ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্টের প্রত্যাবর্তনের নেপথ্যে একাধিক কারণ। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সমাজমাধ্যমে প্রচারের কৌশল বদলে ফেলাই ছিল অন্যতম বড় চাল। আর সেই লড়াইয়ের সেনাপতি? হোয়াটসঅ্যাপের একটি দল, নাম ‘লুলার সেনাবাহিনী’।

নির্বাচনে চমকপ্রদ প্রত্যাবর্তনের মাত্র চার দিন আগে হাতে পেয়েছিলেন জীবনের প্রথম স্মার্টফোন। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার কাছে এত দিন মোবাইল ফোন ছিল কার্যত অপ্রয়োজনীয়। অবসরের সামান্য সময়টুকুতেও একের পর এক ফোনকলের ঝামেলা পছন্দ করতেন না তিনি। নির্বাচনী প্রচারের শুরুতেও সেই অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন। প্রয়োজন পড়লে সহকারীদের ফোন ব্যবহার করতেন।

কিন্তু প্রথম দফার ভোটে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খাওয়ার পরে বুঝতে পারেন, লড়াইটা শুধু মাঠে-ময়দানে কিংবা ব্যালট বাক্সে হচ্ছে না। ডিজিটাল দুনিয়াতেও পিছিয়ে পড়ছেন তিনি। অতি দক্ষিণপন্থী সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোর কাছে প্রথম দফায় হারের পরে তাই প্রচারের কৌশল আমূল বদলে ফেলেন লুলা। চার দশকেরও বেশি সময় আগে প্রথম নির্বাচনে লড়া এই প্রবীণ বামপন্থী নেতা এ বার নিজেই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে সেলফির ভঙ্গিতে ভিডিয়ো রেকর্ড করতে শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ফ্লাভিওকে ৪৪ লক্ষেরও বেশি ভোটে হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নেন তিনি।

লুলার এই প্রত্যাবর্তনের পিছনে কী কী কারণ কাজ করেছে, তা নিয়ে নানা ব্যাখ্যা রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ গুরুত্ব দিচ্ছেন ছাত্রছাত্রীদের সংগঠিত আন্দোলন ও দেশজুড়ে বড় বড় বিক্ষোভ সমাবেশকে। অন্যদের মতে, ভোটের ঠিক আগে একগুচ্ছ সরকারি সুযোগসুবিধা ঘোষণা এবং সরকারি খরচ বাড়ানোর সিদ্ধান্তও ভোটারদের মন জয়ে ভূমিকা নিয়েছিল।

তবে বহু বিশ্লেষক এবং স্বয়ং লুলার মতে, জয়ের অন্যতম বড় কারণ ছিল সমাজমাধ্যমে প্রচারের ধরন বদলে ফেলা। আর সেই পরিবর্তনের পিছনে ছিল এমন এক উদ্যোগ, যা লুলার নির্বাচনী প্রচারশিবির তৈরি করেনি, পরিচালনাও করেনি। উদ্যোগটির নাম—‘লুলার সেনাবাহিনী’।

হোয়াটসঅ্যাপেই গড়ে উঠল সেনাবাহিনী

প্রথম দফার ভোটের পরে হোয়াটসঅ্যাপে এই গোষ্ঠীর সদস্যসংখ্যা ছিল মাত্র ৬০ হাজার। কিন্তু ভোটের আগের দিনগুলিতে তা ফুলেফেঁপে পৌঁছে যায় প্রায় এক কোটি দশ লক্ষে। প্রতিদিন সদস্যদের দেওয়া হত নির্দিষ্ট ‘মিশন’। কাজ ছিল ভোটারদের কাছে লুলার পক্ষে প্রচার করা, সমর্থন আদায় করা এবং সমাজমাধ্যমে তাঁর হয়ে তৈরি পোস্ট ও ভিডিয়োগুলির জনপ্রিয়তা বাড়ানো।

