আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে নির্বাচনী লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অথবা তাঁদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলি এমন বিজ্ঞাপন প্রকাশ করেছে, যেখানে রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে শিশুদের যৌননির্যাতনকারীদের রক্ষা করার অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অভিযোগের ভিত্তি, জেফ্রি এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি প্রকাশের আইন আনার উদ্যোগের বিরুদ্ধে তাঁদের ভোট।

এই বিজ্ঞাপনগুলির লক্ষ্য দৃশ্যত ভোটারদের আবেগে আঘাত করা। প্রার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তাঁরা এপস্টিনকে ‘রক্ষা’ করছেন—সেই কুখ্যাত শিশু যৌননির্যাতনকারী, যাঁর বিরুদ্ধে নাবালিকাদের নিয়ে যৌনপাচার চক্র চালানোর অভিযোগ ছিল।

সিএনএনের একটি বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে, প্রার্থী এবং তাঁদের প্রচারশিবিরের বাইরের গোষ্ঠীগুলি এপস্টিন-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনে সাড়ে তিন কোটি ডলারের বেশি খরচ করেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের আর একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সেনেটের ছ’টি গুরুত্বপূর্ণ আসনের লড়াইয়ে ডেমোক্র্যাটরা এই ধরনের বিজ্ঞাপনে চার কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেছেন।

কলোরাডোয় রিপাবলিকান জেফ ক্র্যাঙ্ককে নিশানা করা বিজ্ঞাপনগুলিতে বলা হচ্ছে, তিনি এপস্টিনের নথি প্রকাশের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছিলেন। এমনই একটি বিজ্ঞাপনে ভার্জিনিয়া জিউফ্রের পরিবারের সদস্যরা দাবি করেছেন, ক্র্যাঙ্ক ‘ডোনাল্ড ট্রাম্পকে রক্ষা করতে এপস্টিনের অপরাধ ধামাচাপা দিয়েছেন’। এপস্টিনের হাতে যৌননির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন জিউফ্রে। গত বছর তিনি আত্মহত্যায় মারা যান।

আইওয়ায় সেনেটের প্রার্থী অ্যাশলি হিনসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, এপস্টিনের নথি প্রকাশের পক্ষে ভোট দিতে অস্বীকার করে তিনি ‘নিজের অনুদানদাতাদের রক্ষা’ করেছেন।

এই আক্রমণের জবাবে নিজের প্রচার-বিজ্ঞাপনে হিনসন বলেন, ‘এই সপ্তাহে আমাকে আমার ছেলেদের বোঝাতে হয়েছে—না, মা শিশুদের যৌননির্যাতনকারীদের রক্ষা করে না।’

জর্জিয়ায় সেনেটের রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক কলিন্সকে নিশানা করা একটি বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘এপস্টিনের যৌনপাচার চক্রে ১৪ বছরের কিশোরীদেরও যৌননির্যাতন করা হয়েছে, এ কথা জানার পরেও মাইক কলিন্স এপস্টিনের নথি প্রকাশের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।’

ফ্লরিডার রিপাবলিকান জিমি প্যাট্রোনিসকে আক্রমণ করে তাঁর ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী দাবি করেছেন, এপস্টিনকে নিয়ে তদন্তকে তিনি ‘নিজের সময় নষ্ট’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

ওয়াশিংটন পোস্টকে দেওয়া এক বিবৃতিতে ক্র্যাঙ্কের প্রচারশিবিরের মুখপাত্র অভিযোগ করেন, এপস্টিন-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনটির বক্তব্য ‘ইচ্ছাকৃতভাবে অস্পষ্ট’ রাখা হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা, নির্যাতিতাদের পরিচয়-সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে মুছে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নথি প্রকাশের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়াই ছিল ক্র্যাঙ্কের অবস্থান। প্রচারশিবির আরও বলে, ক্র্যাঙ্কের প্রতিদ্বন্দ্বী জেসিকা কিলিন ‘ওয়াশিংটনের ডেমোক্র্যাটদের সাহায্য নিয়ে একটি শোকাহত পরিবারকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছেন’, যা ‘দুর্ভাগ্যজনক’।

ক্র্যাঙ্কের দপ্তরের কর্মীরা জিউফ্রের পরিবারকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তবে ক্র্যাঙ্ক নিজে সশরীরে তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। তাঁর প্রচারশিবিরের দাবি, সংশ্লিষ্ট আইন প্রস্তাবের উপর ভোটাভুটির আগেও এপস্টিনের নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

গত বছর ডেমোক্র্যাটরা এবং প্রতিনিধি পরিষদের অল্প কয়েক জন রিপাবলিকান সদস্য একটি ‘ডিসচার্জ পিটিশন’-এর মাধ্যমে এপস্টিনের নথি প্রকাশের প্রশ্নে ভোটাভুটি বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করেছিলেন। কংগ্রেসের এই পদ্ধতিতে আইন প্রণয়নের স্বাভাবিক ধাপগুলি পাশ কাটিয়ে কোনও প্রস্তাবকে প্রতিনিধি পরিষদের পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ভোটাভুটির জন্য আনা যায়।

নব্বইয়ের দশকে এবং ২০০০-এর দশকের গোড়ায় এপস্টিনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিচয় ছিল। সরকারি কাজে স্বচ্ছতা বাড়ানোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে এসে ট্রাম্প নথি প্রকাশের ওই ডিসচার্জ পিটিশনের বিরোধিতা করেন। প্রতিনিধি পরিষদের অধিকাংশ রিপাবলিকানও তাঁর অবস্থান অনুসরণ করেন। এতে ট্রাম্পের কয়েক জন সুপরিচিত সমর্থক ভোটারের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।

