দেশ থেকে বহু দূরে থেকেও উৎসবের দিনে চেনা বাংলাকে ফিরে পাওয়ার আয়োজন। নেদারল্যান্ডসে ‘উচ্ছ্বাস’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের কালীপুজোয় একসঙ্গে জায়গা পাচ্ছে শ্যামা আরাধনা, ভোগ, গান, নাচ এবং প্রবাসী পরিবারের মিলন। আগামী ৭ ও ৮ নভেম্বর দু’দিনের এই উৎসব হবে উইথোর্নের ‘ডে স্খেখ’ কমিউনিটি হলে। আয়োজনের কেন্দ্রে রয়েছে সেই পরিচিত আকাঙ্ক্ষা—বিদেশে বেড়ে ওঠা জীবনেও শিকড়ের সঙ্গে যোগাযোগ অটুট রাখা।
২০২৪ সালে চারটি প্রবাসী পরিবারের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘উচ্ছ্বাস’। তাঁদের সূচনা করা কালীপুজো এবার তৃতীয় বছরে পড়ল। আয়োজকদের দাবি, নেদারল্যান্ডস এবং বৃহত্তর বেনেলাক্স অঞ্চলে এটিই প্রথম সর্বজনীন কালীপুজোর উদ্যোগ। বেনেলাক্স বলতে নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম ও লুক্সেমবুর্গকে বোঝায়। তাঁদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এই পুজোয় প্রায় পাঁচশো থেকে ছয়শো মানুষ সমবেত হন। ছোট পরিসরের পারিবারিক উদ্যোগ এভাবেই পেয়েছে বৃহত্তর সামাজিক চেহারা।
পুজোর প্রতিমাটিও বাংলার সঙ্গে সম্পর্কের একটি দৃশ্যমান চিহ্ন। কলকাতার কুমোরটুলি থেকে নিয়ে যাওয়া এই কালীপ্রতিমা তৈরি হয়েছে দক্ষিণেশ্বরের দেবীমূর্তির আদলে। সেই প্রতিমাতেই এবারও পুজো হবে। আচার পালনের দায়িত্বে থাকবেন বেলজিয়াম থেকে আসা এক দম্পতি। আগের দু’বছরও তাঁরা পুজো করেছিলেন। ফলে আয়োজনের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে একাধিক দেশের প্রবাসী বাঙালিদের যোগাযোগ, সহযোগিতা ও অংশগ্রহণ।
দু’দিনের অনুষ্ঠানের প্রথম দিন, ৭ নভেম্বর, রাখা হয়েছে দীপাবলির সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা। বিকেল চারটে থেকে অনুষ্ঠানে থাকবে গান, নাচ, নৃত্যনাট্য, আবৃত্তি, ব্যান্ডের পরিবেশনা এবং ডিজে। প্রবাসীরাই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। এই সন্ধ্যার জন্য নাম নথিভুক্ত করার ব্যবস্থা রয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি শিল্পচর্চা ও বিনোদনের এই পরিসর উৎসবকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। আয়োজকদের আমন্ত্রণে পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান রয়েছে। উৎসবের পোশাকে আসার কথাও বলা হয়েছে। ফলে মঞ্চের অনুষ্ঠান ঘিরে প্রবাসের পরিচিতজনদের একত্র হওয়ার একটি সময় ও জায়গা তৈরি হচ্ছে এই আয়োজনে।
পরদিন, ৮ নভেম্বর, বিকেল চারটেয় পুজোর দরজা খুলবে। ঘোষিত সূচি অনুযায়ী, সাড়ে চারটেয় শ্যামাসংগীত, পাঁচটায় পুজো শুরু এবং সন্ধ্যা সাতটা থেকে অঞ্জলি। সাড়ে সাতটা থেকে ভোগপ্রসাদ বিতরণের ব্যবস্থা। পুজোয় প্রবেশের জন্য কোনও মূল্য বা আগাম নিবন্ধন লাগবে না। তবে বিনামূল্যে ভোগপ্রসাদ নিতে চাইলে আগে নাম জানাতে হবে। আয়োজকদের ব্যাখ্যা, কতজন প্রসাদ নেবেন তা জানা থাকলে প্রয়োজনমতো রান্না করা সম্ভব হবে, খাবারের অপচয়ও কমবে।
এবার সাজসজ্জায় তুলে ধরা হচ্ছে রাজস্থানের রং ও শিল্পঐতিহ্য। সংগঠনের সদস্যরাই মিলিতভাবে সেই প্রস্তুতিতে হাত লাগিয়েছেন। প্রথম বছর, ২০২৪ সালে, সাজসজ্জার অনুপ্রেরণা ছিল যামিনী রায়ের শিল্পভাবনা। পরের বছর উঠে এসেছিল মহারাষ্ট্রের ওয়ারলি চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য। এবার রাজস্থানকে বেছে নেওয়ার মধ্যে বাঙালির উৎসবের সঙ্গে ভারতের অন্য অঞ্চলের শিল্পকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগও রয়েছে। পুজোর আয়োজন তাই দৃশ্যশিল্পের বৈচিত্র্য দেখারও একটি উপলক্ষ হয়ে উঠছে।
উদ্যোক্তাদের ভাবনায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে সর্বজনীনতা। বাঙালিদের পাশাপাশি অন্য ভাষাভাষী প্রবাসীরাও এই উৎসবে যোগ দেন। তাঁদের কাছে সংস্কৃতির বিকাশের শর্ত সকলের জন্য জায়গা রাখা। ভোগ রান্না থেকে অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি, বিভিন্ন কাজে অংশ নেন প্রবাসীরা। এই সম্মিলিত শ্রমই আয়োজনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। কেউ কেবল দর্শক হয়ে আসছেন, কেউ প্রস্তুতিতে সময় দিচ্ছেন—সব মিলিয়ে উৎসবের চারপাশে তৈরি হচ্ছে পরিচয় ও বন্ধুত্বের পরিসর।
নতুন প্রজন্মের হাতে ভবিষ্যতে পুজোর দায়িত্ব তুলে দিতে চান উদ্যোক্তারা। তাঁদের লক্ষ্য, সন্তানদের কাছে বাংলার ঐতিহ্যকে জীবন্ত অভিজ্ঞতা করে তোলা। অভিভাবকদের শৈশবের উৎসব এখানে ফিরে আসছে অন্য দেশের পরিবেশে, নতুন পরিচিতদের সঙ্গে। এই উদ্যোগের তাৎপর্যও সেখানে। প্রতিমা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও একসঙ্গে প্রসাদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রবাসী পরিবারগুলি নিজেদের একটি মিলনক্ষেত্র গড়ছে। দূরত্ব অতিক্রম করে উৎসব হয়ে উঠছে ঘরের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখার উপায়।
পাঠকের মন্তব্য ০
শালীন ও বিষয়ভিত্তিক আলোচনা করুন। মন্তব্য অনুমোদনের পর প্রকাশ হবে।
এই প্রতিবেদনে নতুন মন্তব্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে।
এখনও কোনো অনুমোদিত মন্তব্য নেই।