এই ডিজিটাল বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ৪২ বছরের কংগ্রেস সদস্য আন্দ্রে জানোনেস। বিজয়ভাষণে লুলা তাঁকে ‘আমাদের সেনাপতি’ বলে প্রশংসা করেন। জানান, প্রতিদিন এই বাহিনীর মনোবল চাঙ্গা রাখার দায়িত্ব ছিল জানোনেসের।

জানোনেসের দাবি, ‘‘আমার কোনও সন্দেহ নেই, লুলার সেনাবাহিনীই এই নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করেছে।’’ নিজের ভূমিকা নিয়েও খুব একটা বিনয়ী হওয়ার চেষ্টা করেননি তিনি। তাঁর কথায়, ‘‘বিনয় কখনও কখনও ভণ্ডামির খুব কাছাকাছি পৌঁছে যায়। আমি জানি, এই নির্বাচন থেকে বেরিয়ে আমার গুরুত্ব কতটা বেড়েছে।’’

জানোনেসের মতে, নির্বাচনী লড়াইয়ের তিনটি প্রধান ক্ষেত্র ছিল। প্রথমত, প্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সেখানে অভিজ্ঞতার নিরিখে লুলা এগিয়ে ছিলেন। দ্বিতীয়ত, রাস্তায় নেমে মানুষকে সংগঠিত করা। বিক্ষোভ সমাবেশে তাঁদের উপস্থিতিও ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু তৃতীয় লড়াইটি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা।

‘‘সমাজমাধ্যমে আমরা যে পিছিয়ে পড়ছিলাম, সেটা বুঝতে খুব বুদ্ধিমান হওয়ার দরকার ছিল না,’’ বলেন জানোনেস।

লুলার অনুসারীর সংখ্যা বেশি হলেও বলসোনারোর পোস্ট ও ভিডিয়োয় লাইক, মন্তব্য ও শেয়ারের সম্মিলিত সংখ্যা কোনও কোনও ক্ষেত্রে লুলার তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। এই ব্যবধান ঘোচানোই হয়ে ওঠে নতুন প্রচারকৌশলের অন্যতম লক্ষ্য।

এমনকি, সমাজমাধ্যমে বলসোনারোর পক্ষে মেটা হস্তক্ষেপ করছে বলেও অভিযোগ তোলে লুলার প্রচারশিবির। বিষয়টি নিয়ে নির্বাচনী আদালতের দ্বারস্থ হয় তারা। অভিযোগের মধ্যে ছিল এমন একটি ২৪ ঘণ্টার ঘটনা, যখন ইনস্টাগ্রামে অর্থ দিয়ে বিজ্ঞাপনের প্রচার বাড়াতে পারেননি লুলা। পরে মেটা সমস্যার কথা স্বীকার করলেও তার জন্য প্রযুক্তিগত ত্রুটিকেই দায়ী করে।

জানোনেস বুঝেছিলেন, শুধু বিজ্ঞাপন দিয়ে এই লড়াই জেতা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সাধারণ সমর্থকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তাই লুলার সমর্থকদেরই হয়ে উঠতে হবে প্রচারের মূল শক্তি।

ফিরে এল ব্রাজিলের হলুদ জার্সি

জানোনেসের সবচেয়ে সফল কৌশলগুলির একটি ছিল নির্বাচনের মাত্র এক সপ্তাহ আগে নেওয়া উদ্যোগ। ‘সৈনিক’দের নির্দেশ দেওয়া হয়, ব্রাজিলের জাতীয় ফুটবল দলের হলুদ জার্সি পরে বুড়ো আঙুল ও তর্জনী দিয়ে লুলার নামের আদ্যক্ষর ‘এল’ তৈরি করে ছবি পোস্ট করতে।