শেষ পর্যন্ত মিত্রদের চাপে ট্রাম্প আইন প্রস্তাবটি সমর্থন করেন। ফলে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারাও তার পক্ষে ভোট দেওয়ার সবুজ সংকেত পান। প্রতিনিধি পরিষদের একজন ছাড়া সব রিপাবলিকান সদস্য ‘এপস্টিন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর পক্ষে ভোট দেন।

অনেক বিজ্ঞাপনেই এই তথ্যটি বাদ দেওয়া হয়েছে যে, এপস্টিনের নথি প্রকাশের আইন প্রস্তাবটি পূর্ণাঙ্গ অধিবেশনে ভোটাভুটির জন্য এলে প্রতিনিধি পরিষদের প্রায় প্রত্যেক রিপাবলিকান সদস্যই তার পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। যদিও তত দিনে ট্রাম্প ওই আইনে সই করতে এবং নথি প্রকাশ করতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন। বিজ্ঞাপনগুলিতে বরং উল্লেখ করা হচ্ছে, তার আগে প্রস্তাবটিকে বাধ্যতামূলকভাবে ভোটাভুটিতে আনার উদ্যোগগুলির বিরোধিতা করেছিলেন রিপাবলিকানরা।

আক্রমণাত্মক বিজ্ঞাপনগুলির অভিযোগ খণ্ডন করতে রিপাবলিকানরাও এই তথ্যটিই তুলে ধরছেন।

সরাসরি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে দেওয়া এক বিজ্ঞাপনী বক্তব্যে হিনসন বলেন, ‘অবশ্যই আমি এপস্টিনের নথি প্রকাশের পক্ষে ভোট দিয়েছি।’ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জশ টুরেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগও করেন তিনি। হিনসন চূড়ান্ত এপস্টিন ফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্টের পক্ষে ভোট দিলেও, তার আগে ডিসচার্জ পিটিশনে সই করেননি।

অন্য দিকে, প্যাট্রোনিস তদন্তকে কখনও ‘সময় নষ্ট’ বলেননি। তবে স্থানীয় একটি রেডিয়ো স্টেশনকে তিনি বলেছিলেন, ‘সব কিছু প্রকাশ করে দিতে আমার কোনও আপত্তি নেই’, কিন্তু বিষয়টি ‘শেষ পর্যন্ত বিপুল সময় আর শক্তি খেয়ে নিচ্ছে’।

প্যাট্রোনিসের প্রচারশিবিরের মুখপাত্র মেলিসা স্টোন হারিকেন ইসাইয়াসের পরে দুর্যোগ মোকাবিলার অর্থ বরাদ্দ আনতে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর কাজের কথা তুলে ধরেন। প্রতিদ্বন্দ্বী গে ভ্যালিমন্টকে আক্রমণ করে স্টোন বলেন, তিনি ‘প্রথম কংগ্রেশনাল জেলার মানুষকে ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করার বদলে এখনও একটি করুণ ওয়েব ভিডিয়োয় এক মৃত শিশু যৌননির্যাতনকারীকে নিয়েই কথা বলে চলেছেন’।

কিছু রিপাবলিকান এবং রিপাবলিকান পার্টির সমর্থক গোষ্ঠী আবার পাল্টা আক্রমণের চেষ্টা করছে। তাদের অভিযোগ, এপস্টিনের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল এমন অনুদানদাতাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা।

জর্জিয়ায় সেনেট নির্বাচনের একটি বিতর্কে কলিন্স তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জন অসফের বিরুদ্ধে প্রযুক্তি খাতের শতকোটিপতি রিড হফম্যানের কাছ থেকে নির্বাচনী অনুদান নেওয়ার অভিযোগ তোলেন। এপস্টিনের সঙ্গে হফম্যানের যোগাযোগ ছিল। হফম্যান জানিয়েছেন, কেবল তহবিল সংগ্রহের সূত্রেই এপস্টিনকে চিনতেন তিনি, এবং সেই যোগাযোগের জন্য তিনি অনুতপ্ত।

কলিন্স বলেন, ‘আপনি দাবি করতে পারেন যে “এপস্টিন শ্রেণি”-র বিরুদ্ধে লড়ছেন। কিন্তু আপনাকে বলি, সমস্যাটা তো আপনার নিজের ঘরের ভিতরেই। “এপস্টিন শ্রেণি” এই মুহূর্তে এই মঞ্চেই উপস্থিত—আর তিনি হলেন আপনি।’

নিউ মেক্সিকোয় গভর্নর নির্বাচনে প্রার্থীর প্রচারশিবিরের বাইরের একটি গোষ্ঠী বিজ্ঞাপন দিয়ে অভিযোগ করেছে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডেব হাল্যান্ড এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানে সফর করেছেন, ‘এপস্টিনের ব্যবসাগুলি থেকে কয়েক দশ হাজার ডলার নিয়েছেন’ এবং তার পরে ‘আরও চেয়েছেন’।

হাল্যান্ড এপস্টিনের ব্যক্তিগত বিমানে চড়েননি। তবে ২০১৪ সালে এপস্টিনের একটি সংস্থার মাধ্যমে বুক করা একটি উড়ানে তিনি সফর করেছিলেন। হাল্যান্ড জানিয়েছেন, চার্টার করা বিমানটি এপস্টিনের মালিকানাধীন একটি সংস্থার ছিল ।