিলেন।
অনলাইনে প্রকাশিত আর একটি ভিডিয়োয় নাভরোৎস্কিকে বলতে শোনা যায়, সরকারের নিযুক্ত ব্যক্তিরা ‘সাংবিধানিক আদালতের বিচারপতি নন’।
ভোর ৫টায় আদালতের বাইরে তাঁর হয়ে একটি বিবৃতি পড়ে শোনানো হয়। সেখানে নাভরোৎস্কি ‘পোল্যান্ডের সাংবিধানিক ব্যবস্থার লঙ্ঘন’-এর নিন্দা করে বলেন, ‘একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান বলপ্রয়োগ করে দখল করা হয়েছে।’ আদালত চত্বর থেকে নিরাপত্তাবাহিনী সরিয়ে নেওয়ার দাবিও জানান তিনি।
এই সংঘাত পোল্যান্ডের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়াতে পারে। আগামী বছরের সংসদীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে তা ক্ষমতার লড়াইকে আরও জটিল করে তুলছে। জনমত সমীক্ষায় জনতাবাদী দক্ষিণপন্থীদের ফের ক্ষমতায় ফেরার সম্ভাবনার ইঙ্গিত মিলেছে।
আদালতকে ঘিরে এই বিরোধের সূত্রপাত ২০১৫ সালে। সে সময় বিদায়ী মধ্যপন্থী সরকার এবং ক্ষমতায় আসা দক্ষিণপন্থী সরকার পরপর এমন কিছু পদক্ষেপ করেছিল, যার আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। দুই পক্ষই নিজেদের মনোনীত বিচারপতিদের দিয়ে আদালতের বেঞ্চ ভরানোর চেষ্টা করে।
বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে এই বিরোধে আদালতের কাজ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর পর পিআইএসের আট বছরের শাসনকালে আদালতের স্বাধীনতা আরও খর্ব করার অভিযোগ ওঠে। উদার গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দুর্বল করা এবং আইনের শাসন লঙ্ঘনের অভিযোগে সেই সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বারবার সংঘাতে জড়ায় পোল্যান্ড।
২০২৩ সালে ক্ষমতায় ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক বিতর্কিত সংস্কারগুলি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছেন। ব্রাসেলসের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের পাশাপাশি বর্তমান কাঠামোয় এই আদালতের বৈধতা স্বীকার করতেও তিনি অস্বীকার করেছেন।
কিন্তু বিরোধী শিবিরের ঘনিষ্ঠ প্রেসিডেন্টদের বাধায় তাঁর উদ্যোগ বারবার আটকে গিয়েছে। সংস্কার রুখতে তাঁরা ভেটো প্রয়োগ করেছেন এবং নিজেদের সাংবিধানিক ক্ষমতার আরও বিস্তৃত ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
গত বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে টাস্কের প্রার্থীকে অপ্রত্যাশিত ভাবে হারিয়ে জয়ী হন নাভরোৎস্কি। এ বছর বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ হয়, যখন বর্তমান সংসদের নির্বাচিত পাঁচ বিচারপতিকে শপথ পড়াতে অস্বীকার করেন তিনি। এতে আইনি জটিলতা আরও বেড়ে যায়।
চলতি মাসের গোড়ায় কাউন্সিল অব ইউরোপের আইনের শাসন-বিষয়ক পরামর্শদাতা সংস্থা ভেনিস কমিশন জানায়, প্রেসিডেন্টের এই অস্বীকৃতি বিচারপতিদের দায়িত্ব গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো উচিত নয়।
শুক্রবার রাতে বর্তমান সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠের নির্বাচিত একদল বিচারপতি শ্ভিয়েঞ্চকোভস্কিকে সাসপেন্ড করে আদালতের কার্যপরিচালনার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার উদ্যোগ নেন। শ্ভিয়েঞ্চকোভস্কি পিআইএসের শাসনকালে মন্ত্রী ছিলেন।