কৌশলটির রাজনৈতিক তাৎপর্যও ছিল। ব্রাজিলের হলুদ জার্সি দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক। কিন্তু গত এক দশকে বলসোনারোর সমর্থকেরা কার্যত জার্সিটিকে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ করে তুলেছিলেন। লুলার সমর্থকদের কাছে সেটি ফের নিজেদের করে নেওয়াও ছিল এক ধরনের প্রতীকী লড়াই।

এই কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছিলেন ৬৩ বছরের গৃহকর্মী সিদনেইয়া দোস সান্তোস আরাউজো। কেন এই উদ্যোগে সামিল হয়েছিলেন? তাঁর বক্তব্য, ‘‘লুলার সমর্থকদের জার্সি তো ব্রাজিলেরই জার্সি। বলসোনারোর সমর্থকদের বরং আমেরিকার জার্সি পরা উচিত।’’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি বলসোনারো পরিবারের আনুগত্যের অভিযোগ তুলে এই মন্তব্য করেন তিনি। বলসোনারো যে মায়ামিতে পালিয়ে গিয়েছেন, সে কথাও মনে করিয়ে দেন আরাউজো।

সৈনিকদের জন্য শংসাপত্রও!

লুলার জয়ের পরদিনই নতুন এক উদ্যোগ নেন আরাউজো। গুগল ড্রাইভে একটি ছাঁচ তৈরি করেন, যার সাহায্যে ‘সেনাবাহিনী’র সদস্যরা নিজেদের জন্য শংসাপত্র বানাতে পারতেন। তাতে লেখা থাকত, তাঁদের ‘সামরিক সেবাকালে’ তাঁরা অসাধারণ কর্মদক্ষতা ও দৃষ্টান্তমূলক আচরণ দেখিয়েছেন এবং সেই কারণেই ‘সৈনিক’ হিসেবে এই সম্মানের যোগ্য।

শংসাপত্রগুলি দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। তাতে ‘মার্শাল’ লুলা এবং ‘কমান্ডার’ জানোনেসের স্বাক্ষরের প্রতিলিপিও ছিল।

জানোনেসের মতে, এই উদ্যোগের আসল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মধ্যে একটি যৌথ পরিচয় ও সংহতির অনুভূতি তৈরি করা। তাঁর কথায়, ‘‘আমি চেয়েছিলাম, মানুষ যেন একটি গোষ্ঠীর অংশ হওয়ার অনুভূতি পায়। তারা যেন বুঝতে পারে, আমরা একা নই।’’

ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অব পেলোতাসের গবেষক রাকেল রেকুয়েরোর মতে, এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল সমর্থকদের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যবোধ তৈরি করা। তাঁরা শুধু লুলার সমর্থক হয়ে থাকেননি, বরং তাঁর জয়ের জন্য সক্রিয় ভাবে কিছু করার সুযোগ পেয়েছিলেন।

তরুণদের হাত ধরেই বদল ডিজিটাল কৌশল

লুলার সমাজমাধ্যমের প্রচারকৌশল বদলে দেওয়ার পিছনে আরও কয়েক জন তরুণ রাজনীতিকের অবদান রয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ২১ বছরের আনা এলিসা সান্তোস, যিনি আনা এলিসা নামেই পরিচিত। এই নির্বাচনে মিনাস জেরাইস থেকে নির্বাচিত সর্বকনিষ্ঠ মহিলা কংগ্রেস সদস্য হয়েছেন তিনি।

প্রথম দফার ভোটে লুলার পরাজয়ের পরের রাতেই একটি ভিডিয়ো রেকর্ড করেন আনা। সেটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ভিডিয়োয় তিনি বলেন, বামপন্থীদের আরও ‘বিনয়ী’ হতে হবে এবং সমাজমাধ্যম ব্যবহারের কৌশল শিখতে হবে। তাঁর যুক্তি, ‘‘সমাজমাধ্যম আর রাস্তার মধ্যে এখন আর কোনও বিভাজন নেই। তৃণমূলের মানুষ ইনস্টাগ্রাম এবং টিকটকেও আছেন।’’

এর পরেই লুলার সঙ্গে বৈঠকে ডাকা হয় তাঁকে। আনা নাকি প্রেসিডেন্টকে সেলফির ভঙ্গিতে ভিডিয়ো রেকর্ড করতে রাজি করিয়েছিলেন। এর আগে এই ধরনের ভিডিয়ো করতে আপত্তি ছিল লুলার।

এ দিকে, জানোনেসও হোয়াটসঅ্যাপ গোষ্ঠীর সদস্যদের আরও একজন করে নতুন সদস্য নিয়ে আসার আহ্বান জানান। একদিন প্রেসিডেন্টের পাশে দাঁড়িয়ে ভিডিয়ো রেকর্ড করার সময় তিনি ঘোষণা করেন, অনুসারীর সংখ্যা ৫০ লক্ষে পৌঁছলে লুলা একটি মোবাইল ফোন কিনবেন এবং নিজেও এই ‘সেনাবাহিনী’তে যোগ দেবেন।

জানোনেসের কথায়, ‘‘মানুষ ভাবে, আমরা শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে এসব বলি। কিন্তু ব্যাপারটা সত্যি—লুলার সত্যিই কোনও মোবাইল ফোন ছিল না।’’

শেষ পর্যন্ত সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। এক মিত্র রাজনীতিক লুলাকে একটি ফোন উপহার দেন। অবশেষে হোয়াটসঅ্যাপ গোষ্ঠীতে যোগ দেন প্রেসিডেন্ট নিজেও।

জানোনেস অবশ্য স্বীকার করেন, লুলা এখনও সমাজমাধ্যমে বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেননি। তাঁর কথায়, ‘‘আমি বলব না যে তিনি এখন বিশেষজ্ঞ হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তিনি সেখানে আছেন, নজর রাখছেন, আর কিছু পোস্ট ও ভিডিয়োও পাঠাচ্ছেন।’’

নির্বাচন শেষ, সেনাবাহিনীর কাজও কি শেষ?

তবে নির্বাচনী প্রচার শেষ হওয়ার পরে এই বিপুল ডিজিটাল বাহিনীকে একই ভাবে সক্রিয় রাখা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে রেকুয়েরোর। তাঁর মতে, সমাজমাধ্যমে এতখানি সময় ও শক্তি ব্যয় করার একটি সামাজিক মূল্যও রয়েছে। প্রথম প্রেসিডেন্ট বিতর্কের পরেই জানোনেস হৃদ্‌স্পন্দনের অনিয়মজনিত সমস্যায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাঁকে ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে থাকতে হয়। সেই একটি দিনই ছিল, যখন হোয়াটসঅ্যাপ গোষ্ঠীটি কার্যত নীরব ছিল।

তবে জানোনেস মনে করেন, নির্বাচনের পরেও এই গোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকতে পারে। প্রতিদিন, সপ্তাহের সাত দিন, ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকার প্রয়োজন নেই। বরং লুলার সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনও আইন পাশ করানোর সময় কিংবা বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানো যেতে পারে।

‘‘আমরা আর নির্বাচনী প্রচারের ময়দান ছেড়ে আসতে পারি না,’’ বলেন তিনি।

এর পিছনে রয়েছে সংসদের রাজনৈতিক সমীকরণও। লুলা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও কংগ্রেসে বলসোনারোর দল পেয়েছে অভূতপূর্ব সংখ্যক আসন। ফলে সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও আইন পাশ করানোর ক্ষেত্রে বিরোধীদের সঙ্গে লড়াই করতে হতে পারে লুলাকে।

জানোনেসের বিশ্বাস, সেই লড়াইয়েও পাশে থাকবে তাঁর ডিজিটাল বাহিনী। তাঁর মতে, এই ‘সেনাবাহিনী’ই ভবিষ্যতে লুলার সরকার চালানোর সামর্থ্য নিশ্চিত করতে সাহায্য করবে।