নাভরোৎস্কি যে পাঁচ বিচারপতিকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করেছেন, তাঁদের অন্যতম আন্না করভিন-পিওত্রোভস্কা জানান, বিচারবিভাগে সবচেয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তিনি আদালতের শীর্ষ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
তবে আদালতপ্রধানকে সাসপেন্ড করার সিদ্ধান্ত আইনসম্মত কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। বিশিষ্ট আইনজ্ঞ এবং পিআইএসের প্রকাশ্য সমালোচক মারচিন মাতচাক বলেন, তিনি ‘কখনও ভাবেননি যে শ্ভিয়েঞ্চকোভস্কির পক্ষে দাঁড়াতে হবে’। তাঁর মতে, এই সাসপেনশনের কোনও আইনি ভিত্তিই ‘আদৌ নেই’।
অন্য দিকে, বিচারমন্ত্রী ভালদেমার ঝুরেক জানিয়েছেন, আদালতের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে শ্ভিয়েঞ্চকোভস্কি এবং তাঁর ডেপুটি সোখানস্কির বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিচার চালানোর জন্য তাঁদের আইনি রক্ষাকবচ প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন তিনি।
সমালোচনা সত্ত্বেও টাস্কের বক্তব্য, ‘আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা আমাদের কর্তব্য।’
তাঁর যুক্তি, ‘পিআইএসের বছরের পর বছর ধরে চলা বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরে এটি একটি কঠিন প্রক্রিয়া। কখনও কখনও যন্ত্রণাদায়কও। এর জন্য দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন। অন্য কোনও পথ নেই।’
চলতি মাসের গোড়ায় টাস্ক ঘোষণা করেছিলেন, ‘কারও পছন্দ হোক বা না হোক, আদালত সংবিধান মেনে কাজ শুরু করবে।’
আটলান্টায় জি২০ বৈঠকের ফাঁকে সাংবাদিকদের পোল্যান্ডের বিদেশমন্ত্রী রাদোস্লাভ সিকোরস্কি বলেন, ‘আগের সরকারের আমলে সাংবিধানিক ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছিল।’
তাঁর কথায়, ‘যা হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য হল যথাযথ ভাবে নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিদের ট্রাইব্যুনালটি আবার সচল করার সুযোগ দেওয়া।’
অন্য দিকে, বিরোধী নেতারা এবং আদালতের নিজস্ব সমাজমাধ্যম অ্যাকাউন্ট সরকারের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগে ‘অভ্যুত্থান’ ঘটানোর অভিযোগ তুলেছে। ব্রিটেনের নাইজেল ফারাজ ও লিজ ট্রাস এবং নেদারল্যান্ডসের গিয়ার্ট ভিল্ডার্স-সহ ইউরোপের কয়েক জন কট্টর দক্ষিণপন্থী নেতাও এই পদক্ষেপের নিন্দা করেছেন।
পোল্যান্ডে মার্কিন রাষ্ট্রদূত টম রোজ এক্স-এ লেখেন, ‘আজ রাতে যে ঘটনাগুলি ঘটছে… তা অত্যন্ত গুরুতর।’
তিনি আরও বলেন, ‘কী ঘটেছে এবং কেন ঘটেছে, তা নিয়ে দু’পক্ষের বিবরণ সম্পূর্ণ আলাদা। শেষ পর্যন্ত তথ্য যা-ই প্রমাণ করুক না কেন, ট্রাইব্যুনালের বাইরে হাজার হাজার মানুষের জমায়েত ইতিমধ্যেই বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তুলছে। এমন কোনও সংঘাত, যা ক্রমে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে—পোল্যান্ডের এখন সেটাই সবচেয়ে কম প্রয়োজন।’
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
মন্তব্য করতে আপনার বাংলাস্ফিয়ার অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। সদস্যতা কেনার প্রয়োজন নেই।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।